ভেজা বিড়াল

সুপ্রিয় বন্ধু, ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক গল্প থেকে এটি অনুবাদ করা হয়েছে। গল্পটির আবেদন সার্বজনীন। মর্মকথা চিরন্তন। একজন স্ত্রী আসলে কেমন স্বামী চান আর স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কেমন আচরণ করা দরকার এ গল্পে তা প্রকৃষ্ট হয়েছে। আমরা যারা গল্প লিখি তারা উপকৃত হলে আমার শ্রম সার্থক হবে। অনেকেই গল্পটি অনুবাদ করেছেন। আমি আমার মতো করে করলাম। অনুগ্রহ করে ধৈর্য সহকারে পড়ুন। ধন্যবাদ।

 

মুল লেখকঃ আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
মুল গল্পটির নামঃ “Cat in the Rain”

অনুবাদঃ নুরে আলম মুকতা

লেখকের পুরো নামঃ আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে। জন্ম জুলাই ২১, ১৮৯৯ মৃত্যু জুলাই ২, ১৯৬১, পুরস্কার-পুলিৎজার ১৯৫৩ নোবেল সাহিত্যে- ১৯৫৪। আমেরিকান উপন্যাসিক, ছোট গল্পকার এবং সাংবাদিক। তার জীবন ছিল রোমাঞ্চকর। বিংশ শতাব্দীর ফিকশনের পথিকৃৎ। ১ম বিশযুদ্ধে তিনি এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার হিসাবে ইতালীয়ান ফ্রন্টে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। গুরুতর আহত হয়ে দেশে ফেরত আসেন ১৯১৮ সালে। ১৯২৯ সালে তার প্রকাশিত উপন্যাস “A Farewell To Arms” নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়। তিনি এতে তার যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিলেন। তিনি চারবার বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর প্রথম স্ত্রী হ্যাডলি রিচার্ডসন (১৯২১-১৯২৭), দ্বিতীয় স্ত্রী পলিন ফিফার (১৯২৭-১৯৪০), তৃতীয় মার্থা গেলহর্ন (১৯৪০-১৯৪৫), সর্বশেষ ও চতুর্থ স্ত্রী- মেরি ওয়েলস হেমিংওয়ে (১৯৮৭-১৯৬১), তার প্রকাশিত উপন্যাস ৬খানা। ছোট গল্প সঙ্কলন-৪খানা। হেমিংওয়ে ১৯৪০ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত কিউবাতে বসবাস করেছিলেন। ১৯৬১ সালের গ্রীষ্মে বিচিত্র জীবনের অধিকারী এই নোবেল লরিয়েট যুক্তরাষ্ট্রে নিজ বাড়ীতে নিজের প্রিয় শটগানের সাহায্যে আত্মহত্য করেন।)

হোটেলটিতে মাত্র দুজন আমেরিকান যাত্রা বিরতি করেছিলো। ওরা হোটেলের অন্য বোর্ডারদের কাউকেই চিনতো না। হোটেলটিতে ওদের ঘরটি ছিল দ্বিতীয় তলায়, সেখান থেকে সাগর দেখা যেতো। বাগান আর যুদ্ধের স্মৃতি সৌধের সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করা যেতো। বাগানটিতে বড় বড় পাম গাছ আর সাধারনের বসার জন্য সবুজ বেঞ্চ ছিলো।

চমৎকার আবহাওয়ার দিনগুলোতে একজন শিল্পী তার ফ্রেম নিয়ে বাগানটিতে আসতেন। বড় বড় পাম গাছের ছায়া, হোটেলের প্রতিবিম্বিত উজ্বল রং সমুদ্র শিল্পীদের বড় পছন্দের ছিল।

অনেক পথ পরিভ্রমন করে ইতালীয় পর্যটক আসতেন যুদ্ধের স্মৃতি সৌধ দেখবার জন্য। সৌধগুলো ব্রোঞ্জ নির্মিত ছিলো আর এগুলো বৃষ্টিস্নাত হয়ে দারুন উজ্জল দেখাতো। পাম গাছ থেকে ঝর ঝর করে বৃষ্টির পানি ঝরে পড়তো। কবর ঘেরা পথ গুলোর ছোট ছোট গর্ত বৃষ্টির পানিতে ভরে উঠতো।

বৃষ্টির সময় সমুদ্রের দারুন দৃশ্য উপভোগ্য হতো। বৃষ্টির পানিতে সমুদ্রের বহমান পানি থমকে যেতো। লম্বা সারি সারি বৃষ্টির পানি সাগরে পড়ার সময় সৈকত পর্যন্ত অদ্ভুত দৃশ্য তৈরী করতো। স্মৃতি সৌধের পাশ দিয়ে মোটর গাড়ীর বহর চলে যেতো। চা দোকানের একজন ওয়েটার বৃষ্টিস্নাত শূন্য বাগানের দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো।

আমেরিকানের বউটি হোটেলের কক্ষের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য উপভোগ করছিলো। ওদের জানালার নীচে একটি বিড়াল শুয়ে ছিলো। বিড়ালটি নিজেকে বৃষ্টির পানি থেকে নিরাপদ রাখার আপ্রান চেষ্টা করছিলো। কিন্তু টেবিলটি এমন করে রাখা ছিলো যে ও নিজেকে নিরাপদ করতে পারছিলো না।

দেখো, আমি নীচে গিয়ে বিড়াল ছানাটিকে নিয়ে আসি, আমেরিকান স্ত্রী টি ওর স্বামীকে বললো। আমি বিড়ালটিকে নিয়ে আসি, বিছানায় শুয়ে থাকা স্বামী টি উত্তর দিলো, না। না আমি যাই, দেখো অসহায় বিড়ালটি বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য টেবিলটির নীচে কী অসম্ভব রকম চেষ্টা করছে, আমেরিকান স্ত্রীটি বললো। স্ত্রীটি চলে যাবার পর আমেরিকান স্বামী বিছানায় কোল বালিশের ওপর পা ছড়িয়ে শুয়ে শুয়ে পড়তে লাগলো। আয়েশী ভঙ্গিতে পড়তে পড়তে ও স্ত্রীকে বললো , দেখো তুমি আবার ভিজে যেওনা।

আমেরিকান স্ত্রটি সিড়ি বেয়ে নীচে নামতে লাগলো। হোটেল মালিক মাথা নীচু করে তাকে সালাম দিলেন, মহিলা যখন তার অফিস পার হচ্ছিলো। হোটেল মালিকের টেবিলটি ছিলো তার ঘরের এক কোনায় তিনি বৃদ্ধ আর লম্বা মানুষ ছিলেন।

বৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে, আমেরিকান বৌ টি বিড় বিড় করে বকে সিড়ি বেয়ে নীচে নামছিলো। ও হোটেলের প্রহরীকে পছন্দ করতো।
সী সী সিগনোরা, ব্রুটো টেম্পো–প্রহরীটি স্থানীয় ভাষায় বললো, দেখুন ম্যাডাম আজ আবহাওয়া একদম ভালো না। মৃদু মন্দ আলো কক্ষটিতে প্রহরী ওর ডেস্কের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমেরিকান বৌ টি প্রহরীটিকে পছন্দ করেছিলো। ঝুঁকিপূর্ণ পথ অতিক্রম করে যে পর্যটকই আসুন তাঁকে বরন করে নিতো এই প্রহরী। মহিলা ঐ প্রহরীর মর্যাদাকে পছন্দ করেছিলো। তাকে যেভাবে আপ্যায়ন করা দরকার সেটাও ভালো লাগার মতো ছিলো। একজন হোটেল প্রহরী যেমন হওয়া উচিত সেটাও দেখার মতো ছিলো। আমেরিকান বৌ টি প্রহরীটির বয়স, ভরাট মুখ মন্ডল আর লম্বা লম্বা হাত পছন্দ করেছিলো। প্রহরীটি কে সম্মান করে তরুনী বৌ টি দরজা খুললো আর বাইরে তাকালো। আরো জোরে বৃষ্টি পড়ছিলো।

রাবার ক্যাপ মাথায় দিয়ে একজন মানুষ ফাঁকা রাস্তা অতিক্রম করে চা দোকানের দিকে যাচ্ছিলো। বিড়ালটি ডানদিকে ঘুরে যেতে পারে। আমেরিকান মহিলাও সেটিই চাইছিলো। তাকে রক্ষা করার জন্য ভালো হতো। মাদি বিড়ালটি ছাদের নীচেও যেতে পারে। দরজার দিকে আসার রাস্তায় একজন দাঁড়িয়ে ছিল আর তার পেছনে একটি ফোটানো ছাতা রাখা ছিল। ও ছিল হোটেলের পরিচারিকা।

দেখুন আপনার পানিতে ভিজে যাওয়া একদম ঠিক হবেনা। একজন ইতালিয়ান মহিলা মুচকি হেসে বললেন। আর এই মহিলাটি কে পাঠিয়েছিলো হোটেলের প্রহরী।

আমেরিকান তরুনীর মাথায় ছাতা ধরে হোটেলের পরিচারিকা ওর সাথে বাইরে হাঁটতে শুরু করলো। সমাধির পথ ধরে ওদের জানালার নীচ পর্যন্ত এলো। টেবিলটি যেখানে ছিলো। বৃষ্টিতে ভিজে সবুজ টেবিলটি চকচক করছিলো। কিন্তু ততক্ষনে বিড়ালটি চলে গিয়েছিলো। হঠাৎ বৌ টি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়লো।
পরিচারিকাটি ওর ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকালো।
সিগনোরা আপনি কি কিছু হারিয়ে ফেলেছেন? আঞ্চলিক ভাষায় পরিচারিকা জিজ্ঞাসা করলো। এখানে একটি বিড়াল ছিলো। আমেরিকান মহিলা বললো।
একটি বিড়াল, একটি বিড়াল !
এই প্রবল বর্ষনের মধ্যে একটি বিড়াল? পরিচারিকা জোরে জোরে হেসে উঠলো।
হ্যাঁ এই টেবিলের নীচে। দেখ এই বিড়াল ছানাটি আমার চাইই চাই।
ও যখন ইংরেজিতে কথাগুলো বলছিলো তখন পরিচারিকার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠলো।
আমাদের ভেতরে চলে যাওয়া উচিত সিগনোরা। আপনি ভিজে যাবেন।
আমিও সেরকম ভাবছি, আমেরিকান তরুনী বললো।
ওরা দুজন সমাধি প্রান্তরের রাস্তা দিয়ে হোটেলে ফিরে গিয়েছিলো। দরজায় আমেরিকান বৌটি না পৌঁছানো পর্যন্ত পরিচারিকা ছাতা হতে দাঁড়িয়ে রইলো। আমেরিকান তরুনী যখন হোটেল মালিকের অফিস অতিক্রম করছিলো তখন তিনি যথারীতি তাকে অভিভাষণ জানিয়েছিলেন। তিনি খেয়াল করেছিলে তরুনীর মনের মধ্যে কিছু একটা ঘটেছে আর তার মুখাবয়বে রূঢ় কিছু বোঝা যাচ্ছে। হোটেল মালিকের ধারনা ঠিক ছিল আর আসলেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটেছিলো। তরুনীর মনে স্থায়ী দাগ কাটার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিলো এটি। তরুনী সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গিয়েছিলো। ঘরের দরজা খুলে ও ভেতরে চলে গিয়েছিলো। জর্জ, তরুনীর স্বামী বিছানায় শুয়ে তখনও পড়ছিলো।
তুমি কি বিড়ালটি পেলে? বইটি রেখে, স্ত্রীকে প্রশ্ন করলো। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে সিগনোরা বললো, ও চলে গিয়েছে।
আশ্চর্য! বিড়ালটি কোথায় গেলো ? বই এর পাশ থেকে চোখ ফিরিয়ে স্বামী বললো।
তরুনী ধপাস করে বিছানায় বসলো।
আমি বিড়ালটিকে চাই। আমি জানিনা কেন আমি চাই। অসহায় বিড়াল ছানাটি আমি পেতে চেয়েছিলাম। বৃষ্টির মধ্যে অসহায় বিড়াল ছানাটি নিয়ে আমি কোন কৌতুক করতে চাইনি।
জর্জ স্ত্রীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আবার পড়া শুরু করলো।
জর্জের স্ত্রী ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে বসলো। হাতে একটি আয়না নিয়ে নিজের দিকে তাকালো। আয়না নিয়ে একদিক থেকে শরীরের আরেক দিক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। পেছন দিক দেখে, গলা-ঘাড়,বুক দেখতে লাগলো।

দারুন হবে, তুমি চিন্তা করে দেখো, যদি আমি আমার চুলগুলোকে বড় হতে দিই। তরুনী আবার নিজেকে দেখতে থাকলো।
জর্জ স্ত্রীর গলা আর কাঁধের দিকে তাকালো, বালকের মতো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো।
চুল বড় করার পদ্ধতিটা আমি দেখতে চাই, জর্জ বললো।
আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। একটি ছোট বালকের মতো কান্ত হয়ে গিয়েছি।

বিছানায় শুয়ে জর্জ ইতিমধ্যে প্রান্ত বদল করেছে। সিগনোরা বকেই চলেছে, জর্জ যা কোনদিন শোনেনি। তুমিতো হাতের সেলাই-ফোড়াই ভালোই পার। জর্জ বললো।

আয়নাটি ড্রেসিং এ রেখে দিয়ে জানালার দিকে হেঁটে গেলো সিগনোরা, বাইরে তাকিয়ে রইলো। অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। আমার চুলগুলো চিরুনী নিয়ে দারুন করে মসৃন করবো। আর সুন্দর করে খোঁপা বাধবো। আমি যেন বুঝতে পারি আমার মাথায় একটি খোঁপা আছে। সিগনোরা বললো। আমি একটি বিড়াল ছানা চাই। ওকে আমি আমার কোলে বসিয়ে আদর করবো আর ও আদরে ঘড় ঘড় শব্দ করতে থাকবে। আমি ওকে যখন ইচ্ছা আঘাত করবো।

ওহ, জর্জ বিছানা থেকে বললো। সিগনোরা বলে চলেছে…
আর আমি আমার নিজের থালা-বাসনে টেবিলে বসে খেতে চাই, আর নিজের একটি মোমবাতি চাই। এটি হতে হবে বসন্তকাল। আমি আমার চুলগুলো ড্রেসিং এ সুন্দর করে চিরুনী দিয়ে আচড়াবো, আমি একটি বিড়াল ছানা চাই আর নতুন পোশাক চাই। সিগনোরা বলেই চললো।
ওহ থামো তো পড়তে দাও, জর্জ খেকিয়ে উঠলো। আবার ও পড়া শুরু করলো।
জানালা দিয়ে সিগনোরা বাইরে তাকিয়ে রইলো। ক্রমশ গাঢ় অন্ধকার নেমে এলো। তখনও পাম গাছগুলো থেকে ঝর ঝর করে বৃষ্টির পানি পড়ছিলো।
যেভাবেই হোক আমি একটি বিড়াল চাই, একটি বিড়াল চাই, এখনই একটি বিড়াল চাই সিগনোরা বললো। যদি আমার লম্বা চুলগুলো না থাকে তবুও আমি একটি বিড়াল চাই। জর্জ কিছুই শুনছিলো না। ও তখনও বই পড়েই চলেছে। ওর স্ত্রী জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রয়েছে। ততক্ষন ফাঁকা সমাধিক্ষেত্রে রাতের বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। কেউ যেন দরজায় আঘাত করলো ———।

পরিচারিকা দরজায় দাড়িয়ে। ওর হাতে একটি বড় কচ্ছপের খোলস ছিল, ঐ খোলসের মধ্যে বিড়ালটি ঢুকে গিয়ে আর নিজেকে বের করতে পারছিলো না।

মাফ করবেন, পরিচারিকা বললো, “হোটেল মালিক সিগনোরার জন্য এটি আমাকে নিয়ে আসতে বললেন।”

লেখকঃ নুরে আলম মুক্তা, সহ সম্পাদক(মহীয়সী), কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন