এক টুকরো জান্নাত

-আবদুল্লাহ আরমান

সহধর্মিণীকে নিস্তব্ধতায় ঘেরা অপারেশন থিয়েটারের কক্ষে বিদায় জানিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ওয়েটিং রুমে পায়চারী করছিলাম। দীর্ঘ নয় মাসের গর্ভধারণে নিশিদিন সীমাহীন কষ্ট সহ্য করে প্রিয় মানুষটির ক্লান্ত ও অসুস্থ শরীরটা ডাক্তারের ধারালো অস্ত্রে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার কষ্ট ও নতুন মেহমানের নিরাপদে আগমনের জন্য প্রতীক্ষার প্রতিটি সেকেন্ড বুকের গভীরে এতো জোরে আঘাত করছিলো যে নিজের হৃৎস্পন্দন যেন নিজেই শুনতে পাচ্ছিলাম।

শুনেছিলাম অপেক্ষার প্রহরের গতি  নাকি কচ্ছপের ন্যায়। সেই অপেক্ষার সাথে যদি ভয়,আশংকা, বেদনার মিশ্রণ থাকে তাহলে প্রতিটি মুহূর্ত ভুক্তভোগীর জন্য কতটা নির্মম হয় তা কেবল অন্তর্যামীই জানেন।

কাঁচের দেয়াল পেরিয়ে আমার সন্তানের কান্নার আওয়াজে নিস্তব্ধ পরিবেশের ছন্দপতন ঘটলো। অন্য সবার কাছে হয়তো এটা শুভাগমন বার্তা কিন্তু আমার পিতৃহৃদয়ে এই কান্নার ভিন্ন একটি অর্থ ছিলো। কেঁদে কেঁদে আমার পুত্র যেন আমাকে বলছে; বাবা আর কষ্ট পেওনা, আমি বড় ভাইয়ার মতো নিথর প্রাণহীন দেহ নিয়ে আসিনি,এই দেখো বাবা আমি তোমার  ‘জীবিত’ সন্তান!!

সমাজের অলিখিত সংবিধান “পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই”। চোখ ভরা টলমলে আনন্দাশ্রু বারবার যেন আমাকে বলছিলো পুরুষত্বের বাঁধ ভেঙে আমাকে প্রবাহিত হওয়ার অনুমতি দাও, বুক ভরা কান্নার জোয়ার যেন বলছিলো আমাকে একটুখানি ডুকরে কাঁদতে দাও….আমি চাইলেও অনুমতি দিতে পারিনি। পুরুষ কি পারে এত সহজে সামাজিক প্রথা ভেঙে নারীর মতো কান্না করতে!

অবশেষে নার্সের কোলে চড়ে এলো “আমার এক টুকরো জান্নাত” । সুখ বা কষ্টের তীব্রতা নাকি মানুষকে পাথর বানিয়ে দেয়, সাময়িকভাবে হয়তো আমি পাথরই হয়েছিলাম কারণ ওকে কোলে নেয়ার মতো শক্তি আমার দু’বাহুতে ছিলোনা। তবে ওর চাঁদমুখ দেখে আমার পিতৃহৃদয় পুরুষত্বের কথিত সংবিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলো,পিতৃত্বের জয়ও হয়েছিলো…..। ওকে দেখে মুহূর্তেই ক্লিনিকের সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমি কাঁদলাম,হৃদয় ভরে কাঁদলাম। কান্নাজড়িত কন্ঠে ওকে শোনালাম “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ……”।

এখন দীর্ঘদিন পর কর্মস্থল থেকে ফিরে যখন আমার দ্বিতীয় পুত্র ‘মুহাম্মাদ’কে বুকে জড়িয়ে নেই, পৃথিবীর সবটুকু সুখ যেন ক্ষনিকের জন্য আমার বুকের খাঁচায় বাসা বাঁধে। আমার অবচেতন মন আল্লাহর কাছে ভেজা হৃদয়ে বারংবার শুকরিয়া করে এই জীবিত সন্তান উপহার দেয়ার জন্য, পিতার কোলে আবারও মৃত সন্তানের বোঝা চাপিয়ে না দেয়ার জন্য। একমাত্র বাবাই বোঝে মৃত সন্তানের ওজন কতটা ভারী, তার স্মৃতি বয়ে বেরানো প্রতিটি মুহূর্ত কতটা নির্মমভাবে বুকের বাঁ পাঁজরের গভীরে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়।

নিঃসন্তান দম্পতি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে অসুখী দুটি হৃদয়। তাদের হৃদয়ের ক্ষত কতটা গভীর আমার দ্বিতীয় পুত্র জন্মের আগ পর্যন্ত আমি বারংবার তা উপলব্ধি করেছি। ভুক্তভোগী ছাড়া এই দুঃসহ বেদনার তীব্রতা উপলব্ধি করার নূন্যতম সাধ্য কারও নেই। এটা এমন কষ্ট যে জন্য কটুকথা বলা দূরে থাক কেউ সরল মনে সান্ত্বনা দিলেও ব্যথার তীব্রতা হু হু করে বেড়ে যায়, বেড়ে যায় বুকের শূন্যতা। যথাযথ প্রসঙ্গ ছাড়া নিঃসন্তান দম্পতির নিকট সন্তান নিয়ে কথা বলা কিংবা অযাচিত সান্ত্বনা দেয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। পারলে অগোচরে তাদের জন্য রবের কাছে দু-হাত তুলে দোআ করুন তবু জীবন্মৃত এই মানুষগুলোকে কষ্ট দিয়ে পার্থিব কষ্টের নরকে নিক্ষেপ করবেন না প্লিজ!!

আবদুল্লাহ আরমান  কলাম লেখক।

আরও পড়ুন