বাঙালি পুরুষের মন

ইস্তাম্বুলের বড় বড় শপিং সেন্টারের একটার সামনে দিয়ে হাটছিলাম। একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গ্লাসের বাইরে থেকে শো করা ড্রেসগুলো দেখছিলাম। একটা মেয়ে হটাত দোকান থেকে বের হয়ে আসলো মেয়েটা সেলস গার্ল। আমাকে বলল – তুমি কী একটু ভেতরে আসবে? আমি গেলাম। যাওয়ার পরে সে বলল- এতো সুন্দর তুমি! কী সুন্দর গায়ের রং চকলেটের মতো। চামড়া তোমার কী মসৃণ, কী চিকচিক! আর চোখগুলো কী অদ্ভূত শিল্প! তোমার দেশ কোথায়? আমি বললাম – বাংলাদেশ। মেয়েটা বলল- হ্যা! ইন্ডিয়ানদের মতো দেখায়! আমি বললাম – তুমি ও তো খুব সুন্দর দেখতে! কিন্ত মেয়েটা জোর দিয়ে বললো না না তুমিই বেশি সুন্দর।
তুরস্কে নানান দেশের নানার রকম মানুষ দেখেছি। একেক সমাজে সৌন্দর্যের স্ট্যান্ডার্ড একেক রকম। একদম ধবধবে সাদারাও নিজেদের সুন্দর মনে করেনা এটা হয়তো একটা শ্বেত সমাজে না মিশলে কখনোই অনুধাবন করতে পারতাম না। তবে যে দেশে সবাই সাদা সে দেশে শুধু সাদা হওয়াটাই সৌন্দর্যের মাপকাঠি নয়, এটা বলাই বাহুল্য । বরং মানুষ যখন শুনে এটা আমাদের দেশে সব যোগ্যতার মাপকাঠি তখন কৌতুক অনুভব করে।
এতো কথা বলার মূল কারন হলো আমাদের সমাজের গতি প্রকৃতি আর বাঙালি পুরুষের মনকে আরেকটু বুঝে দেখা। ৯০ ভাগ শ্যামবর্নের মানুষের দেশে ঘরে ঘরে শ্যামলা মেয়ে নিয়ে চিন্তার কোনো শেষ নেই। একটা মানুষের গায়ের রং কোনো কিছু থামিয়ে রাখতে পারেনা। একটা শ্যামলা মেয়ে ডাক্তার হয়, ইঞ্জিনিয়ার হয়, ইউনিভার্সিটির টিচার হয়, আর যা যা হওয়া যায় সবকিছুই হয়। এতো কিছু হওয়ার পরেও মাথা উচু করে অনেক পরিবারেরই ঘরের বউ হতে পারেনা। একটা ডাক্তার /ইঞ্জিনিয়ার/ ব্যারিস্টার/ মাস্টার্স পাশ মেয়ে আর কিছু না চাক বা না পাক অন্তত তার সমান যোগ্যতার একজন পুরুষকে বিয়ে করতে চায়। এক্ষেত্রে দেখা যায়, শ্যামলা উচ্চ শিক্ষিত মেয়েগুলোর নখরা তুলনামূলক কম। অনেক পুরুষ এইসব অভিযোগ পাশ কাটাতে যেয়ে বলে থাকেন – মেয়ে পক্ষ এতো লাখ টাকা মোহর চাইছে অথবা গাড়ি বাড়ি ভালো প্রতিষ্ঠিত না হলে কোনো মেয়ে বিয়ে করতে চায়না, কোনো বাবা মা মেয়ে বিয়ে দিতে চায়না ইত্যাদি। এই কোনো মেয়েগুলো আসলে শ্যাম বর্নের মেয়ে নয়, এরা হয় অনেক সুন্দরী দশজনে একজন না হয় এদের বাবা পাঁচতলা বাড়ির মালিক, অনেক টাকাওয়ালা মেয়ের বাবা। এই কোনো মেয়ের ক্যাটাগরিতে সেই শ্যামলা, উচ্চ শিক্ষিত মেয়েগুলো পড়েনা, যারা উচ্চশিক্ষিত মোটামুটি জীবন চালাতে সক্ষম ছেলেদের বিয়ে করতে সম্মত। এখানেই বাঙালি পুরুষের বড় একটা হিপোক্রেসি পানির মতো স্বচ্ছ হয়ে ধরা দেয়! মেয়ে বা মেয়ে পক্ষের অতিরিক্ত চাওয়া পাওয়াকে মুন্ডুপাত করতেই থাকে, অথচ নিজেরাও যে অতিরিক্ত চাওয়ার বেড়াজালে দিকভ্রান্ত তা কিছুতেই বুঝতে পারেনা।
উচ্চশিক্ষিত সমাজের অংশ হিসেবে অনেক উচ্চ শিক্ষিত পুরুষদের জীবনসঙ্গী চাওয়ার ক্রাইটেরিয়া সম্পর্কে আইডিয়া হয়েছে। কী ডাক্তার, কী ইঞ্জিনিয়ার, কী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কী বা বি সি এস ক্যাডার! বেশিরভাগেরই পাত্রী চাওয়ার লিস্টে সাদা চামড়ার অগ্রাধিকার আশংকাজনক। অন্য কোন গুণ থাকুক বা না থাকুক , সবচেয়ে শিক্ষিত উন্নত মানসিকতার পাত্র থেকে শুরু করে কোনোরকম প্রতিষ্ঠিত পাত্রের চাহিদা একই। এইভাবে জীবনসঙ্গী নির্বাচনের বাঙালি পুরুষের ফর্মুলার ফলে সমাজে সম-যোগ্যতা সম্পন্ন জুটি এবং পরবর্তিতে পরিবার তৈরি হচ্ছেনা। পরিবারের বাচ্চাদের উপর মায়ের জ্ঞান দক্ষতার প্রভাব অনেক বেশি হওয়াতে এ ধরনের পুরুষরা পরবর্তিতে সন্তানের প্রতিপালনে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় ভুগছেন।
প্রশ্ন উঠবে তাহলে কী যেসব মেয়েরা উচ্চশিক্ষিত হয়না তারা সশিক্ষিত ও নয়। অবশ্যই একাডেমিক জ্ঞান ছাড়া ও মানুষ শিক্ষিত রুচিশীল হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো বাঙালি পুরুষের রুচিতে। তাদের পাত্রী চাওয়ার তালিকায় প্রথম শব্দটায় সমস্যা। এই সমস্যার কারনে সমাজে একটা বিরাট সংখ্যক নারী উচ্চশিক্ষিত হয়েও উপযুক্ত পাত্রের অভাবে গঠনমূলক পরিবার গড়ে তুলতে পারছেনা। বড় হাসি পায় যখন একটা মাস্টার্স পাস শ্যামলা মেয়ের জন্য একটা মাধ্যমিক পাশ ছেলের প্রস্তাব দয়া করে দেওয়া হয় মেয়েটার বিয়ে হচ্ছেনা বলে!
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আসলে সেটা ও ভাগ্যের ব্যাপার , শ্যামলা মেয়েদের বিয়ে নিয়ে কেউ কথা বলতে চায়না। অনেকে পায়ে বা গলায় জোর ও পায়না। আফ্রিকান এক ক্লাসমেট ছিল, মার্কি , তাকে দেখতাম তার কুচকুচে কালো বউ নিয়ে সে কতো সুখে আছে! দুজনেই ইউনিভার্সিটির টিচার। আর এই ৯০ ভাগ শ্যামলা মানুষের দেশে শ্যামলা মেয়ে নিয়ে ঘর করার কথা ৯৯ভাগ ছেলে স্বপ্নে ও চিন্তা করতে পারেনা। নচিকেতার গানের মতো – বংশের ইজ্জত রাখতে হলে বউ হতে হবে ফর্সা টাইপ অবস্থা!
বাঙালি পুরুষের সাদা চামড়া প্রেমি মন আর এই পুরুষশাসিত সমাজে শ্যাম বর্নের বিদূষীরা বড় কষ্টে আছে। সমাজের আনাচে কানাচে আল্লাহর দেওয়া শরীরের কারনে সর্বোচ্চ মানবিক গুণ অর্জনের পরেও অনেকেই বড় একা, বন্ধুহীন। দিনশেষে নানা রকম কম্প্রোমাইজ করে যোগ্য জীবনসাথী ছাড়াই জীবন কাটিয়ে দিতে হচ্ছে বর্নবৈষম্যের এই সমাজে শ্যাম বর্নের বহু নারী জীবন যোদ্ধাকে…………

শেখ সাফওয়ানা জেরিন

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.