৩০ জানুয়ারিতে নিখোঁজ হয়েছিলেন জহির রায়হান

এম আর রাসেল

কীর্তিমান কিছু মানুষের যশ-খ্যাতি কোনদিন মুছে যায় না। যুগ যুগ ধরে তাঁদের নাম লোকমুখে গীত হয়। আলোচনা সমালোচনার নব হিল্লোলে তাদের সৃষ্টিকর্ম ভেসে যায় না,বারবার ফিরে আসে সঞ্জীবনী সুধা নিয়ে।

দেশ মাতৃকার নব-রূপায়নে এই সব কালজয়ী ব্যক্তিত্ব আলোর পথের দিশারী হয়ে আজীবন পথ দেখিয়ে যান। এমনই এক কালজয়ী ব্যক্তিত্ব হলেন জহির রায়হান। বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য যাদের হাতের নিপুণ স্পর্শে ফুলেল রূপ লাভ করেছে তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম এক আলোক বর্তিকা।
মাত্র ২০ বছর বয়সে প্রথম গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ এবং দুই দশকের সাহিত্যচর্চায় ৭টি উপন্যাস, ২টি গল্পগ্রন্থ; ২৬ বছর বয়সে প্রথম চলচ্চিত্র পরিচালনা কখনো আসেনি, এক দশকের চলচ্চিত্রচর্চায় বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু ভাষার ১০টি চলচ্চিত্র পরিচালনা (এর মধ্যে পুরো পাকিস্তানের প্রথম টেকনিকালার ছবি সংগম, প্রথম সিনেমাস্কোপ বাহানা), কিছু প্রযোজনা; তাঁর জীবনের স্মরণীয় কীর্তি। পাকিস্তান আমলে পেয়েছে সেরা চলচ্চিত্র, সেরা বইয়ের পুরস্কার।
“Stop Genocide” প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে তিনিই প্রথম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার চিত্র বর্হিবিশ্বে তুলে ধরেন। ১৯ মিনিটের এই ভিডিও জাতিসমূহের আত্ননিয়ন্ত্রণের অধিকার এর ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের অনুলিপি টাইপের খট খট শব্দ যেন বলে দিয়ে যায় ঐসব শুধুই কাগুজে হরফে বাধাই করা অক্ষর লিপিমাত্র। না হলে ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের উপর যে পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করেছিলেন তা গোড়াতেই মুখ থুবড়ে পড়ত, জাতিসংঘ এর লাগাম টেনে ধরতে পারত।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা ‘সময়ের প্রয়োজনে’ গল্পটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। মানব মনের গহিনে ভালবাসার যে টলটলে এক দীঘি রয়েছে তা কখনই শুকিয়ে যায় না। সব কিছু শেষ হয়ে গেছে জেনেও সেই প্রিয়জনদের কাছে ফিরে পাবার আকুতি মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বদাই প্রাণবন্ত রাখত। পাকিস্তানিদের সাথে যে লড়াই তা আসলে কিসের জন্য, শান্তির জন্য, দেশের জন্য না অন্য কিছুর জন্য। লেখক বলেছেন, “এ লড়াই সময়ের প্রয়োজনে”। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখকের এমন বর্ণনা একদম স্বতন্ত্র।

ক্ষণজন্মা এই মানুষটির সৃষ্টিকর্মের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে সিনেমার মাধ্যমে। “জীবন থেকে নেয়া” ও “হাজার বছর ধরে” সিনেমা দুটি ছোটবেলায় আমার দেখা শ্রেষ্ঠ কিছু সিনেমার মধ্যে অন্যতম।
“হাজার বছর ধরে” উপন্যাস পড়ার মধ্য দিয়েই আমার জহির রায়হান পাঠ শুরু হয়৷ পরে একে একে “আরেক ফাল্গুন”, “বরফ গলা নদী”, “আর কত দিন”, “কয়েকটি মৃত্য”, “তৃষ্ণা” ও “শেষ বিকেলের মেয়ে” পড়ে ফেলি। স্মৃতির বাতায়নে তাকিয়ে দেখি বইমেলায় আমার প্রথম কেনা বইটি হল জহির রায়হানের উপন্যাসসমগ্র।

পঠিত রচনাগুলোর মধ্যে “আর কতদিন” আমাকে বেশ তাড়িত করেছিল বলতেই হবে। যুদ্ধকালীন বাস্তবতা, লাঞ্চিত মানবতার আর্তি ও শান্তির স্বপক্ষে জোরালো আবেদনকে এখনও যেন জীবন্ত রূপে দেখতে পাই এই রচনার মধ্য দিয়ে।বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী চলমান যুদ্ধের চিত্র দেখে ব্যথিত মন লেখকের সুরে স্বগোতক্তি করে বলে “আর কতদিন”।

আক্ষেপের সুর হয়ে ধরা দেয় উপন্যাসের শুরুর দিকের ছত্র- ” তবু মানুষের এ দীনতার বুঝি শেষ নেই/ শেষ নেই মৃত্যুরও।/ তবু মানুষ মানুষকে হত্যা করে।/ ধর্মের নামে।/ বর্ণের নামে।/ জাতীয়তার নামে।/ সংস্কৃতির নামে।”

“আরেক ফাল্গুন” উপন্যাসের “আসছে ফাগুনে আমরা দ্বিগুণ হব” উক্তির মাঝে আমি আবিষ্কার করি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অমোঘ মন্ত্র। এই মন্ত্র যেন আমাকে বলে দিয়ে যায় সত্য পথে লড়াই করার সেনানী কখনও কমে না, দ্বিগুণ হারে বাড়তেই থাকে। গল্পের মুনিম, আসাদ, রসুল চরিত্র গুলো মনের ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে উঠে বারবার। মনে হয় চরিত্রগুলো যেন আমারই প্রতিনিধিত্ব করছে।
আজকের এইদিনে জহির রায়হান নিখোঁজ হয়েছিলেন। তাঁর প্রয়াণ দিবসের এই ঘটনা রহস্য হয়েই আছে। জহির রায়হান স্মরণে লেখাটা লিখেছিলাম।

লেখকঃ কৃষিবিদ ও  কলাম লেখক 

আরও পড়ুন