দৃষ্টির অন্তরালে………..(পর্ব-২)

হাবিবা মুবাশ্বেরা

ফুয়াদ ও সীমান্ত একই প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করে। সহকর্মী হলেও সমবয়সী হওয়ায় ওদের সম্পর্কটা বন্ধুর মতোই। ফুয়াদের বাবা দিন তিনেক আগে চিকিৎসার জন্য ভারত গিয়েছেন। কিন্তু পৌঁছানোর পর থেকে কোনো রকম যোগাযোগ করেননি পরিবারের সাথে। বয়স্ক মানুষ প্রথমবার দেশের বাইরে একা গিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবেই ফুয়াদের পরিবার খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। আজ সকালেও অফিসে বাবাকে নিয়ে টেনশনের কথা  বলছিল ফুয়াদ।

রাতে ঘুমাতে যাবার আগে সীমান্ত তাই একবার ফুয়াদকে ফোন দিল ওর বাবার খবর নেয়ার জন্য।

ফোন ধরার পর ফুয়াদের কন্ঠ অবশ্য নিশ্চিন্তই শোনা গেল। বলল,“কিছুক্ষণ আগে বাবার সাথে কথা হয়েছে। ফোনের সিম কিনতে দেরী হওয়ায় এই কয়দিন যোগাযোগ করতে পারেননি। ”

একথা শুনে সীমান্ত বললো, “যাক অবশেষে তোমাদের দুশ্চিন্তার অবসান হলো। “

”হুম, তবে আমরা অবশ্য বাবার ফোন পাওয়ার আগে সন্ধ্যাবেলাতেই জানতে পেরেছিলাম বাবা নিরাপদে আছেন “ ফুয়াদের এই কথায় চমকে গেল সীমান্ত।

“কিভাবে, কার মাধ্যমে জানলে?” অবাক কন্ঠে জানতে চাইলো সীমান্ত।

“আমার বাবার চাচাতো ভাই কোয়ান্টাম গ্রাজুয়েট। উনি কমান্ড সেন্টারে বসে মেডিটেশন করে বাবার অবস্থান দেখতে পেয়েছেন, তারপর আমাদের জানিয়েছেন।” রহস্যময় কন্ঠে বলল ফুয়াদ।

“বাংলাদেশে বসে ভারতে তোমার বাবার অবস্থান বলেছেন, এটা কি আদৌ সম্ভব?” সীমান্তের কন্ঠে স্পষ্টতই অবিশ্বাসের সুর।

“যারা কোয়ন্টাম গ্রাজুয়েট হয়ে যান তারা আধ্যাত্মিকতার এমন পর্যায়ে পৌঁছে যান যে ,তারা তখন মেডিটেশনের মাধ্যমে যে কারও অতীত বা বর্তমানের দৃশ্য দেখতে পারেন। আমার চাচাও একজন কোয়ান্টাম গ্রাজুয়েট। “ অনেকটা গর্বভরেই কথাগুলো বলল ফুয়াদ।

“অতীতও দেখতে পান? আমার অতীতও চাইলে দেখতে পারবেন তোমার চাচা ?” সীমান্ত জানতে চাইল।

“কিছু তথ্য যেমন তোমার নাম, মায়ের নাম, ঠিকানা, বয়স ইত্যাদি জানালে অবশ্যই পারবেন।  অথবা তোমার ছবি দিলেও কাজ হবে।” ফুয়াদের কন্ঠে  যেন আত্মবিশ্বাস ঝরে পরছে।

আমার কোনো সিঙ্গেল ছবি তো নেই তোমার কাছে, সব অফিসের গ্রুপ ফটো। আমি বরং আমার তথ্যগুলো মেসেজ করে দিচ্ছি তোমাকে। তুমি উনার কাছে জানতে চেয়ো  তো আমার অতীতের কোনো উল্লেখযোগ্য  ঘটনা সম্পর্কে। দেখি বলতে পারেন কিনা!!” সীমান্ত বলল।

“আচ্ছা, ফুয়াদ বললো, “রবিবার অফিসে এসে তোমাকে জানাবো তোমার অতীতের কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা।”

রবিবার সকালে বেশ উত্তেজনা নিয়ে অফিসে গেল সীমান্ত। ফুয়াদের আসার অপেক্ষায় সময় যেন কাটতেই চাইছে না। অবশেষে ফুয়াদ এসে হাসিমুখে সীমান্তকে বললো, “৫বছর বয়সে নানা বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পুকুরের পানিতে ডুবে গিয়েছিলে তুমি। তোমার মামা এসে তাড়াতাড়ি  উদ্ধার করায় সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলে । কি ঠিক বলেছি তো?”’

বিস্মিত সীমান্ত কোনো মতে বললো, “তোমার চাচা বলেছেন এই ঘটনা? ঘটনা তো আসলেই সত্যি!

ফুয়াদ  আরও জানালো ওর চাচা নাকি বলেছেন, সীমান্ত ইদানীং খুব দুশ্চিন্তার মাঝে আছে। কারণটাও নাকি উনি জানতে পেরেছেন, তবে ফুয়াদকে  তা বলেন নি।

একথা শুনে একদম চমকে গেলো সীমান্ত।

একটু তোঁতলানোর মত করে বলল, “ আ আ আমাকে না দেখে, না জেনে শুধু মেডিটেশন করেই এত  কিছু বলে দিলেন!! স্বীকার করতেই হচ্ছে উনি অনেক বড় আধ্যাত্মিক ব্যক্তি।”

সেদিন সারা দিন অফিসে একটা ঘোরের মধ্যে কাজ করলো সীমান্ত। বার বার ভাবতে লাগলো একবার কি  যাবে নাকি ফুয়াদের চাচার কাছে? যদিও  ট্র্যাডিশনাল পীর , হুজুরদের উপর আস্থা নেই ওর। তবে ফুয়াদের ফ্যামিলি তো শিক্ষিত, ওর চাচা একজন শিক্ষক। এমন কামেল একজন ব্যক্তিই তো ও খুঁজছিল এতদিন মনে মনে।

বেশ কদিন ভাবার পর সিদ্ধান্ত নিলো সীমান্ত, ফুয়াদের সাথে ওর চাচার কাছে যাবে একবার। বর্তমান ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে উনিই হয়তো ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারবেন!
————————————————————————————————-
উপরোক্ত কাহিনীর চরিত্র সীমান্তের মতো আমরাও অনেক সময় কাউকে অতীতের ঘটনা বলে দিতে দেখলে কিংবা বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে খুঁজে দিতে দেখলে তার অলৌকিক ক্ষমতা আছে ভেবে চমৎকৃত হয়ে যাই। সেটা হতে পারে আয়না পরা, চাল পরা, বাটি চালান দেয়া, হিপনোটিজম কিংবা মেডিটেশন প্রভৃতি বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে। কিন্তু আসলে এসব অলৌকিক ঘটনার নেপথ্যের রহস্য কি?
কি ঘটে আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে?

বস্তুত: পৃথিবীতে কোনও মানুষেরই এমন কোন বিশেষ ক্ষমতা নেই যে, সে স্থান-কালের ঊর্দ্ধে যেতে পারে এবং অপরিচিত মানুষের অতীত বা বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারে। তথাকথিত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরা  এসব কিছু করেন জ্বীনদের সহায়তা নিয়ে। তাদের সাথে খারাপ জ্বীনদের যোগাযোগ থাকে।

তাদের কাছে কেউ যখন কোনো ব্যক্তির অতীত বা বর্তমান সম্পর্কে জানতে চায় তখন তারা তার ‘সাহায্যকারী জ্বীন’কে  উক্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য জানায়। ‘সাহায্যকারী জ্বীন’ তখন  এসব তথ্যের ভিত্তিতে ঐ ব্যক্তির সঙ্গী ‘ক্বারিন জ্বীনে’র  সাথে যোগাযোগ করে। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রতিটি মানুষের সাথেই একজন জ্বীন থাকে যার নাম ক্বারিন।  রাসূল (সা:) বলেছেন- “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার সাথে তার সহচর জ্বীন নিযুক্ত করে দেয়া হয়নি। “ (সহীহ মুসলিম:২৮২৪)

তো এই ক্বারিনের কাজই হলো মানুষকে পথভ্রষ্ট করা, অন্যায়, অশ্লীল ও কুকর্মে প্ররোচিত করা ,,বিপথগামী করা। তাছাড়া  সার্বক্ষনিক সঙ্গী হবার কারনে স্বাভাবিক ভাবেই প্রত্যেকের ক্বারিন তার সঙ্গীর অতীত এবং বর্তমান জীবনের সব খুটিনাটি সম্পর্কে জানে।

ক্বারিন তার সঙ্গী ব্যক্তির এসব তথ্য আধ্যাত্মিক ব্যক্তির ‘সাহায্যকারী জ্বীনকে’ সরবরাহ করে । এভাবে ’সাহায্যকারী জ্বীন’ এবং প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গী ’ক্বারিনের’ কাছ থেকে অতীত বা বর্তমান সম্পর্কে জেনে নিয়ে তথাকথিত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষকে মুগ্ধ করে ফেলে।

এভাবে  অপরিচিত ব্যক্তির অতীত বা বর্তমান সম্পর্কে জানতে চাওয়ার ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান কি?

কোনো মানুষ আধ্যাত্মিকতার একটা লেভেলে পৌঁছে অপরিচিত ব্যক্তির অতীত বা বর্তমান সম্পর্কে জানতে পারে-এমন বিশ্বাস আমাদের শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কারণ এসব অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র মহান আল্লাহতায়ালা,এতে কারো অংশীদার নেই। (সূরা হাশর: ২২) । তাই এভাবে অদৃশ্য জ্ঞানের বিষয়ে জানার চেষ্টা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। এর মাঝে রয়েছে অতীত, ভবিষ্যৎ সবই।

অনেক সময় তথাকথিত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের ভবিষ্যত বাণীও সত্যি হয়ে যায়। সেটা কিভাবে?

ব্যক্তির সঙ্গী ক্বারিন জ্বীন কি তার ভবিষ্যতও বলে দিতে পারে?

না , পারে না। তাহলে কিভাবে সম্ভব ভবিষ্যত সম্পর্কে বলা?

পরবর্তী পর্বে ইনশাআল্লাহ

১ম পর্বের লিংকঃ

দৃষ্টির অন্তরালে ( পর্ব ১)

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.