মহীয়সীর কলাম:বিশ্ব পানি দিবস

নুরে আলম মুকতা

” এক্ষণে হোসেনের অস্ত্রাঘাতে সেই কারবালা একেবারে জনশূন্য নীরব প্রান্তর। হোসেন ব্যতীত প্রাণশূন্য ফোরাততীর প্রকৃতিদেবীর বক্ষক্ষেত্রস্থ স্বাভাবিক শোভা একেবারে পরিবর্তিত হইয়া লোহিতবর্ণ ধারন করিয়াছে…….এ জলের নিমিত্তই আমার পরিজনেরা পুত্রহারা,পতিহারা,ভাতৃহারা হইয়া মাথা ভাঙ্গিয়া মরিতেছে….,আমি নিজে সেই জল পান করিব! ধিক্ আমার প্রাণে…”
ষড়বিংশ প্রবাহ,১৫৩ পৃষ্ঠা, মহররম পর্ব,বিষাদসিন্ধু, মীর মশাররফ হোসেন।
আজ এ মহাঘটনার অবতারনা করার ইচ্ছে আমার একদম ছিলো না। কিন্তু বাধ্য হয়ে শুরু করলাম, বিবেকের দায়। কত দিনই তো যায় আসে। কিন্তু পানি দিবস! সত্যিই একটি দিবস মনে হয় মনে রেখাপাত করে ভাবার মতো দিন। গত ২২ মার্চ ছিলো বিশ্ব পানি দিবস। টিভির মতো ইদানীং দৈনিক পত্রিকাগুলোও আমাদের টানে না। কেন টানেনা কম বেশি সবাই জানি। বলি না। কিন্তু একটি রোগ তো আমাদের থাকবেই। ছাগল সুযোগ পেলে কলমিও খায়। আমাদেরও তাই মনে হয়। দৈনিক ইত্তেফাকের একটি রিপোর্ট বলছে বিশ্বে প্রতিদিন বিশুদ্ধ পানি আর পয়নিস্কাশন ব্যবস্থার অভাবে পাঁচবছরের কম বয়সী এক হাজার চারশো জন শিশু মারা যাচ্ছে। অন্য একটি পরিসংখ্যান বলছে এ সংখ্যা পাঁচহাজার। শিশুরা পানি সঙ্কটের সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। সুপেয় পানি প্রাপ্তির সুযোগ বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত। জাতিসংঘ পানি অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। নিরাপদ পানির অধিকার বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই আবার চরম দরিদ্র।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ আবার বাস করে গ্রামে। প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভীতিকর অবস্থায় এক থেকে দেড়ফুট নীচে নেমে যাচ্ছে। যার অর্থ হলো এরকম যে, যার যার এলাকায় ভুগর্ভের পানি ফুরিয়ে যাচ্ছে। আফ্রিকার অবস্থা ভয়াবহ দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা বিপন্ন হয়ে যাচ্ছি আশঙ্কাজনক ভাবে। কেমন করে আমরা বিপন্ন হয়ে যাচ্ছি দেখুন—-
তিন ভাগ গ্রাসিয়াছ একভাগ বাঁকী
সুরা নাই পাত্রহাতে,কাঁপিতেছে সাকী—–
সব গেছে, আছে শুধু ক্রন্দন কল্লোল
আছে জ্বালা,আছে স্মৃতি, ব্যথা উতরোল…….উর্ধে শূন্য নিম্নে শূন্য,শূন্য চারিধার,
নিম্নে কাঁদে বারিধার, সীমাহীন রিক্ত হাহাকার।
 সিন্ধু, তৃতীয় তরঙ্গ,সিন্ধুহিল্লোল- কাজী নজরুল ইসলাম।
সৌজন্যে-ইত্তেফাক ২২ মার্চ সংখ্যা
 এবার আরেক বাঁকে যাই –The Rime of the Ancient Mariner এ  Samuel Taylor Coleridge কি বললেন দেখুন,
Water water everywhere, nor a drop to drink.
সিন্ধু-গঙ্গা-পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-গৌরী শুকিয়ে মাঠ হয়ে যাবে। ভুগর্ভস্থ পানি নীচে হারিয়ে যাবে। অনাবৃষ্টি চলমান থাকবে। লোনা সমুদ্রের অথৈ পানি পানের অযোগ্য! তাহলে  মানুষ পশু-পাখীর কি হবে! শরৎ বাবু বলেছিলেন, ভগবান না করুন কোন সমাজে নারী আর জলের অভাব হোক। আমরা আরো একটি যোগ করি আল্লাহ না করুন অক্সিজেন ফুরিয়ে যাক। কি অবস্থা হবে তাতো করোনা দেখিয়েই দিয়েছে। পানির অভাব হলে কি পরিনতি হবে তা এখনই আমাদের অনুধাবন না করলে বিপর্যয় নেমে আসবে। গর্ভ না থাকলে জন্ম পাবেন কোথায়?  মেয়ে অনেক আছে যারা বলেন তাদের আমি বলি ছেলের বিয়ে দেয়ার সময় মেয়ে পাচ্ছেন না কেন ? বিষাদ সিন্ধু দিয়ে শুরু করেছিলাম। পানির ভয়াবহতা আর তৃষ্ণা কি ভয়ানক তা এ দলিলের চাইতে আর কিছু স্পষ্ট হয় না। আমি এক খাঁ খাঁ তপ্ত দুপুরে দাঁড়িয়েছিলাম ওহদের প্রান্তরে। চিন্তা করছিলাম তৃষ্ণার্ত শহীদের কথা। হৃদয় ভেঙ্গে খান খান হয়ে গিয়েছিলো। নিজে তৃষ্ণার্ত হয়ে বেশিক্ষণ তিষ্ঠাতে পারিনি।
বিশ্ব পানি দিবস, তৃষ্ণা দিবস, অক্সিজেন দিবস এগুলো এখন আমাদের পালন করা জরুরি হয়ে গিয়েছে। আমি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলতে পারি  পানি দিবসের মতো নিরাপদ নিঃশ্বাস দিবস বা অক্সিজেন দিবস এ গ্রহবাসীকে একদিন সাড়ম্বরে পালন করতেই হবে ।

লেখকঃ কলাম লেখক,কবি-সাহিত্যিক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী

আরও পড়ুন