একরঙা রংধনু

আব্দুল্লাহ আরমান

“স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা শুধুমাত্র প্রেমের প্রসন্ন দৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, আদর্শ দম্পতির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেম আর ভালোবাসা হলো পরস্পরের মন ও হৃদয়কে জানতে চাওয়া,বুঝতে চাওয়া”, কথাটি বলেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত মোটিভেশনাল স্পীকার ও লেখক ডেল কার্নেগী।

পরস্পরের হৃদয়, মন ও অন্তরাত্মার আকুতি চোখ বুঁজে বুঝতে পারার নামই বন্ধুত্ব। এই বন্ধুত্বই হলো দাম্পত্য সম্পর্কের রসায়ন গড়ে ওঠার মূল রহস্য। আর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার সেতুবন্ধন হলো দুটি মনের ভালোলাগা, ভালোবাসা, পছন্দ, আদর্শ, চেতনা,ব্যক্তিচিন্তা ও আবেগ-অনুভূতির সাদৃশ্যতা। চিন্তা-চেতনায় দুটি মানুষ দুটি ভিন্ন প্রান্তের হলে পারস্পরিক বন্ধুত্ব গড়ে ওঠা সেখানে সম্ভব নয়। আর বন্ধুত্ব যখন অসম্ভব হয়ে পড়ে, সুখ পাখি তখন হতাশার ডানা মেলে হারিয়ে যায় দূরে-বহুদূরে।

ডেল কার্নেগীর উক্তিটি নিছক কোনো তাত্বিক নীতিকথা নয়। দাম্পত্য জীবনে কথাটির সুদূরপ্রসারী বাস্তবতা বুঝেছি এক দ্বীনী বোনের নিজ হাতে লেখা কয়েক পৃষ্ঠার চিঠিটি পড়ে। চিঠির প্রতিটি শব্দের মাঝে লুকিয়ে ছিলো অসহনীয় আদ্র কষ্টের তীব্র অনুভূতি ও লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস। চিঠির সাথে মিশে থাকা ভেজা আবেগ হয়তো প্রকাশ করা সম্ভব নয় তবে তার সারাংশ অনেকটা এরকম “ওনার স্বামী সম্পূর্ণ বেনামাজি। নামাজ পড়াকে তিনি পাপিষ্ঠ লোকদের ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যম মনে করেন। তাই ওনার মতো নিষ্পাপ(?) মানুষের জন্য তা নাকি নেহাতই অনর্থক কাজ! তাই নামাজ সহ যাবতীয় ইবাদত উনি একপ্রকার এড়িয়েই চলেন!

এই বোনটি তার স্বামী ও সংসারের সমস্ত চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত সময়ে যে নফল নামাজ,রোজা, তেলাওয়াত ইত্যাদী করেন সেগুলো তার স্বামীর নিকট ‘অহেতুক বাড়াবাড়ি’। শুধু তাই নয় তাহাজ্জুদের মতো ইবাদতকে তিনি ঘুমের ব্যাঘাত ও বিরক্ত মনে করেন! একমাত্র ছেলেটিও বাবার পথ ধরে চোখের সামনে বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। অনেক বোঝানোর পরেও তার স্বামীর স্বভাবসুলভ আচরণে নূন্যতম পরিবর্তন আসেনি। অন্যান্য মাসআলার পাশাপাশি এ বিষয়ে এখন তার করণীয় কি তা জানতে তিনি চিঠিটি লিখেছেন”।

জীবনটা একেকজনের কাছে একেকরকম। কেউ ভোগ বিলাসিতার মাঝে ক্ষনস্থায়ী জীবনের সুখ খোঁজে আর কেউবা নিভৃতে ঝরে পড়া চোখের লোনাজলের মাঝে হৃদয়ের প্রশান্তি ও জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়।

ব্যক্তিভেদে সুখের উপাদান আপেক্ষিক। উপাদান নির্ধারণে ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তা-চেতনা ও আদর্শ প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে। বিয়ের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ এই চেতনা ও আদর্শের সমতাকে খুবই গুরুত্বারোপ করেছেন। (সূরা নূরঃ২৬, সূরা বাকারাঃ ২২১)।
আদর্শ বাছাই ও লালনের ক্ষেত্রেও রয়েছে মানবজাতির স্বাধীনতা (সূরা দাহরঃ০৩)। পাশাপাশি কোন আদর্শ লালনের কি পরিণতি ইসলামে তাও স্পষ্ট (সূরা ইমরানঃ৮৫)। তাই নতুন সম্পর্কের বীজ বপনের আগে পারস্পরিক আদর্শের সাদৃশ্যতা যাচাই করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মেয়েরা স্বামী ও তার পরিবারের আদর্শ,চেতনা ও আচরণ দ্বারা খুব বেশী প্রভাবিত হয়। তাই একজন মেয়ে যোগ্য স্বামীর হাত ধরে সঠিক পথের দীশা পায় অথবা রক্ষণশীলতা বিসর্জন দিয়ে ধীরে ধীরে পঙ্কিলতার সাগরে নিজেকে হারিয়ে ফেলে।

দাম্পত্য জীবনে আদর্শের পারস্পরিক বিনিময়ে অবশ্যম্ভাবী ফলাফল দুইটি; হয় নিজের আদর্শ বিকিয়ে দিয়ে অপরের আদর্শ গ্রহণ করতে হবে, নতুবা নিজের আদর্শ টিকিয়ে রাখতে আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাবে কিন্তু সেক্ষেত্রে সাংসারিক সুখ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ায় ছন্দপতন হবে।

“বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে / দ্বীনদার বানিয়ে নিবো” এই বাক্যগুলো ভুল মানুষ নির্বাচনের প্রথম ধাপ। তাই প্রাচুর্যতার লিপ্সায় কন্যার আজীবনের লালিত দ্বীনি চেতনা বিকিয়ে দিচ্ছি কিনা ভেবে দেখা একান্ত জরুরী।

বিয়ের পূর্বে হবু জীবনসঙ্গী নিয়ে প্রতিটি হৃদয় রংধনুর সপ্ত আবীরে হাজারো স্বপ্ন বুনে। কিন্তু সেই কাঙ্খিত মানুষটি মনের মতো না হলে জীবনটা একরঙা রংধনুর মতো বৈচিত্র্যহীন হয়ে যায়। কষ্টের কালো মেঘগুলোর আড়ালে ঢাকা পড়ে স্বপ্নের সাতরঙা রংধনু। আদর্শের বিরোধে পারস্পরিক ‘বন্ধুত্ব’র সাথে একটু একটু করে হারিয়ে যায় সবটুকু সুখ। তাই সোনায় সোহাগা হয়ে দাম্পত্য জীবন গড়তে সমমনা সঙ্গী বাছাই করা অত্যাবশ্যক, তা না হলে সুখ পাখির সাক্ষাৎ হয়তো সুদূরপরাহত।

সূত্রঃ লেখকের প্রকাশিতব্য বই “বিনি সুতোর বাঁধন”

লেখকঃ ইসলামী বিষয়ে কলাম লেখক, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট

আরও পড়ুন