জামানের জাস্টফ্রেন্ড

-সুমেরা জামান

রিসেন্টলি জামান একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছে। অতিব গোপনসুত্র  আমি জেনে গেছি ব্যাপারটা। তারা দুজন নদীর ধারে ঘুরে, রেস্টুরেন্টে খায়।
শপিং এ গিয়ে জামানকে মেয়েটি একটা পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছে। এই নিউজও আমি নখদর্পনে এনেছি আমার ট্যালেন্ট দিয়ে।

এই লোকটার একটা বাজে অভ্যাস হচ্ছে দুদিন পর পর প্রেমে পড়া। আমি ভাবি রোজ রোজ লোকটা কিভাবে প্রেমে পড়ে!  টায়ার্ড লাগে না  !
আমার তো দুটো আলুর ফ্রেঞ্চফ্রাই ভাজতেই জীবন তেজপাতা হয়ে যায়।

যাকগে । কাজ না থাকলে যা হয় আরকি!
অফিস বসে সারাদিন চ্যাটিংচিটিং।

বিরোধী দলের বাড়ির ইট, বালু, রড সিমেন্টও যেমন গোয়েন্দা বিভাগের নজরে থাকে দেশের উন্নয়ন, নিরাপত্তা, ক্ষমতাতে চড়ে বসে থাকার  স্বার্থে তেমনি আমাকেও রাষ্ট্রের সরি পরিবারের নিরাপত্তা, উন্নয়ন আর বহুবিবাহ আটকানোর স্বার্থে এসব নজরে রাখতে হয়।
এসব তথ্য অবশ্য আমাকে আমার  পায়রারা পায়ে বেঁধে নিজেরাই এনে দেয়।

গতকাল জানতে পারলাম আগামী  শুক্রবার তারা চিনু আপার রেস্টুরেন্টে দেখা করবে। চিনু আপা হলো আমার বন্ধুর বউ। বন্ধুর বউ হলেও চিনু কে আমি চিনি বহুদিন আগ থেকেই। আপা ডাকতাম তখন থেকেই। এখনও তাই। কিন্ত জামান জানেনা ওটা আমার বন্ধুর বৌয়ের রেস্টুরেন্ট।

আজ সকালে  নাস্তার সময় জামান হঠাৎ করে বলল, ‘ তুমি নাকি ইদানিং সারাদিনই ফেসবুকিং করো এটা কিন্তু ঠিক না। ‘

সারাদিন!  এইটা কি তোমাকে কাকু জানিয়েছে?

 কাকুটা আবার কে?

সম্মান করে কথা বলো। আমি কাকুর কথা বলছি।
বড়দের এভাবে বলতে হয়না।

একটা সিরিয়াস বিষয়েও তোমার ফাজলামি আসে!  ক্যামনে পারো?

নাহলে তুমি কীভাবে জানবা? এটা তো তোমার জানার কথা না। বাড়িতে তো সিসি ক্যামেরাও নেই যে ফুটেজ থেকে জানতে পারবা।

আমি সব জানি।

ও আচ্ছা তাহলে হয়তো জ্বীন জাতিই তোমার বার্তাবাহক!
শোন,  একটা খেলা করি চলো।
তাহলেই বুঝা যাবে তোমার জানা কতটা ঠিক।

কি খেলা?

খেলার নাম মিনারাজু

মানে?

আমরা আগামী শুক্রবার কাজ অদল বদল করবো।

মানে কি এসবের!

মানে খুবই সহজ।তুমি হবা রাজু আর আমি মিনা। আমি তোমার কাজ করবো আর তুমি আমার। আমি সকালে উঠে নাস্তা খেয়ে অফিসে চলে যাব। তারপর তুমি বাড়ির সব কাজ করবা। দুদিনের রান্না করবা, বাসন মাজবা, বাজার করবা। এরপর  কাপড়কেঁচে, ধুয়ে, মেলে শুকাতে দেয়া, ছাদ থেকে তুলে এনে গুছিয়ে আলমারিতে প্রত্যেকের তাকে সাজিয়ে রাখা, বাহিরের পোশাক আলাদা করে লন্ড্রি ব্যাগে তুলে রাখা,  আয়রন করতে দেয়া, মশলা ব্লেন্ড করা, বেসিন পরিষ্কার করা, ঘর ঝাড়ু দিয়ে মুছা, টয়লেট পরিষ্কার করা, ৪৯টা গাছে পানি দেয়া, আগাছা পরিস্কার করা, বাচ্চাদের পড়ানো, এদের মুখেতুলে খাইয়ে দেয়া, গোসল করনো,
টয়লেটে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইত্যাদি ইত্যাদি। একটু আমার যত্ন নিবা যেমনটা তুমি অফিস থেকে ফিরলে আমি নেই। তারপর আমার সাথে একটু ঝগড়া করবা….. এসব আরকি।

এসব কোন কাজ!  এই শুক্রবারে আমার একটা জরুরী মিটিং আছে।  অফিসের কাজে যেতে হবে নাহলে দেখিয়ে দিতাম!

শুক্রবারেও অফিস ?

তবে পরের শুক্রবার করি ?

ঠিকাছে।

জানো আমার ঐ বন্ধুটার সাথে বহুদিন পর যোগাযোগ হয়েছে। নাহিদের কথা বলছিলাম কি তোমাকে!
আমি যখন টিনেজার ছিলাম তখন সে আমাকে পাগলের মত ভালোবাসতো।
কি বলবো তোমাকে আর। নাহিদের পাগলামির কথা মনে হলে আমার এখনও হাসি লাগে। প্রতিদিন মাগরিবের সময় ছেলেটা আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতো আর গান গাইতো। চারিদিকে শুধু তুমি, তুমি,  তুমি
তুমি ছাড়া যেন সব মরুভূমি।
ও ও…..!

রাখো তোমার এসব ফালতু কথা।
অফিস যাবার সময় কুকথা। বেগানা পুরুষের কথা স্বামীর কাছে বলতে তোমার খারাপ লাগেনা?

ওহ্! ভুলেই গেছিলাম আমি। তোমার অফিসের কথা। যাও তবে। এই যে মাস্ক নাও।আল্লাহ্ হাফেজ।

আমার শ্বাশুড়ী ড্রয়িং রুম থেকে চিৎকার করে বলছে ওকে করোনার দুয়াটাও পড়ে নিতে বলো বউমা। জামানও শুনতে পেলো।পড়লো কিনা কে জানে! আমি মনেমনে  বললাম ইনি তো করোনার চেয়েও শক্তিশালী ওকা আংকেলে মতো। পড়িলেই কি আর না পড়িলেই বা কি !
প্রেম পেন্ডামিকে আক্রান্ত। না আছে দোয়া আর না ভ্যাকসিন। কেবলই ভরসা উপরওয়ালা।

যথারীতি শুক্রবার বিকেলে আমিও ভীষণ সাজগোজ করে, বিদেশী পারফিউম মেখে, দুচোখ টানটান করে সাজিয়ে গুছিয়ে টকটকে লাল রংএর হিজাব পরে নেকাব দিয়ে বের হলাম।
পরিকল্পনা মোতাবেক আমার বন্ধু নাহিদ কে আসতে বললাম ঐ রেস্টুরেন্টে।

আমরা একটু আড়ালে থেকে দেখছিলাম খুব হাসিহাসি হচ্ছে  চলছে প্রানবন্ত আলোচনা !  জামান পকেট থেকে কি যেন একটা বের করল।  মেয়েটিকে পরিয়ে দিলো হাতে। রেসলেট বা ঘড়ি টাইপ কিছু হবে!
দেখে আমার চোখে পানি চলে আসলো! এইটা আমার জামান! যে একপাতা কালো ক্লিপও কোনদিন নিজে থেকে কিনে এনে দেই নি বিয়ের তিন বছরপরও। আহারে!

নাহিদ বলছে, দোস্ত তোর মেকাপ নষ্ট করা ঠিক হচ্ছে কান্দিস না। চল আমরাও নাটকে ঢুকে পড়ি।

আমিও নাহিদের হাত ইচ্ছে করে ধরে, রাগে গজগজ করতে করতে রেস্টুরেন্টে ঢুকে ওদের টেবিলে বিপরীত পাশে বসে পড়লাম। আমি এমন একটা চেয়ারে বসলাম সেখান থেকে জামান যেন আমাকে দেখতে না পায়।

তারপর আমি আর নাহিদ মিলে খুব গল্প শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর  কফি তে চুমুক দিতে গিয়েই দেখি জামান আমার টেবিলের সামনে।

আমি :  তুমি এখানে কি করো? তোমার না মিটিং?

  জামান : হ্যাঁ, একটু কাজ ছিল এখানে তাই এসেছি।

ইতিমধ্যে আমার শ্বাশুড়ি ও এসে গেছে। ঢুকেই বলতেছে দেখিতো দেখিতো কার প্রেমে পড়ছে এবার কুলাঙ্গারটা।।

জামান : তোমার বৌমা দেখ মা দেখ।  এই বেগানা পুরুষ লোকটার সাথে বসে কফি খাচ্ছে।

আমি : মা ঐ যে দেখেন ঐ মেয়েটা।

মা: আমি পাঠাইছি কফি খেতে আমার বৌমাকে। তোর কোন সমস্যা? এই শুনকা, পাতলা, মুখের কোন ঢক নাই এই মেয়েকে তুই ভালবাসিস! এর প্রেমে পড়েছিস? হের তো বুকের কাপড়ও ঠিক নাই, মাথাও খোলা! কি চিপা জামা গায়ে দিছে । এই মেয়ে তুমি এটা পড়ে সিলাই করেছো নাকি সিলাই করে পরেছো?  তুমি জানোনা আমার ছেলে বিবাহিত। এই মেয়ে তোমার নাম কি?

জামান : মা ওর নাম মিতু , এটাই ফ্যাশান!

মা : তো বিয়ার সময় খেয়াল আছিলো না!  বোরখা পড়া
মেয়ে খুজছিলি ক্যান? ফাজিল্ডাজানিকুনখানকার !

মিতু : আন্টি আমরা তো জাস্টফ্রেন্ড! আপনি কি সব বলছেন!

মা : তোমার আগে ওর এমন আরো আটটা ছিল জাস্টবান্ধবী ছিল !

মিতু : কি জামান? এসব কি বলছে আন্টি! তুমি নাকি কোনদিন কোন মেয়ের দিকেই তাকাওনি!

মা : ছিঃ ছিঃ ছিঃ বেটা! ছিঃ! ক্যামনে পারোস তুই! কত স্বপ্ন নিয়ে, নিজের চেনা সবকিছু ছেড়ে একটা মেয়ে তার স্বামীর ঘরে আসে। আর কত প্রতারণা করবি নিজের বউটার সাথে।
আর তুই আমার ছেলে ! লজ্জাতে মাথা কাটাতে ইচ্ছা করে। আমার বৌমা কত্তো সুন্দরী! কি লক্ষী মেয়ে! হৃদয়ের চোখটা খুল।

আমি  : মা দেখেন দেখেন এই যে ঘড়িটা হাতে পরে আছে সেটাও এখনই দিলো আপনার বেটা।

জামান : মা আমি কবে বড় হবো! তোমরা সবসময় কেন আমার  পিছে পিছে ঘুরঘুর করো। জীবনে সুখ বলে কিছুই নেই আমার।  আমি কি মেয়ে মানুষ নাকি? এক স্বামী নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিব!

মা ঠাস ঠাস করে জামানের গালে দুইটা চর বসিয়ে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে আসতে আসতে বলল পশুর মতো না মানুষের মতো জীবন গঠন কর। এতেই সুখী হবি।। জাস্টফ্রেন্ড তোরে কোনদিন সুখী করবে না। ওরা তোর মতো আর ও আঠারো জনের জাস্টফ্রেন্ড।
জাস্ট মনে রাখিস।

(ইহা কেবলই লেখিকার কল্পনাপ্রসূত। এটা আমার দেখা সামাজিক জীবনের গল্প।  যা যে কারো সাথে মিলে যেতে পারে। মিলে গেলে ভাববেন না আপনাকে কটাক্ষ করে লিখেছি। দয়া করে নিজেক শুধরে নিন। )

সুমেরা জামান কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন