Ads

দ্বিতীয় বিয়ে এবং আমাদের সমাজ বাস্তবতা

 

কিছুদিন আগে ফেসবুকে দ্বিতীয় বিয়ের পক্ষে প্রচুর কথা হচ্ছিল।আলেম ওলামা থেকে সাধারণ মানুষ, শিক্ষিত থেকে অশিক্ষিত, উচ্চ স্তর থেকে নিচু স্তর পর্যন্ত প্রায় সব পুরুষই এই ইস্যুতে একই সুরে কথা বলেছে।
কথাগুলো ছিল এরকম; ইসলামে দ্বিতীয় বিয়ে কে জায়েজ করা হয়েছে।আমাদের সমাজেও দ্বিতীয় বিয়ের প্রচলন হওয়া উচিত।সবার এটাকে সহজ ভাবে নেয়া উচিত।
ব্লা ব্লা…..।
অধিকাংশ পুরুষের ভাবটা ছিল এমন যে তারা তাদের ঘরে থাকা প্রথম স্ত্রীর বাধাঁর কথা ভেবেই দ্বিতীয় বিয়ের মত সওয়াবের কাজে নিমগ্ন হতে পারছে না।আহা তাদের নির্বোধ স্ত্রীরা যদি একটু বুঝত! তাহলে তারা দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ বিয়ে করে অবলা নারী জাতিকে উদ্ধার (!) করতে পারতো।আর অমনি সমাজের যাবতীয় সমস্যা রাতারাতি উধাও হয়ে যেত।আসলে নারীরাই নারীদের ভালো চায় না, পুরুষের আর কি দোষ? সতীনের সাথে মিলেমিশে থাকলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।
তাছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে পুরুষের ইসলাম সম্মত ন্যায্য অধিকার। ঘরে ঘরে দুষ্টুমতী স্ত্রীর জন্য যুগ যুগ ধরে পুরুষেরা তাদের এই ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে।

আহারে, কি দু:খের কথা!

কিন্তু ভাই সকল, আপনারা কি সত্যিই চান সমাজে দ্বিতীয় বিয়ের প্রচলন হোক? সবাই দ্বিতীয় বিবাহকে স্বাভাবিক ভাবে নিক তাই চান?

আমার তো মনে হয় আপনারা পুরুষেরাও আসলে দ্বিতীয় বিয়ে কে সহজ ভাবে নিতে পারেন না। আগেই টাসকি খাবেন না।একটা উদাহরন দেই শুনুন-
ইসলাম দ্বিতীয় বিয়ে জায়েজ করেছে এটা সত্য কথা। তাহলে এটা যেমন আপনার জন্য সত্য তেমন অন্যান্য সকল পুরুষের জন্যও সমান সত্য।ধরুন আপনার বয়স তিরিশ, আপনার বাবার বয়স ষাট। আপনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান এটা সমাজকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে হবে। কিন্তু আপনার বাবা যখন দ্বিতীয় বিয়ে করে যুবতী বৌ নিয়ে বাসায় আসবে তখন আপনি মানতে পারবেন তো?বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীকে মেনে নেয়ার জন্য মাকে সুন্দর করে হাদীস কোরআন দিয়ে বুঝিয়ে বলতে পারবেন তো?
আবার ধরুন আপনার বোনের জামাই যদি বিয়ে করে আপনার বোনের ঘরে সতীন নিয়ে আসে তাহলে তার ঠ্যাং আস্ত রাখবেন তো? টেংরি ভাইঙ্গা দিবেন না তো?
কি পারবেন না মেনে নিতে?

আচ্ছা ভাই আপনারা পুরুষ হয়ে যদি এগুলো মানতে না পারেন তাহলে খামোখা নিরীহ স্ত্রীদের দিকে আঙুল তুলেছেন কেন? কেন আপনাদের মনে হচ্ছে মাসনা প্রসঙ্গে স্ত্রীরাই একমাত্র বাঁধা?

আমার এক পরিচিত লোক ফেসবুকে দ্বিতীয় বিয়ের অপরিহার্য গুরুত্ব বোঝাতে লিখেছে সমাজে দ্বিতীয় বিয়ের সহজ প্রচলন হলে বেশ্যাবৃত্তি থাকত না। আমি তাকে নক করে জিজ্ঞেস করলাম, ভাবি আপনাকে দ্বিতীয় বিয়ের সুযোগ দিলে আপনি নিজে কি একজন প্রফেশনাল প্রস্টিটিউট কে বিয়ে করবেন? তাহলে অন্তত একজন বেশ্যার পুনঃর্বাসন হল, সমাজের মূল স্রোতধারায় আবার যুক্ত হতে পারল।তিনি কোন রিপ্লাই দেননি।
যা করতে পারবেন না তা বলে বেড়ান কেন!

চলুন এবার ধর্মের দিকে ঘুরে বসি।
ইসলাম ধর্মে দ্বিতীয় বিয়ে জায়েজ।এই কথাটা কোরআনের যেই লাইনে বলা হয়েছে, সেই লাইনেই সয়ং আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয় বিবাহকে নিরুৎসাহিত করেছেন।কারন একাধিক স্ত্রী থাকলে তাদের সবার মধ্যে সমতা বিধান করা স্বামীর কর্তব্য। কারো ক্ষেত্রে কম বেশি হলে শেষ বিচারের দিন স্বামীকে জবাবদিহি করতে হবে এবং শাস্তি পেতে হবে।আল্লাহ বলেছেন একাধিক স্ত্রী থাকলে তোমরা হয়তো একজনের দিকে বেশি ঝুঁকে যেতে পার; তাই তোমরা একজন স্ত্রী নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চেষ্টা করো।
কুরআনে সূরা নিসায় বলা হয়েছে-
” যদি তোমরা আশঙ্কা কর, ইয়াতীমের প্রতি ইনসাফ করতে পারবে না,তাহলে যেসব মহিলা তোমাদের পছন্দ হয় তাদের মধ্যে থেকে এক দুই তিন বা চারজনকে বিয়ে করে নাও। কিন্তু যদি তোমাদের আশঙ্কা হয় যে তোমরা তাদের মধ্যে ইনসাফ করতে পারবে না, তাহলে একজনকেই বিয়ে কর।অথবা ঐসব মহিলাদের বিবি বানাও , যারা তোমাদের মালিকানায় এসেছে। অবিচার থেকে বাঁচার জন্য এটাই বেশি সহজ।” (৪:৩)

আরও বলা হয়েছে-
“তোমরা যতই আগ্রহ রাখো না কেন, তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার করতে কখনো সক্ষম হবে না……”
(সুরা নিসা4:129)

এ ব্যপারে নবী মুহাম্মদ (স:) বলেন,

“যে ব্যক্তির দুই জন স্ত্রী আছে, কিন্তু তার মধ্যে এক জনের দিকে ঝুঁকে যায়, এরূপ ব্যক্তি কিয়ামতের দিন অর্ধদেহ ধসা অবস্থায় উপস্থিত হবে।”
(আহমেদ ২/৩৪৭; আসবে সুনান; হাকিম ২/১৮৬) ইবনে হিব্বান ৪১৯)

বহুবিবাহের ইস্যুটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটা ইস্যু। ইসলমে একের অধিক বিবাহকে জায়েজ করা হয়েছে এটা আমরা সবাই জানি।কিন্তু দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ বিয়ের অনুমতি দেয়ার প্রেক্ষাপট নিয়ে বা প্রাসঙ্গিক শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা কম হয়।বহুবিবাহের আয়াত নাজিল হয়েছিলো উহুদ যুদ্ধের পর। যখন বিপুল পরিমাণ মুসলিম পুরুষ সৈন্য মারা গেলেন। নারীরা তখন কেউ বিধবা হল, কেউ এতীম হল।স্বাভাবিকভাবেই পুরুষের সংখ্যা কমে গেলো। বহুবিবাহ ছাড়া সব মেয়ের জন্য স্বামীর ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিলো না।

এখন প্রশ্ন হলো বহুবিবাহই কেন দরকার? বিয়ে ছাড়া কি মেয়েদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা যেতো না? খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান,চিকিৎসা ইত্যাদি দায়িত্বগুলো রাষ্ট্র নিলেই তো আর বহুবিবাহের দরকার ছিলো না।

উত্তর হলো রাষ্ট্র অবশ্যই মেয়েদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান আর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারতো। কিন্তু নিরাপদ যৌনসুখের ব্যবস্থা রাষ্ট্র কীভাবে করতো?
এটাওতো একটা মানুষের (নারী / পুরুষ) মৌলিক অধিকার। আর নিরাপদ যৌনতার একমাত্র অপশন হলো বিয়ে। কাজেই, বিপুল পরিমাণ মেয়ে, অল্প কয়েকজন ছেলের সমাজে বহুবিবাহের ব্যবস্থা করা না হলে বিপুল পরিমাণ নারী নিরাপদ যৌনতার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতেন।

সুতারাং দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় বিয়ের হুকুম এসেছিল নারীর স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনে, পুরুষের খায়েশ মিটানোর জন্য নয়। কিন্তু একদল বক্তাকে বলতে শোনা যায়, পুরুষের চরিত্র ঠিক রাখার জন্য নাকি ইসলামে বহু বিবাহ জায়েজ করা হয়েছে।নারী টু নারী কি সেক্সুয়াল পার্টস ভেরিফাই করে? সবার পার্টস তো একই।তাহলে চরিত্র ঠিক রাখতে আরেকটা বিয়ে করা লাগবে কেন? শুনুন, একটা বিয়েতে যায় চরিত্র ঠিক থাকে না,একশ বিয়ে করলেও তার চরিত্র ঠিক থাকবে না।

এখন নিশ্চয়ই হাদিসের ছায়ায় আশ্রয় খুজবেন? বলবেন, একাধিক বিয়ে করা সুন্নত।আল্লাহর রাসূল নিজে একাধিক বিয়ে করেছেন।
যারা মনে মনে একাধিক বিয়ের সুন্নত পালনের খায়েশ রাখেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন , আপনারা কি নিজেকে রাসূলের সমকক্ষ মনে করেন?
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তার প্রথম স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা:)জীবিত থাকতে দ্বিতীয় কোন স্ত্রী গ্রহণ করেন নি।তার পরবর্তী জীবনের বিয়েগুলো ছিল কোনটা সামাজিক কারনে, কোনটা রাজনৈতিক কারনে,কোনটা ধর্মীয় কারনে। পালিত পুত্রের স্ত্রীর সাথে দেখা দেয়া নাজায়েজ এবং বিধবা হলে বা ডিভোর্স হলে বিয়ে করা জায়েয; এই নিয়ম প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি নিজেই তালাকের পর পালিত পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করেছিলেন।মা আয়েশা সাথে তার বিয়ের পয়গাম সয়ং আল্লাহ তাআলা পাঠিয়েছিলেন।কারন তিনি উত্তম পরিকল্পনাকারী। মূলত অল্পবয়সে মানুষের স্মৃতিশক্তি ভালো থাকে।কাজেও দেখা গেল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর উম্মুল মোমেনীন আয়েশা (রা:) সর্বোচ্চসংখ্যক হাদীস বর্ণনা করেছেন।
আচ্ছা ভাইয়েরা, যারা আপনারা দ্বিতীয় বিয়ের জন্য উসখুশ করেন, আপনাদের বিয়ের জন্যও কি আসমান থেকে ফেরেস্তা নেমে আসে?

হযরত আলী (রা:) রাসূলের নিকট দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি চাইলে তিনি বলেছিলেন “যে আমার ফাতিমাকে কষ্ট দেয় সে যেন আমাকেই কষ্ট দিল।”
অর্থাৎ তিনি নিজেও প্রথম স্ত্রীর জীবদ্দশায় দ্বিতীয় বিয়ে কে নিরুৎসাহিত করেছেন।
আল্লাহর রাসূল নিজেও প্রিয়তমা খাদিজাতুল কুবরার মৃত্যুর বহুকাল পরেও গভীর রাতে একাকী তার কবরের কাছে গিয়ে কেদে বুক ভাসাতেন।

যাইহোক, এবার একটু বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি দেই। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী আমাদের দেশে পুরুষ ও নারীর অনুপাত যথাক্রমে ১০০:১০২ ।তাহলে দেখা যাচ্ছে যে নারী পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান।যদি একশ পুরুষকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে হয় তাহলে নারী থাকতে হবে দু’শ জন।কিন্তু তা তো আমাদের নেই। সুতারাং দ্বিতীয় বিয়ে কে সামাজিক আন্দোলনে পরিনত করার কোন অবকাশ নেই।
কিছু মুসলিম দেশে মাসনা, সুলাসা, রুবাবা সাধারণ কমন ব্যাপার। আবার কিছু মুসলিম দেশে ইসলামে জায়েজ সত্ত্বেও একাধিক বিয়ে বৈধ নয় ।যেমন – আজারবাইজান, তিউনেশিয়া ও তুরস্ক।
তেমনি আমাদের দেশেও একাধিক বিয়ে ধর্মীয় ভাবে জায়েজ হলেও সামাজিক ভাবে এটাকে বাকা চোখে দেখা হয়।এমনকি যদি কোন অবিবাহিত পুরুষ পাত্রী দেখাশোনার সময় জানতে পারে যে মেয়ের বাবার একাধিক স্ত্রী আছে তবে সেটাকে হেয় করে দেখা হয়।এরকম পরিবারে সহজে কোন পাত্র বিয়ে করতে রাজি হবে না। সুতরাং দেখা গেল আমাদের সমাজ বাস্তবতায় নারী পুরুষ উভয়েই একাধিক স্ত্রী থাকার বিষয়টি সহজভাবে নিতে পারে না।কারন অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিয়ে প্রয়োজনে নয়, খায়েশ মিটানোর জন্য করা হয়। তাছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করে প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে যোগাযোগও রাখেনা অনেকেই।

বিয়ে মানে শুধু ভরন পোষণের শর্তে একজন নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন নয়।বিয়ে আরও অধিক কিছু।

বিয়ে হল নিজের বাবা মা, ভাই বোন, আপনজনদের ছেড়ে আসা একটি মেয়েকে বুকে টেনে অভয় দেয়া।একে অন্যকে খুশী করতে পারার মধ্যে আত্মতৃপ্তি খুঁজে পাওয়া।বিয়ে মানে পরস্পর ঘামের গন্ধকেও আপন ভাবতে পারা। সারাদিনের কর্ম ক্লান্তি শেষে দুজন দুজনার বাহুডোরে প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া।বিয়ে মানে একজন নারীর নিজের রূপ যৌবন খুইয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সন্তান জন্ম দেয়া।বিয়ে মানে পরস্পর হৃদয় বিনিময়, সুখে দুঃখে আমৃত্যু পাশে থাকার অঙ্গীকার।

লেখকঃ রুকাইয়া মুন,প্রাবন্ধিক, কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন