দৃষ্টির অন্তরালে………..(পর্ব-৩)

হাবিবা মুবাশ্বেরা

তিথিদের পাশের ফ্ল্যাটে এই মাসে নতুন প্রতিবেশী এসেছে। একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা, তাঁর এক মেয়ে আর এক ছেলে। মহিলার স্বামী নাকি দেশের বাইরে থাকেন। তিথি স্বভাবগতভাবেই খুব একটা মিশুক নয়। তাই যেচে আলাপ করতে গেল না ওদের সাথে। ভদ্রমহিলাকেও কেমন যেন অন্যরকম মনে হলো তিথির কাছে।

প্রায় মাস দুয়েক পর তিথির বাসার ছুটা বুয়া বলল, সে নাকি পাশের ফ্ল্যাটেও কাজ নিয়েছে। ওদের বাসায় প্রায় প্রতিদিন বিকালেই অনেক অতিথি আসে, তাই বিকাল বেলা অতিরিক্ত কাজের চাপ সামলাতে এক ঘন্টার জন্য বুয়াকে আসতে বলেছে। বুয়ার কথায় খুব একটা পাত্তা না দিলেও সেদিন বিকালে মার্কেটে যাওয়ার সময় তিথি লক্ষ্য করে দেখল, আসলেই পাশের ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে অনেক মানুষের জুতা,স্যান্ডেলের সমারোহ। এর মধ্যে বেশির ভাগই  অবার মহিলাদের স্যান্ডেল। হয়তো কোনো ধর্মীয় আলোচনার আসর বসে— এই ভেবে তিথি চলে গলে।

মার্কেট থেকে ফেরার পর বাসার নিচে তিথির দেখা হলো  কলেজ জীবনের বান্ধবী রিমার সাথে। এখানে কার বাসায় এসেছে জিজ্ঞেস করতেই রিমা বলল, “এই বিল্ডিং এর তিনতলায় একজন মহিলা জ্যোতিষী থাকেন ”,উনার কাছেই এসেছিল রিমা।

তিথি বুঝতে পারল, ওর পাশের ফ্ল্যাটের মহিলার কথা বলছে রিমা। কিন্তু উনার কাছে কেন এসেছিল জানতে চাইল তিথি।

তখন রিমা উৎসাহ নিয়ে  বলা শুরু করলো, ”এই মহিলার তো বিশেষ ক্ষমতা আছে। আমার শ্বশুর বাড়ীর আত্মীয়-স্বজনরা নিয়মিত আসেন উনার কাছে। আমার ননদের বছর দুয়েক আগে এক বখাটে ছেলের সাথে প্রেম ছিল, আমার শ্বাশুড়ি তো চিন্তায় অস্থির। এক আত্মীয় তখন ইনার খোঁজ দিলেন। ইনি আমার শ্বাশুড়িকে একটা বাদামী রংয়ের পাথর দিয়ে বলেছিলেন এই পাথর দিয়ে লকেট বানিয়ে ননদের গলায় পরিয়ে রাখতে। ৬ মাস পর ওর জন্য একটা প্রবাসী ছেলের বিয়ের প্রস্তাব আসবে, তখন নাকি ননদ নিজে থেকেই বিয়েতে রাজী হয়ে যাবে। সত্যি সত্যিই আমার ননদের এক প্রবাসী ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছে আর এখন ও স্বামীর সাথে বিদেশে সুখে সংসার করছে।”

রিমার কথায় তিথি অবাক হলেও তা চেহারায় প্রকাশ করলো না। নিরুত্তাপ স্বরে জিজ্ঞেস করলো, “তুই আবার আজ কেন এসেছিলি উনার কাছে?”

রিমা বললো, ”আমার হাজব্যান্ড ওর বন্ধুর সাথে পার্টনারশীপে নতুন একটা বিজনেস শুরু করতে চাইছে । তো বিজনেসটা শুরু করা সেইফ হবে কিনা, এটা নিয়ে কনফিউশনে আছি আমরা সবাই। আমার শ্বাশুড়ির শরীরটা ভালো না, তাই আমাকে পাঠিয়েছিলেন, জ্যোতিষ আপার কাছে।”

”তো কি বললো তোদের জ্যোতিষ আপাা?” তিথি জানতে চাইলো।

রিমা খুব খুশী গলায় বললো, “উনি বললেন , এই ব্যবসায় ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। তারপরও সতর্কতা  হিসেবে একটা পাথর দিয়ে বললেন , এটা দিয়ে অংটি বানিয়ে পরে থাকলে আমার হাসব্যান্ডের সাথে আর কেউ চিট করতে পারবে না। ”

রিমা এতটা আত্মবিশ্বাসের সাথে কথাগুলো বললো যে, তিথিরও কেমন জানি একটা ভক্তি চলে এল, এই না দেখা জ্যোতিষ মহিলার প্রতি। রিমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের বাসায় ফিরতে ফিরতে  তিথি ভাবতে লাগল, আসলেই কি সম্ভব এভাবে বিয়ে বা রিজিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে নির্ভূল ভবিষ্যত বাণী করা?
————————————————————————————————-
উপরোক্ত কাহিনীর চরিত্র তিথির মতো  আমরাও অনেক সময় হাতের রেখা দেখে , টিয়া পাখি/বানরের মাধ্যমে কিংবা গ্রহ-নক্ষত্ররের অবস্থান পর্যালোচনা করে অনেককেই ভবিষ্যত বাণী করতে দেখি এবং কখনও কখনও তা মিলে গেলে ঐ ব্যক্তির অলৌকিক ক্ষমতা আছে ভেবে চমৎকৃত হয়ে যাই। আসলে কি ঘটে দৃষ্টির অন্তরালে ?

চলুন, জানার চেষ্টা করি।

বস্তুত  পৃথিবীতে কোনও মানুষের এমন কোন বিশেষ ক্ষমতা নেই যে, সে কোনো ব্যক্তির ভবিষ্যত বলতে পারে। আসলে এসব কিছুই করা হয় জ্বীনদের সহায়তা নিয়ে। এসব তথাকথিত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের শয়তানের অনুসারী জ্বীনদের সাথে যোগাযোগ থাকে। তবে  এই জ্বীনরা  কোনও ব্যক্তির ভবিষ্যত জানে না। এমনকি প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গী জ্বীন ক্বারিনও ঐ ব্যক্তির ভবিষ্যত জানে না।

এসব অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা। তিনি  তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর সৃষ্টির কোন অংশকে গায়েব সম্পর্কে অবহিত করেন। যেহেতু ফেরেশতারা মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী পৃথিবীতে মানুষের রিযিকের বিলিবন্টন সংক্রান্ত কাজগুলোর দায়িত্ব পালন করেন  তাই তিনি যখন স্বেচ্ছায় ফেরেশতাগণের নিকট কোনো মানুষের ভবিষ্যতের রিযিক সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করেন তখন ফেরেশতারা তা জানতে পারেন। আর জ্বীনরা এই সুযোগটাই গ্রহণ করে।

এরপর কি হয় সে সম্পর্কে রাসূল (সা:) বলেছেন-
”ফেরেশতারা এরপর আকাশের সীমানায় নেমে আসমানে মীমাংসা হওয়া বিষয়ের উল্লেখ করলে  জ্বীনরা তা চুরি করে শোনে এবং পরবর্তীতে তার সাথে আরও কিছু কাল্পনিক কথার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তা জ্যোতিষীদের কাছে জানিয়ে দেয়।  ( সহীহ বুখারী:৩২১০)।

এভাবে  জ্বীনদের সহায়তায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা ভবিষ্যতবাণী করে এবং  অনেক সময় তা  সত্যি হয়ে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে রাসূল (সা: ) এর নবুয়্যতের পূর্বে জ্বীনরা আকাশের সীমানায় অবাধে বিচরণ করতে পারতো, আসমানে গৃহীত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জানা তাদের জন্য সহজ ছিল।  কিন্তু কুরআন নাযিল হওয়া শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের প্রথম আসমান পার হওয়ার ক্ষমতা চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর থেকে কোনো খবর তাদের শুনতে হয় চুরি করে, যদি ফেরেশতারা টের পেয়ে যায় তাহলে আগুনের গোলা ছুঁড়ে দেয়া হয় (৬৭:৫) । যারা পালিয়ে বাঁচতে পারে, শুধু তারাই কিছুটা খবর সংগ্রহ করতে পারে।

কেউ যদি নিজে জ্বীনদের সাথে সম্পর্ক না রাখে, কিন্তু নিজের বা অন্যের  ভবিষ্যত সম্পর্কে জানতে ভবিষ্যত বক্তার কাছে  যায় ,তবে তার সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য কি?

রাসূল (সা:) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ভবিষ্যত বক্তার কাছে যাবে এবং তাকে কোনও কথা জিজ্ঞেস করবে ৪০ দিন তার সালাত কবুল করা হবে না ।”(মুসলিম ২২৩০)

আরেকটি হাদীসে বলা হয়েছে,
“যে ব্যক্তি ভবিষ্যত বক্তার কাছে আসে এবং সে যা বলে তাকে সত্য বলে স্বীকার করে সে মুহাম্মদ (সা:) এর উপর যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি কুফরী করল।” (আহমদ)

অর্থ্যাৎ একথা স্পষ্ট যে, অতীত বা বর্তমানের মতো ভবিষ্যতও যেহেতু অদৃশ্য জ্ঞানের অন্তর্ভূক্ত এবং   তাওহীদের অন্যতম মূলনীতি অনুযায়ী আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও এতে অংশীদার নেই তাই কোন ব্যক্তির কাছে অদৃশ্য জ্ঞান সম্পর্কে জানতে চাওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
———————————————————————————–
জ্বীনরা কেন তথাকথিত অলৌকিক ব্যক্তিদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করে? জ্বীনরা কি তাদের পোষ্য হয়ে যায়?
উত্তর হলো –না। তাহলে জ্বীনদের প্রাপ্তি কি? (পরবর্তী পর্বে ইনশাআল্লাহ)

লেখকঃ সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.