মেয়েরা স্বামীর পাশে অন্য কাউকে ভাবতে পারে না

জান্নাত মিম

মেয়েরা স্বামীর পাশে অন্য কাউকে ভাবতে পারেনা, কথাটা ভুল। বরং মেয়েরা পারে বলেই আল্লাহ্ তা’আলা পুরুষদের একাধিক বিয়ের অনুমতি দিয়েছেন। আল্লাহ্ কাউকে সাধ্যের অতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না।

তবে আমাদের দেশে একাধিক বিয়ে মেনে নিতে না পারার প্রধান কারণ হলো, পরিবেশ। সৌদির মেয়েরা মাসনা দেখে অভ্যস্ত, এভাবেই তারা বেড়ে ওঠে, তাই তাদের জন্যে এটা কোনো ফ্যাক্ট না। তারাই বরং স্বামীর জন্য পাত্রী খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাসনা মানেই দুইটা মেয়ের জীবন শেষ, ওয়াহিদার চূড়ান্ত অসম্মান।

দ্বিতীয়ত, তীব্র ভালোবাসার মানুষগুলোকে আমরা সবসময়ই নিজের করেই রাখতে চাই, সেখানে অন্য কারও অস্তিত্ব আমাদের প্রচন্ডভাবেই কষ্ট দেয়। এটা শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রে না, বরং পুরুষের ক্ষেত্রেও। কোনো স্বামী কখনও তার ভালোবাসার স্ত্রীর পাশে অন্য কাউকে কল্পনা পর্যন্ত করতে পারবে না। এমনকি তারা তো এটাও ভাবতে পারে না যে, আখিরাতে যদি অন্য কেউ স্বামী হয়! কাজেই, এই জেলাসি থাকাটা খুবই স্বাভাবিক এবং এটা শুধু স্বামী-স্ত্রী না, অনেকে তার প্রিয় বন্ধুর ক্ষেত্রেও খুব জেলাস থাকে৷ এই বিষয়গুলো আসলে সম্পর্কের ওপর ডিপেন্ডেড।

যেমন- রাসূল (ﷺ) ওয়াহিদা জীবিত থাকাকালীন মাসনা করেননি, নবুওয়্যাতের বেশ অনেক বছর পরেই মা খাদিজা (রা.) মারা যান, তবুও করেননি। কারণ, সেই সম্পর্কটাই ছিলো তেমন বন্ধনের, যেখানে তৃতীয় কারো কথা ভাবা যায় না। তেমনি আশেপাশে এমন অনেক পুরুষকেই দেখেছি, যাদের জোর করেও মাসনা করানো যায় না, কারণ তারা যাকে ভালোবাসে, তাকে নিয়েই সুখী। এছাড়া অন্য কাউকে দরকার নেই।

রাসূল (ﷺ) এর বড় মেয়ের জামাতা আবু আস(রা.) ছিলেন এমন, যিনি স্ত্রীর সাথে দীর্ঘ বিচ্ছেদ, এমনকি স্ত্রী মারা যাবার পরেও অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারেননি, আর রাসূল (ﷺ) আবু আস(রা.) এর স্ত্রীর প্রতি এই ভালোবাসা খুব পছন্দ করতেন। একইভাবে দেখা যায়, আদম(আ.) ও হাওয়া (আ.) এর বন্ধন।

আমরা এটাও জানি যে, রাসূল (ﷺ) আয়িশাহ্ রা. কেও খুব ভালোবাসতেন। তবে আয়িশাহ (রা.) যদি খাদিজা রা. এর সম্বন্ধে কিছু বলতেন, তখন রাসূল (ﷺ) প্রচন্ড রাগান্বিত হতেন, কারণ মা খাদিজা (রা.) এর প্রতি নবীজীর ভালোবাসা ছিলো সবচেয়ে আলাদা। দুনিয়াতে পুরোপুরি এমন না হলেও, কাছাকাছি সম্পর্ক অনেক স্বামী-স্ত্রীরই আছে, যেখানে চাইলেই মাসনার ব্যাপারটা মেনে নেয়া স্বামী-স্ত্রী দু’জনের জন্যেই কঠিন।

কিন্তু এর মানে এই না যে, আল্লাহ তা’আলার করা হালাল বিধানের প্রতি অবজ্ঞা বা অসন্তোষ, না’উজুবিল্লাহ। মাছ মাংস সবই হালাল, তবুও কেউ কেউ মাছ মাংস খেতে পারেনা, খায় শুধু সবজি, এর মানে কি এই যে, সে আল্লাহ্’র বিধানকে তুচ্ছ করলো? মোটেই না। কারণ, এই বিষয়গুলো আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের ইচ্ছাধীন করে দিয়েছেন, হালালের ভেতর থেকে যা খুশি গ্রহণ করো সতর্কতার সাথে। খাদ্য হালাল হলেই যেমন ইচ্ছামতো অপচয় করা গুনাহ, তেমনি ফ্যান্টাসির জোয়ারে থেকে মাসনার জন্য কোনো মেয়ের ওপর জুলুম করা আরও বড় গুনাহ।

এখন কথা হচ্ছে, যদি আমাদের জন্য রিবা হালাল করা হতো আর বলা হতো যে, হালাল হলেও রিবার কাছে না যাওয়াই নিরাপদ, তাহলে সতর্কতার খাতিরে আমরা সকলেই রিবা’র সংস্পর্শ থেকে বাঁচতে চেষ্টা করতাম, তাইনা? এ কারণেই ইমাম শাফিঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমার পছন্দ হলো- বিবাহ একজনের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখা, যদিও এর বেশি করারও অনুমতি রয়েছে। কেননা আল্লাহ্ বলেছেন, যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে তোমরা ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একটিই (বিয়ে করো)।”

অথচ মানুষ আজকাল নিজের ঈমান আমল নিয়ে এতোই কনফিডেন্ট, যে তারা নিশ্চিত তারা ইনসাফ করতে পারবে, যেখানে সাহাবীরা পর্যন্ত নিজেদের নিয়ে আশঙ্কায় থাকতেন।

কুরআনে আল্লাহ্ স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন যে, একটি বিয়ে নিরাপদ, তবে চারটে অবধি অনুমতি দেয়া আছে, যেটা নিয়ে আবার অনেক বোনের আক্ষেপ যে, কেনো কুরআনে এটা উল্লেখ করলো?

প্রথমত, জাহেলী যুগ ছিলো অশ্লীলতায় পরিপূর্ণ। এছাড়া, রূপকথা পড়লেও দেখা যাবে, সব রাজাদের কয়েকটা করে রাণী। মানুষেরা আগে এমনই ইচ্ছেমতো বিয়েশাদী করতো, ছিলো না কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থা। তখন আল্লাহ আয়াত নাজিল করেন, বিয়ে করা যাবে সর্বোচ্চ চারটে, এর বেশি না।

গাইলান ইবনু সালামা আস-সাকাফী নামের একজন ব্যক্তির একইসময় ১০ জন স্ত্রী ছিলো। জাহেলী যুগে তিনি এই ১০ জনকে বিয়ে করেন। তাঁর সাথে তাঁর ১০ জন স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করে। রাসূল (ﷺ) যখন শুনতে পেলেন গাইলানের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ১০ জন স্ত্রী, তখন তিনি তাঁকে বললেন, “তুমি তাদের মধ্যে যেকোনো চারজনকে বেছে নাও।” [জামে আত-তিরমিজি : ১১২৮]

কায়স ইবনুল হারিস যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন তাঁর ৮ জন স্ত্রী ছিলো। ইসলাম গ্রহণ করার পর কায়স (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূল (ﷺ) কে বিষয়টি জানান। রাসূল (ﷺ) তাঁকেও একই কথা বলেন, “তাদের মধ্যে তোমার পছন্দমতো চারজনকে রেখে দাও।” [সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৫২]

কথা হলো যে, ইসলাম তো নতুন করে বহুবিবাহের প্রচলনই ঘটায়নি। বরং এটা ছিলো আগে থেকেই, যুগ যুগ ধরে। ইসলাম জাস্ট এখানে সীমারেখা টেনে দিয়েছে, তাও শর্ত দিয়ে, যেটা নিঃসন্দেহে উত্তম। নয়তো কুরআনে উল্লেখ না থাকলে, এখনও মানুষ দেশে বিদেশে ইচ্ছামতো বিয়ে করতো, কিন্তু ইনসাফের ধার ধারতোনা।

এছাড়াও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে অনেক সময়েই মাসনার দরকার হতে পারে বলেই আল্লাহ্ এই বিধানকে হালাল করেছেন। তাই মাসনার কারণে কাউকে যেমন অসম্মান করবো না, তেমনি কেউ ব্যক্তিগত ভাবে নিজের জন্য মাসনা না চাইলে, তাকে আল্লাহদ্রোহী কাফির কিংবা অক্ষম পুরুষ আখ্যা দেওয়াটা অত্যাধিক বাড়াবাড়ি, যেটা অনেকেই করে।

বর্তমানে এই বহুবিবাহের বিষয়টা নিয়ে আন্দোলনে নামা বা প্রচুর পরিমাণে লিখালিখি করে মানুষকে উৎসাহী করা দরকার, এই ভাবনাটা আমার নিতান্তই অযৌক্তিক লাগে। ভাবখানা এমন যেনো, আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন, অধিক বিয়ে করলে অধিক সওয়াব! কিংবা যে মাসনা করবেনা, সে গুনাহগার হবে!

আমি এক বোনকে জানি, যার স্বামী সোশ্যাল মিডিয়ায় এইসব লিখালিখি পড়ে হঠাৎই মাসনার প্রতি প্রচন্ড উৎসাহী হয়েছেন। তিনি বিয়ের জন্যে পাত্রী খুঁজছেন, কিন্তু তার বউ আছে জেনে কেউ রাজি হচ্ছে না। এদিকে সেই স্বামীর তখন মাথা খারাপ, সে প্রথম স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়ে হলেও মাসনা করবেই। ওদিকে সন্তান নিয়ে বোনটা মহাবিপদে। এরকম অনেক বোনদের কথা শুনেছি, যাদের স্বামীরা শুধুমাত্র মাসনা বিষয়ক নানা অযৌক্তিক লিখালিখির কারণে হঠাৎ করেই বদলে গিয়েছে, সেই বোনগুলি বড় বিপদে আছে। চোখের সামনে তাদের ভালোবাসার মানুষ হাত আলগা করে দেয়ায় তাদের চোখে অশ্রু ঝরে রোজ। সেইসাথে কষ্ট পায় বোনদের পরিবারও।

তাহলে আমার রব্ব, আর রহমানুর রাহীম তো পরিবার, বাবা-মা সবার চেয়ে অনেক অনেক বেশি দয়ালু, তাঁর বান্দা সকলেই। তাঁর দুয়ারে নিশ্চয়ই জমা হবে বোনদের সেইসব অশ্রুবিন্দু। এইসব বিষয়ে কিছু বললে কতক ভাইবোন দারুন ক্ষেপে যান। তাই ফয়সালা জমা থাক রব্বের কাছেই।

আরেকটা মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট বিষয় হলো তাক্বদীর। তাক্বদীরে মুবরাম বা স্থায়ী তাক্বদীর হলো এমন তাক্বদীর যা কখনো পরিবর্তন হয় না। বান্দার জন্য যা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অনিবার্যভাবে ঘটবেই। বিয়ের ব্যাপারটাও অনেকটা তেমনই। কেউ সারাদিন পাতার পর পাতা লিখে উৎসাহ দিলেও, যার তাক্বদীরে নেই তার মাসনা তো দূর, বিয়েই হবেনা। মাঝখান দিয়ে কিছু বোনের সংসারটাই নষ্ট হবে কেবল।

তাছাড়া ইহসান বলেও যে একটা জিনিস আছে, সেটা আজকাল অনেকে ভুলে যান। হাদীসে আছে- ‘ওই পুরুষ উত্তম, যে তার স্ত্রী’র কাছে উত্তম।’ – (জামে তিরমিজি)
তবুও কেউ এতোটাই অধৈর্য্য যে, স্ত্রী অসুস্থ হলেই অন্য কাউকে বেছে নিতে চায়। এখানে সে হালাল কাজ করলো বটে, তবে ইহসান করলো না। আল্লাহ্ তো সবই দেখেন। তাঁর ইচ্ছায় সময় ঘুরে যেতে পারে, তেমন অসুস্থ হয়ে যেতে পারে স্বামীটাও!

মূলত ভালোবাসা, ইহসান আর ইনসাফের মাধ্যমে হালালভাবে সুন্দর সংসার গড়ে তোলাই কাম্য। হোক তা বহুবিবাহ কিংবা একজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।.

লেখকঃ কলাম লেখক

আরও পড়ুন