বিয়ে ও বোঝাপড়া (পর্ব -১)

ইমরান হোসাইন নাঈম 

প্রতিদিন যে কয়টা বিয়ে হয়, তার চে’ বেশি ঘটে বিবাহবিচ্ছেদ। বিবাহবিচ্ছেদ যদি বেশি না-ও হয়, তবু তা বিয়ে হবার চে’ কম হবে না।
পত্রিকার কথা অনুযায়ী, কেবল ঢাকা শহরেই প্রতি এক ঘণ্টায় একটা করে ডিভোর্স হয়। বিভিন্ন আদালতে একটা বড় সংখ্যক মামলা এখন বিচ্ছেদকে কেন্দ্র করে। আদালতের বাইরেও যে আরও কতো বিচ্ছেদ ঘটে, তার কোন হিসেব কারও কাছেই নেই বোধ হয়। বিয়ে নিয়ে ঝামেলায় আরও অসংখ্য মানুষ।
সাংসারিক জীবনে শান্তিতে আছে ক’জন, এর খোঁজ নিলে বৈরাগী হতে মন চাইবে অনেকেরই।
আমি বেশ কিছু বিচ্ছেদ ঘটনা দেখেছি। আরও দেখেছি সংসারে শান্তি না-পাওয়া মানুষদের। তাদের সঙ্গে কথা বলে যা জানলাম সেটা হলো, দু’জনের মধ্যে মনের মিল হচ্ছে না। স্বামী চায় এক জিনিস। তো স্ত্রী চায় তার সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। স্বামীর ভাবনা আর স্ত্রীর ভাবনায় জোজন জোজন ফারাক। এক ছাদের নিচে থাকার মতো কোন “বোঝাপড়া” নেই তাদের মাঝে।
সেদিন এক জনের সঙ্গে কথা বললাম। সংসার জীবনে তার অশান্তি। তিনি ভালো নেই। তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ পর্যন্ত হয় না আজ কয়েক মাস। ঘটনা হলো সেই এক জায়গায়। তাদের মাঝে “বোঝাপড়া” হচ্ছে না। জীবনটাকে তার স্ত্রী যেভাবে সাজাতে চায়, তিনি সেভাবে ভাবতে পারছেন না। তার ক্যারিয়ারের পথে তার স্ত্রী তো সহযোগী হচ্ছেই না, বরং উল্টো বাঁধ সাজছে।
মানে তারা দু’জন দুই মেরুর মানুষ। সংসার করা তাই আর হয়ে উঠছে না।
বিবাহবিচ্ছেদ ও সংসারে অশান্তি— এর একটা বড় কারণ এই “বোঝাপড়া”। এই সব মামলা ঘাটতে গেলে মনে প্রশ্ন জাগে যে, এমন দুই মেরুর মানুষ কীভাবে জুটি বাঁধলেন!
এক তো হচ্ছে সংসারে খুঁটিনাটি ঝামেলা। এমন ঝামেলা সব সংসারেই হয়ে থাকে। কখনও মনোমালিন্য এক দুদিন স্থায়ী হয়। দীর্ঘ দিন মনকষাকষি থাকলেও এক সময় তা ঠিক হয়ে যায়।
কিন্তু বৈপরিত্য যদি চিন্তার গোড়ায় হয়, তবে সেই সংসার টেকানোটা মুশকিলই বটে।

এই বোঝাপড়া না হবার কারণটা কী?

এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলাম। উত্তর খুঁজতে গিয়ে মনের মধ্যে বেশ কিছু প্রশ্ন উঁকি মারল।
যখন দু’জনে জীবনসাথী হবার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারল, তখন তারা কেন এক সঙ্গে থাকতে পারছে না! কেন তাদের মাঝে হাতাহাতি থেকে এক পর্যায়ে খুনোখুনি পর্যন্ত হয়ে যায়! কয়েকটা সন্তান থাকার পরও কেন তারা আলাদা হয়ে যেতে বাধ্য হয়! এবং সবার মুখেই সেই এক কথা যে, দুজনের মনের মিল নেই, বোঝাপড়াটা ঠিক হয়ে উঠছে না।
আধুনিক ভাষায় যাকে বলে আন্ডার্স্ট্যান্ডিং নেই!
বিয়ে হবার পর এমন “বোঝাপড়া” না-থাকার কারণ নিয়ে গবেষণা হতে পারে। ইতোমধ্যে তেমন কোন রিসার্চ হয়েছে কি না, জানা নেই। তবে আমি নিজের সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে একটা উত্তর বের করতে পেরেছি। এবং আমার কাছে মনে হয়েছে, আমাদের বিয়ের গোড়াতেই গলদ রয়ে যাচ্ছে।
আমাদের সমাজ বিয়ে মানে কী বোঝে?
সমাজ বিয়ে মানে বোঝে ছেলের টাকা আছে আর মেয়ে সুন্দর, ব্যস।
সমাজ অবশ্য বংশও দেখে। কিন্তু তারা খুঁজে দেখে না যে, ছেলে ও মেয়ের বোঝাপড়াটা কেমন! ছেলে জীবনটাকে কীভাবে ভাবে আর মেয়েটা কীভাবে ভাবে, এগুলো দেখার কোন প্রয়োজনই বোধ করে না আমাদের সমাজ। মেয়ে বা ছেলে কেমন পরিবারে বেড়ে উঠেছে? তার বাবা-মা কেমন? ইত্যাদি দেখে না আমাদের সমাজ। পরিবারও কেবল দেখে ছেলের সম্পদ অথবা মেয়ের চাঁদপানা মুখ।
এটা আমি বানিয়ে বানিয়ে বলছি না। বরং নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।
বিয়ের জন্য পাত্রী দেখা শুরু করতে গিয়েই সমাজের এই গলদটা আমার চোখে পড়ল। তারা আমার জন্য এমন পাত্রীর খোঁজ নিয়ে আসতে লাগল, যার জীবনযাপন শুনেই আমি না করে দিয়েছি। অথচ মেয়ে কিন্ত দেখতে, মাশাআল্লাহ, বেশ সুন্দরী। তার পরিবারের অবস্থাও ভালো। তবু কেন আমি না করে দিয়েছি, এ জন্য আমাকে নানান কথাও শুনতে হয়েছে। তবে আমার পরিবারকে বোঝাতে পেরেছি বলে রক্ষা।
যারা বিয়ে করতে চায়, সে ছেলেই হোক বা মেয়ে; তারাও এই বিষয়টা খেয়াল করে না। তাদের ভাবনায় বিন্দু মাত্র আসে না যে, আমি যে মেয়েকে বা ছেলেকে বিয়ে করতে যাচ্ছি সে কি আসলেই আমার জীবন-সঙ্গী হবার যোগ্য!
এই যে প্রেমের বিয়ে, তা কেন ভেঙে যায়?
বছরের পর বছর প্রেম করতে পেরেছে তারা। কিন্তু বিয়ের পর, তার অর্ধেক সময়ও; সংসার করতে পারে না। কারণ কী এর?
প্রেম যারা করে, তারা কেবল চেহারা-সুরত দেখেই করে। তারা একজন অন্যজনকে “সুখস্বপ্ন” দেখাতে থাকে। অথচ বাস্তবতা তার সিকি ভাগও থাকে না। একে অন্যের জীবনটাকে ভালোভাবে দেখার সুযোগটাই পায় না তারা।
প্রেমের সময় যখন তারা দেখা করতে যায়, তখন বাহ্যিক খোলস ফেলে রোমান্টিক সেজে যায়। কিন্তু বাস্তব জীবনে তার চরিত্র ঠিক উল্টো।
তাই প্রেমের বিয়েতে “বোঝাপড়ার” ঘাটতি পড়ে সবচে’ বেশি। তারা একসময় ভাবে, আমি কি একেই ভালোবেসেছিলাম!

বিয়ের বয়সটাতে আমাদের একটু উড়োউড়ো ভাব থাকে। যে কোন সুন্দর মেয়েকে দেখলেই আমরা গলে যাই। মেয়েরাও বাহ্যিক জিনিস দেখে ফিদা হয়। পরিবারও অনুরূপ জোড়া খোঁজে রূপ বা সম্পদ দেখে। কিন্তু যেমনটা করা দরকার, তা করি না আমরা আকছার মানুষই।
পশ্চিমা দুনিয়া “পার্টনার” পাল্টানোকে তেমন একটা কিছু মনে করে না। তাদের কাছে সংসার জীবন তেমন একটা গুরূত্বপূর্ণও নয়। পশ্চিমা ‍দুনিয়া বা তাদের ধ্যানধারণা লালন করা অনেক মানুষই জীবন কাটায় পোষা বিড়াল বা কুকুরের সঙ্গে।
এমন সংবাদ তো আমরা দেখেছি যে, কেউ মারা গিয়েছে আর তার সম্পদের মালিক হয়েছে তার পোষা বেড়াল।
অথচ পরিবার মানব জীবনের খুবই গুরূত্বপূর্ণ একটি সংগঠন। এখানেই বেড়ে ওঠে আগামী প্রজন্ম। পরিবারের প্রভাব প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই প্রকটভাবে দেখা যায়। কোন মানুষ ভালো করলে আমরা যেমন তার পরিবারকে সাধুবাদ জানাই। অনুরূপ খারাপ করলেও আমরা বলি: এর বাপ-মা কি একে কিছু শিক্ষা দেয় নাই!
অর্থাৎ, মানুষের প্রথম “পাঠশালা” তার পরিবার ৷
আমাদের সেই পাঠশালাগুলো আজ ভেঙে যাচ্ছে “বোঝাপড়ার” অভাবে। ব্রোকেন ফ্যামিলির বাচ্চাদের বেড়ে ওঠার স্মৃতি সুখকর নয়। তারা একটা যাতনার মধ্যে বেড়ে ওঠে। ছোট্ট থাকতেই তারা কুৎসতি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। যা তাদেরকে মর্মজ্বালা দেয় বয়স হবার পরও। এবং এর প্রভাব থেকে সেই সন্তান মুক্তি পায় না আজীবন!
সমাজের এই বোঝাপড়াগুলো নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা থেকে আপনাদের সঙ্গে কিছু কথা শেয়ার করবো। আমার অভিজ্ঞাতা যে অনেক, তা কিন্তু নয়। তবে আমি যা দেখেছি, তা অনেক খুঁটিয়ে অবলোকন করার চেষ্টা করেছি। এবং চেষ্টা করবো আপনাদের সামনে তা তুলে ধরতে৷

(চলবে)

লেখকঃ কলামিস্ট

আরও পড়ুন