অনন্যা

আব্দুল্লাহ আরমান

সমস্ত সাহাবীরা পাহাড়সম কষ্ট আর হতাশা বুকে নিয়ে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। হৃদয় আকাশে বিষাদের একরাশ কালো মেঘ যেন সুখের সূর্যটা ঢেকে ফেলেছে। তাঁদের মনের অবস্থা এতটাই খারাপ যে চিন্তার আতিশয্যে তাঁরা যেন একে অপরকে হত্যা করে ফেলবেন! হুদায়বিয়ার সন্ধিতে রাসূল সাঃ কতৃক মক্কার কাফিরদের অসম্মানজনক প্রস্তাবে সম্মতি ও লিখিত অনুমোদনে তাঁরা শোকাভিভূত। রাসূলের সিদ্ধান্তের প্রতি সাহাবীগণের পূর্ণ আনুগত্য থাকলেও বাহ্যিক পরাজয়ের এ সন্ধি মেনে নিতে তাঁদের কষ্ট হচ্ছিলো। আপাত দৃষ্টিতে এ সন্ধি যেন নিজ হাতে নিজেদের গলায় অপমান ও পরাজয়ের মালা পরিধানের সমতূল্য। কিন্তু রাসূলের (সাঃ) সুগভীর দূরদৃষ্টি ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা তৎক্ষনাৎ উপলব্ধি করতে না পারাই সাহাবীগণের এই মানসিক অস্থিরতার মূল কারণ।

যাইহোক,পরিস্থিতি সামাল দিতে রাসূল (সাঃ) সাহাবীদের আদেশ দিলেন “ওঠো, নিজ নিজ কোরবানির পশু জবাই করো”। একবার নয়,তিনতিন বার আদেশ করা স্বত্বেও সাহাবীরা তাঁর আদেশ বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখালেন না। যে রাসূলের সামান্য চোখের ইশারায় সকল সাহাবী (রাঃ) যে কোনো সময় নিজেদের জীবন দিতে সদা প্রস্তুত থাকেন তাঁরাই কিনা রাসূলের ‘তিনবার’ আদেশ সত্বেও চুপটি করে বসে রইলেন! এ থেকে সহজেই অনুমেয় এ চুক্তি তাঁদের মনে কতোটা বিষাদের ছায়া ফেলেছিলো!

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ও চিন্তিত মনে রাসূল (সাঃ) স্বীয় সহধর্মিণী উম্মে সালামার (রাঃ) নিকট এসে মনের ব্যাথা ব্যক্ত করলেন। মুসলিম উম্মাহর বিদুষী জননী উম্মে সালামা (রাঃ) তাঁকে সান্ত্বনা ও পরামর্শ দিয়ে বললেন,

“ হে আল্লাহর রাসূল, আপনি যদি কোরবানির পশু জবাই করা প্রয়োজন মনে করেন তাহলে কাউকে কিছু না বলে নিজেই জবাই করুন এবং নাপিত ডেকে (এহরাম থেকে হালাল হতে) মাথা মুন্ডন করুন।”

সহধর্মিণীর পরামর্শ অনুযায়ী তিনি তাই করলেন। এতক্ষণে সাহাবীগণের চৈতন্য ফিরে আসলো। রাসূলের (সাঃ) অনুসরণে তাঁরাও কোরবানি ও মাথা মুণ্ডন করে এহরাম থেকে হালাল হলেন। উম্মুল মু’মিন উম্মে সালামার (রাঃ) পরামর্শে অনাকাঙ্ক্ষিত এ পরিস্থিতি যেন নিমিষেই স্বাভাবিক হয়ে গেলো!
হুদায়বিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় ‘কুরা গামীম’ নামক স্থানে সূরা ফাতাহ অবতীর্ণ করে মহান আল্লাহ সকল মুসলিমদের এই সন্ধির মাধ্যমে ইসলামের সুস্পষ্ট বিজয়ের সুসংবাদ দান করে বলেনঃ

اِنَّا فَتَحۡنَا لَکَ فَتۡحًا مُّبِیۡنًا
অর্থঃ নিশ্চয় আমি তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয় দিয়েছি (সূরা ফাতহঃ ০১)।

এই গল্পে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে রাসূলের (সাঃ) সাথে উম্মে সালামা (রাঃ) এর কথোপকথনের অংশটি।

সন্ধিতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে রাসূল (সাঃ) রক্তপাতহীন ও যুগান্তকারী রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করে নেতৃত্বের অসাধারণ নৈপুণ্যতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হলেও তাঁর সাহাবীগণের নিয়ন্ত্রণে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি আবু বকরের মতো বিজ্ঞ ও ধীরস্থির সাহাবীর কাছে না গিয়ে মনের চাপা কষ্ট সহধর্মিণীর নিকট ব্যক্ত করলেন!

আসলে এটাই পুরুষদের সহজাত বৈশিষ্ট্য। জীবনের সব কঠিন পরিস্থিতিতে দুনিয়ার সবাই যখন অচেনা হয়ে যায় তখন তাদের অবচেতন মন স্ত্রীর স্বান্তনা,সাপোর্ট,প্রেরণা ও ভালোবাসা চায়। সত্যিকারের অনন্যা,সহযোদ্ধা ও প্রেমময়ী তো সেই যে শত বিপদেও তার বাহুডোরের আলিঙ্গন ও ভালোবাসা মিশ্রিত স্বান্তনা এবং উপযুক্ত পরামর্শ দিয়ে সর্বাবস্থায় স্বামীর পাশে থেকে তাকে শক্তি দেবে,সাহস দেবে, হাজারো প্রতিকূল মুহূর্তে তার কষ্টের অংশীদার হবে। এভাবে ক্ষণস্থায়ী জীবনের সুখে- দুঃখে দু’জোড়া হাত যদি অটুট থাকে তবে (আল্লাহর ইচ্ছায়) জান্নাত পর্যন্ত এ বাঁধন টিকিয়ে রাখতে সে দম্পতি অন্য সবার চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে!

বইঃ বিনি সুতোর বাঁধন (প্রকাশিতব্য)
গল্পঃ অনন্যা (বই থেকে সংক্ষেপিত)

লেখকঃ ইসলামী বিষয়ে কলাম লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট

আরও পড়ুন