ইসলামী ব্যাংকিং : তিন দশকে যেভাবে বুঝেছি (পর্ব-১ )

।। নূরুল ইসলাম খলিফা ।।
অর্থনীতি-১

 

ব্যাংকিং অর্থনীতিরই একটা অংশ । তাই ব্যাংকারদের অর্থনীতি সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকতে হয় । অর্থনীতিতে অনার্স নেই আমার, নেই মাষ্টার্সও । তবে মাধ্যমিক থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত অর্থনীতি পড়েছি , মার্শাল-ম্যালথাসকে কোট করেছি পরীক্ষার খাতায় । উৎপাদন আর চাহিদার ক্রমহ্রাসের তত্ব মুখস্ত করেছি । নিরপেক্ষ রেখা বিশ্লেষণ করে ( Indifferent curve analysis ) পরীক্ষার খাতায় চিত্র এঁকেছি ; কিন্তু বাস্তব জীবনে দীর্ঘদিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে অর্থনীতিকে যে ভাবে বুঝেছি তার একটা বিবরণ দিতে চাই । অর্থনীতির স্কলাররা ভুল সংশোধন করে দিবেন আশা করি ।

 

এক অনিন্দ্য সুন্দর পৃথিবীর বাসিন্দা আমরা। রূপ-রসে ভরা এ জগতে পায়ের নীচে কোমল মাটির সবুজ বিছানা, মাথার উপর হাজার তারার ঝিকিমিকি, নদীর কুলকুল স্রােতধারা, পাখির কলকাকলী, মৃদু মন্দ সমীরণের মায়াময় স্পর্শ, কোথাও কুলকিনারা বিহীন মহাসাগরের নীল জলরাশি আবার কোথাও বা আদিগন্ত বালুর মহাসাগর ! কী অপূর্ব এক দুনিয়া উপহার দিয়েছেন এর স্রষ্টা ! কবির ভাষায়ঃ
“বাতাস আমারে ঘিরে খেলা করে মোর চারিপাশ ,
অনন্তের কত কথা কহে নিতি নীলিমা আকাশ
চাঁদের মধুর হাসি , বিশ্বমুখে পুলক চুম্বন
মিটিমিটি চেয়ে থাকা তারকার করুণ নয়ন ,
বসন্ত নিদাঘ শোভা , বিকশিত কুসুমের হাসি,
দিকে দিকে শুধু গান , শুধু প্রেম-ভালবাসাবাসি।”

 

অফুরন্ত সৌন্দর্যের এই মায়াভরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ। জগত জোড়া এতসব উপকরণ সবই মানুষের সেবায় নিয়োজিত -মানুষের ভোগ-ব্যবহারের জন্যই সাজানো এ ধরা। মানুষের মাঝেও রয়েছে কিছু বৈচিত্র – বর্ণে , ভাষায় , স্বাদ ও রুচিতে। কেউ সাদা , কেউ কালো ,কেউ পীত বর্ণের ; কেউ পসন্দ করে সাদা তো কেউ লাল কিংবা গোলাপী। কেউ মিষ্টি পসন্দ করে তো কেউ আবার ঝাল বা টক। কিন্তু বিচিত্র ভাষা , বর্ণ এবং স্বাদের মানুষের একটা চমৎকার ঐক্যতান আছে মৌলিক প্রয়োজন পুরনের ক্ষেত্রে। মানুষ মাত্রই কিছুক্ষন পর পরই ক্ষুধা তৃষ্ণায় আক্রান্ত হয় এবং জীবন বাঁচানোর জন্য তার খাদ্য ও পানীয় দরকার। তার লজ্জা নিবারণ কিংবা দেহের শোভা বর্ধনের জন্য বস্ত্র বা কাপড় দরকার। এর পরে অবস্থানের জন্য মাথার উপর ছাদ , অসুস্থ হলে ঔষধ এবং তার আত্মিক উন্নয়ন বা অজানাকে জানার জন্য শিক্ষা। এই প্রয়োজনগুলো পুরনের বিষয়ে মানুষে মানুষে কোনো পার্থক্য নেই,নেই কোনো ব্যতিক্রম।
ব্যাসিক নীডস বা মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে অভিহিত এই প্রয়োজনগুলো পুরন করার জন্য মানুষ স্বয়ংক্রিয় ভাবে তৎপর হয়ে ওঠে , তার শ্রম মেহনত বিনিয়োগ করে এবং প্রয়োজন পুরনের সামগ্রী যোগাড়ে লেগে যায়।

 

এগুলো পুরন হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই আরো সব চাহিদা এসে হাজির হয় মানুষের সামনে। সুখ-স্বাচ্ছন্দ , আরাম-আয়েশ , ভবিষ্যত দুর্দিন মোকাবেলার জন্য সঞ্চয় , পরবর্তী বংশধরদের মসৃন পথচলা , শিল্প সৌন্দর্য ইত্যাদি চিন্তা মানুষের মাথায় এসে ভর করে। ফলে প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদ সংগ্রহ ও তা সঞ্চয় করার একটি মানসিকতা মানুষের মজ্জাগত বৈশিষ্ট। মানুষ এবং এই পৃথিবীর স্রষ্টা তাঁর সীমাহীন প্রজ্ঞা দিয়ে প্রয়োজন পুরনের এই উপাদানগুলো দিয়ে রেখেছেন পৃথিবীর বুকের মাঝে। মানুষকে দিয়েছেন তা আহরণ করার বুদ্ধি ও কৌশল। বেঁচে থাকার জন্য যে জিনিষের যত বেশি প্রয়োজন তার সরবরাহ তত বেশি করেছেন এবং কিছু দিয়েছেন মানুষের চেষ্টা প্রচেষ্টা ছাড়াই। যেমন অক্সিজেন যা নাহলে মানুষ দু’মিনিটও বেঁচে থাকতে পারে না। এটি বিনাশ্রমে এবং বিনা মুলধনেই সরবরাহ করেছেন যাকে আমরা অটো সাপ্লাই বলতে পারি। মানুষ শুধু এটার সরবরাহ পাচ্ছেই না , তারা সর্বদাই যে এই অতি প্রয়োজনীয় উপকরণটির সাগরে সাঁতার কাটছে তাও অনেক সময় বুঝতে পারে না। শুধু হাসপাতালের বেডে শুয়ে যখন অক্সিজেনের সিলিন্ডার লাগিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস করতে হয় , তখন বুঝতে পারে যে কী বিশাল অনুগ্রহ করছেন মানুষের স্রষ্টা ! এমনি করে পানির সরবরাহও বলা যায় অফুরন্ত এবং কোনো ধরণের চেষ্টা প্রচেষ্টা ছাড়াই মানুষ পানি পেয়ে যাচ্ছে। গোটা পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগ পানি দিয়ে ভরে দিয়েছেন সেই দয়ালু বিধাতা ।

 

কিন্তু অপরিসীম প্রজ্ঞা ও হিকমতের অধিকারী সেই মহান স্রষ্টা মানুষের চাহিদার এই সামগ্রীগুলো মানুষের জন্য আয়াস লব্ধ করে দিয়েছেন অর্থাৎ তা অক্সিজেন বা পানির মত অটো সাপ্লাই দেন নি। মানুষকে তার শ্রম ও মুলধন বিনিয়োগ করে এবং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তা আহরণ করতে হবে। এই সামগ্রীগুলোর স্বয়ংক্রিয় সরবরাহ না দেয়ার পিছনে যে বিশাল প্রজ্ঞা ও কল্যাণ নিহিত আছে সেটি আরেকটি বড় বিষয় যা এখানে বিস্তারিত আলাপের সুযোগ নেই এবং আমাদের আলোচ্য বিষয়ও সেটি নয়। শুধু এতটুকুনই বলা যায় যে , মানুষের প্রচেষ্টার আওতাধীন করে দিয়ে মানুষকেই তিনি বড় করেছেন ; মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করেছেন – মানব সভ্যতার ধারাবাহিক উন্নতি ও সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছেন। এই উপকরণগুলো যদি অটো সাপ্লাই বা স্বয়ংক্রিয় সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতো তা হলে মানব সভ্যতা তার আদিম স্তর অতিক্রম করতে পারতো না। এই সামগ্রীগুলোর প্রত্যেকটি তিনিই সৃষ্টি করেছেন ; এর কোনো একটাও মানুষের সৃষ্টি করার সাধ্য নেই। প্রকৃতির কোল থেকে আহরণ করার কাজটি কেবল মানুষকে করতে হয়। আবার মানুষের যোগ্যতার মধ্যেও পার্থক্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন ,যার ফলে মানুষ পৃথিবীতে পরস্পরের উপর নির্ভরশীল হয়ে আছে এবং বিশাল এই জগত সংসারটি সুন্দর ও সুচারু রূপে চলছে। আমরা তাই দেখছি যে , মানুষের সকল কর্ম প্রচেষ্টার সিংহভাগ জুড়েই থাকে জীবন জীবিকার এই সামগ্রী সংগ্রহের সাথে সম্পর্কিত। এই কার্যাবলীকেই অর্থনৈতিক কর্ম হিসেবে বলা হয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে , তাবৎ দুনিয়ার মানুষ এই সম্পদ আহরণ করার চেষ্টায় নিয়োজিত থাকে বলে এখানে একটি প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। কারন এই সামগ্রীগুলো আয়াস সাধ্য বলেই তা যথেচ্ছ পাওয়া যায় না ; অন্য কথায় চাহিদার তুলনায় সম্পদের সরবরাহ কম। এ ছাড়া মানুষের সক্ষমতার মধ্যে তারতম্য আছে বলে সবাই সমান ভাবে তা আহরণ করতেও পারে না। এজন্যই সম্পদ উৎপাদন , বরাদ্দ , বন্টন , ভোগ ও ব্যবহারের একটি নীতিমালা গড়ে উঠেছে এবং সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে এই নীতিমালাতে সংশোধন আসছে। সুতরাং সামাজিক বিজ্ঞানের যে শাখা উৎপাদন , বরাদ্দ , বন্টন ও ভোগ-ব্যবহারের আলোচন করে তাকেই অর্থনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
(চলবে)
লেখকঃ লেখকঃ সাবেক ডেপুটি ম‍্যানেজিং ডিরেক্টর , ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড 
ইসলামী ব্যাংকিং : তিন দশকে যে ভাবে বুঝেছি – ইসলামী ব্যাংকিং : তিন দশকে যে ভাবে বুঝেছি – ইসলামী ব্যাংকিং : তিন দশকে যে ভাবে বুঝেছি
আরও পড়ুন