আল কোরআন ও আরবি ভাষা

।। তমসুর হোসেন ।।

 

পবিত্র কোরআন আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে মুহাম্মাদ (সা.) এর উপর নাযিলকৃত পরিপূর্ণ জীবনবিধান। অতীতের সমস্ত আসমানি কিতাবের সারবস্তু ধারণ করে এই মহাগ্রন্থ পৃথিবীতে এসেছে সত্যের সমর্থনকারী হিসেবে। কোরআন কারীমের প্রকৃত নাম আল কোরআন, আল ফুরকান, আয্ যিকর, আল কিতাব এবং আত্ তানযীল। মাতবা’আতে মুস্তাফা আল-বালী, মিসর তার আত্-তালবীহ্ মা’আত-তাওযীহ্ গ্রন্থে কোরআন কারীমের পারিভাষিক সংজ্ঞা এভাবে নির্দ্ধারণ করেছেন : “আল্লাহতালার এমন বাণী যা মুহাম্মাদ (সা.) এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে, যা মাসহাফের মধ্যে লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং সন্দেহাতীতভাবে ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় আমাদের নিকট পৌঁছেছে।” কোরআন সাড়ে ছয়হাজার বাক্যের এমন এক অলৌকিক কালেকসন যার ঔজ্জ্বল্য এবং শব্দদ্যোতনা মানবসৃষ্ট সমস্ত বিভেদ রেখা মুছে দিয়ে একটি সুন্দর সমাজ তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে। যার সমর্থনে আল্লাহপাক বলেন : “ সত্য ও ন্যায়ের দিক থেকে তোমার পালনকর্তার বাণী সম্পূর্ণ এবং তার বাণী পরিবর্তন করার কেউ নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” ( আনয়াম : ১১৫ )

 

চুড়ান্ত এবং সর্বশেষ ঐশি পুস্তক হিসেবে কোরআন ইসলামের প্রধান ভিত্তি। যার অধিকাংশ সুরা শুনে মনে হয় এসবের ভেতর ছন্দের অনুরণন আছে। এ গ্রন্থ মানুষের রচনা নয় এবং মানব ইতিহাসের এক সংকটময় অধ্যায়ে আরবি ভাষায় অবতীর্ণ আসমানি প্রত্যাদেশ। ইসলামের একমাত্র আশ্চর্য বস্তু এবং যুগপৎ মুহাম্মাদ (সা.) এর নবুওয়তের উৎকৃষ্ট প্রামাণ্য গ্রন্থ। বাইবেলের নতুন এবং পুরাতন নিয়মের মতো কোরআন অনুপ্রাণিত তৃতীয় জনের বর্ণনা নয় বরং আল্লাহর বিশুদ্ধ বাণী যা সরাসরি জিবরীল ফিরিশতার মাধ্যমে নবির (সা.) কাছে পৌঁছেছে। একজন অমুসলিম কোরআনের ডিভাইন চরিত্রকে অস্বীকার করলেও এর মানব কল্যাণের উদ্দেশ্য সম্বলিত সুগভীর চেতনাকে খাটো করে দেখতে পারে না। এর চিত্তাকর্ষক রূপটি যা এর ভাষাগত দৃঢ়তা এবং শুদ্ধশক্তির মাধ্যমে উচ্চকিত হয়েছে, সেই অমিয় সৌন্দর্যকে কখনই অস্বীকার করা যায় না। যে রূপের চমক Johann Wolfgang, Von Goethi , Friedrich Ruckert কে অভিভূত করে দিয়েছিল।

 

আল কোরআন নাযিল হয়েছে আরবি ভাষী এমন জনগোষ্ঠির উপর যাদের অমার্জিত আবেগ এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসিকতা পারিপার্শিক পৃথিবীর নীতিহীন অস্থিরতার সাথে মিশে একটি নির্য়াতনমূলক মনগড়া সমাজব্যবস্থার সৃষ্টি করেছে। এর নিগঢ় থেকে মজলুম জনতাকে মুক্তি দেয়ার জন্য স্নিগ্ধ বাতাসের মতো বয়ে আসে মহাগ্রন্থ আল কোরআন। আল্লাহপাক বলেন : “এবং এভাবে আমি অবতীর্ণ করেছি এক নির্দেশ, আরবি ভাষায়। জ্ঞানপ্রাপ্তির পরও তুমি যদি তাদের খেয়ালখুশির অনুসরণ কর তবে আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমার কোন অভিভাবক ও রক্ষক থাকবে না।” (রাদ ঃ ৩৭)

 

আরবি ভাষায় কোরআন নাযিলের প্রসঙ্গটি কেন এতটা গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে তা ভেবে দেখার বিষয়। পৃথিবীর অসংখ্য ভাষার মধ্যে আরবিও একটি ভাষা। সমুন্নত রোমাণ ভাষায় কোরআন অবতীর্ণ না করে বিচ্ছিন্ন আরব উপদ্বীপের নিভৃত এ ভাষাকে কেন আল্লাহপাক তাঁর মহান গ্রন্থের জন্য মনোনীত করলেন। বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবলে বুঝা যাবে যে এ মহান কিতাবের শব্দ ও তার ভাবার্থ রক্ষার যে বিশেষ ব্যবস্থাপনা আল্লাহর পক্ষ থেকে করা হয়েছে একমাত্র আরবি ভাষাই সে দাবী পূরণ করতে পারে। কালের বিবর্তনে প্রত্যেক ভাষার গঠন এবং উচ্চারণে প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে। এই ধারায় এককালের আসমানি গ্রন্থের ভাষা ইবরানি, সুরাইয়ানি এবং কালদানি পৃথিবী থেকে মুছে গেছে। অথবা সেসব ভাষায় এত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে যে তা খÐিত ও বিচূর্ণ হয়ে নতুন ভাষার জন্ম হয়েছে। কিন্তু আল্লাহপাক আরবিকে এমন বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন যার জন্য তা নানারূপ সামাজিক বিবর্তন এবং অসংখ্য রাজনৈতিক উত্থানের পরও অটুট রয়ে গেছে। কোরআনের প্রতিটি শব্দ তার নাযিল কালের অবয়ব নিয়ে আজও তার মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত আছে।

 

লেখকঃ প্রবন্ধকার

আরও পড়ুন- জীবন্ত কুরআন (পর্ব-১)

আল কোরআন ও আরবি ভাষা – আল কোরআন ও আরবি ভাষা – আল কোরআন ও আরবি ভাষা
আরও পড়ুন