হৃদয় দহন

ইশরাত জাহান রোজী

গভীর রাত! ঘুম আসে না মারিয়ার চোখে। নিজের অপরাধবোধে জর্জরিত ও নিজেই। অপরাধবোধটুকু খচখচ করে বুকের ভিতর জ্বালাটুকু বাড়িয়ে তোলে। গভীর থেকে গভীর হতে থাকে সেই দহন।

বিছানায় মারিয়ার পাশেই কম্বল গায়ে গভীর ঘুমে অচেতন মারিয়ার হাজবেন্ড মাহমুদ। কিন্তু মারিয়ার অস্থির মন, নির্ঘুম চোখ। নরম, পশমওয়ালা গরম কম্বল গা থেকে সরিয়ে বিছানা থেকে নিচে নামে মারিয়া। কম্বলের গরম থেকে বের হওয়ায় হঠাৎ করেই ঠান্ডা লাগে। বিছানার পাশেই রোলিং চেয়ারে পড়ে থাকা কাশ্মীরী কালো শালটা শাড়ির উপরে গায়ে জড়িয়ে নেয় আলগোছে।

ঘরের আলো-আঁধারির মধ্যেও দেয়ালে আটকে থাকা কালো দেয়াল ঘড়িটায় খুব সুক্ষচোখে তাকিয়ে দেখে সময় তখন, রাত তিনটা বিশ বাজে।

কাস্মীরী শালেও শরীরের ঠান্ডা কমে না। বড্ড ঠান্ডা পড়েছে ক’দিন থেকে। এবারে বেশ কয়েকবার শৈত্য প্রবাহ হওয়ার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। প্রমাণও মিলছে তার। বাইরে বেশ বাতাস। গতকাল তো বৃষ্টিই হয়ে গেল এক পশলা। তাই আরও শীত পড়েছে।

মারিয়া রান্না ঘরে যায়। ওর খুব ঠান্ডা লাগলে বেশি আদা দিয়ে এক কাপ রঙ চা খায়। এই মাঝ রাতের ঠান্ডায় ওর চা খেতে ইচ্ছে করে খুব।

এক কাপ চা বানিয়ে বেলকনিতে দাঁড়ায়। সামনে শহরের পিচঢালা প্রধান ব্যস্ত সড়ক। এই গভীর রাতেও এই রাস্তায় গাড়ি চলাচল করে। রাস্তাটার বুকের উপর দিয়ে গাড়িগুলো চলে যায় শা শা বেগে…

কিছু শ্রমিক শ্রেণির লোকজনের আনাগোনা চোখে পড়ে। কিছু বিলাসী মানুষের লং ড্রাইভ নামক বিলাসিতার উদাহরণ দেখা যায়। কিছু জরুরি কাজের মানুষও তার মধ্যে শামিল থাকে…

বিচিত্র জীবনে কত বিচিত্র কিছুই চোখে পড়ে। এসব দেখতে দেখতেই আবার সেই বিকেলের দৃশ্যটা চোখে ভেসে উঠে,যে দৃশ্যটা বুকের ভিতর খচখচ করে যন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছে। যে দৃশ্যটুকু মনে অপরাধবোধের জন্ম দিয়েছে। যে দৃশ্য দেখার যন্ত্রণাটা আজ মারিয়ার ঘুম নষ্ট করে ফেলেছে…

মারিয়া আজ দুপুরের পর বানিজ্য মেলায় গিয়েছিল তার স্বামীর সাথে। বেশ কেনাকাটা করে ফিরছিল। দু’জনের হাতেই ব্যাগভর্তি জিনিসপত্র। সাংসারিক কিছু প্রয়োজনীয়, কিছু অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। খুশি মনেই ওরা স্বামী-স্ত্রী হাঁটতে হাঁটতে এগোচ্ছিল গাড়ির দিকে।

এগোতে এগোতে হঠাৎ-ই মারিয়ার চোখ পড়ে ফুটপাতে শুয়ে থাকা একটি মেয়ের দিকে। বুকের সাথে জড়িয়ে আছে একটি দু’আড়াই বছরের বাচ্চা। গায়ে তেমন কোনো গরম কাপড় নেই। শুধু আঁচল দিয়ে বাচ্চার শরীরটা ঢাকা। মেঝেতেও কিছু বিছানো নেই। এক পলক চোখ ফেলেই স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে পাশ কাটিয়ে চলে আসে মারিয়া আর ওর হাজবেন্ড। শুধু মারিয়া-ই পাশ কাটিয়ে চলে আসে তা তো নয়, মারিয়ার মতো কতশত মানুষ পাশ কাটিয়ে ওর মতোই চলে যায়, চলে আসে।

কিন্তু? কিন্তু সময় যতটা যেতে থাকে মারিয়ার মনের যন্ত্রণা ততই বাড়তে থাকে। বাইরের হু হু বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে ওর বুকের ভিতরটাও হু হু করে উঠতে থাকে তার চাইতেও অধিক গুণে। একটা অপরাধবোধ কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে থাকে।

বার বার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করে ও, ওর কিছু করার ছিল কি? কেন কিছু না করেই পালিয়ে এলো ও?

নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না মারিয়া। ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে বিবেকের দংশনে। কত দৃশ্যই তো পথে-ঘাটে প্রায় দিন ও দেখে।কিন্তু কই এমন করে হু হু করে তো খুব কমই উঠে মনটা। আজ কেন তবে মনটাকে ভেঙে-চুরে দিচ্ছে এই চিরাচরিত দৃশ্যটা, যেটা রোজই তো কেউ না কেউ দেখেই।

আচ্ছা,যারা রাস্তা-ঘাটে এমন দৃশ্য প্রায় দিন দেখে বাড়ি ফিরে তাদেরও কি এমন করেই বুকের ভিতর হু হু করে? যন্ত্রণায় মাঝরাতে এমন করে ক’জনের ঘুম নষ্ট হয়? অপরাধবোধে ক’জনের কলিজাটায় এমন জ্বালাময়ী খচখচানি অনুভব হয়?

গভীর রাতে প্রশ্নগুলো মারিয়ার মাথায় ঘুরতে থাকে। বুক চিরে পর পর কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুকের গভীর থেকে।
এমন সময় দূর থেকে ফজরের আজান ভেসে আসে।

শেষ দীর্ঘশ্বাসটা বেলকনির বাতাসে মিলিয়ে দিয়ে মারিয়া ঘরে এসে বেলকনির দরজাটা বন্ধ করে। ফজরের নামাজটা পড়েই আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চেয়ে মনের শান্তি নিয়ে একটু ঘুমাতে চায় মারিয়া।

ইশরাত জাহান রোজী কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন