শিকল

আব্দুল্লাহ আরমান

প্রোপার্টি বিক্রি করা তিন লক্ষ টাকা যৌতুক নিয়ে কন্যার বাবা প্রস্তুত,যে কোনো মূল্যে তার একমাত্র মেয়ের জন্য চাকুরীজীবী পাত্র চাই-ই চাই। অনেক অনুসন্ধানের পর ‘চাকুরীজীবি’ নামক সোনার হরিণ মিলেও গেলো। কিন্তু যৌতুকের দরকষাকষির আসরে বাঁধলো আরেক বিপত্তি! তিন লক্ষ টাকা যৌতুক ও বিবাহ পরবর্তী (তালাক সংক্রান্ত) নিরাপত্তা সহ মোট ৫ লক্ষ টাকার কাবিন ছাড়া কন্যার পিতা কোনভাবেই কন্যা সমর্পণ করতে রাজী নয়। দরদামে হারজিত কার হয়েছিলো জানিনা তবে শেষপর্যন্ত বিয়েটা হয়েছে। পাত্র সম্পর্কে যতদূর জানি রুপে-গুণে এর চেয়েও ভালো মেয়ে সে ডিজার্ভ করে কিন্তু টাকার মিষ্টি ঘ্রাণের কাছে তার “পছন্দ ও বিবেচনাবোধ” বিক্রি হয়েছে ….!
না,গল্প এখানেই শেষ নয়। এক সন্তানের জনক-জননী হলেও দাম্পত্য জীবনে তারা সুখী নয়। তাদের সম্পর্কের দূরত্ব ও তিক্ত রসায়ন আজ চোখে পড়ার মতো।

ছোট্ট এই ঘটনাটি অসংখ্য সামাজিক অসংগতির প্রতিচ্ছবি। এ বিয়েতে উভয়পক্ষের সম্পর্কের শুরুই হয়েছিলো অশ্রদ্ধা আর অবিশ্বাস দিয়ে। কন্যার বাবা তার কষ্টার্জিত অর্থ ও আদরের দুলালীকে ছেলেটির হাতে সোপর্দ করেছে সত্য কিন্তু তাকে হৃদয় থেকে বিশ্বাস করতে পারেনি। ৫ লক্ষ টাকার গলাকাটা কাবিন সেই অবিশ্বাসেরই হার্ড কপি।

একজন নারী তার স্বামীকে শুধু ভালোইবাসেনা, শ্রদ্ধাও করে। বিয়ের শুরুতেই স্বামীর হাতে নিজ পরিবারকে যৌতুকের কষাঘাতে জর্জরিত দেখে মেয়েটির মনে স্বামীর প্রতি কতটুকু শ্রদ্ধা ও সুধারণা অবশিষ্ট থাকে তা বুঝতে মনোবিশারদ হওয়ার প্রয়োজন নেই, এক চিমটি বিবেকই যথেষ্ট।

আবার নৈতিকতার উল্টো পথে হেঁটে কন্যার অভিভাবক যদি সুপাত্রদের উপেক্ষা করে যৌতুকের বিনিময়ে হলেও চাকুরীজীবি পাত্রের হাতে কন্যাকে সমর্পণ করতে চায় সেক্ষেত্রে দোষটা কি যৌতুক গ্রহীতার একার? যৌতুকের ক্যান্সার ছড়িয়ে দিতে এসকল অভিভাবকদের কি একটুও দায়বদ্ধতা নেই?

সরকারী চাকুরী কিংবা হ্যান্ডসাম স্যালারি দেখে পাত্রের গুণ যাচাই না করেই আদরের কন্যাকে সমর্পণের পর নির্যাতিত হলে সে দায়ভার কি নির্যাতনকারীর একার? কন্যাপক্ষ কি একটুও দায়বদ্ধ নয়?

টাকার বিনিময়ে যে ছেলের বিবেকবোধ সস্তায় কেনা যায় শত কোটি টাকার মালিক হলেও সে কোনো নারীর ‘স্বামী’ হওয়ার উপযুক্ত নয়। এমন ছেলের হাতেই মেয়েকে সমর্পণ করা উচিত যে হবে একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সুপুরুষ ও তার হবু সন্তানের সুযোগ্য পিতা। তাই প্রাচুর্যতার দাঁড়িপাল্লায় মেপে জেনেশুনে এমন মনুষ্যত্বহীন ছেলের হাতে কন্যা সমর্পণের আগে আমাদের বারংবার ভেবে দেখা উচিত!

রূপসী নারীর ধার্মিকতা,সুশিক্ষা ও গুণ বিবেচনা না করে কিংবা যৌতুকের কাছে নিজের পছন্দ ও নৈতিকতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে স্বেচ্ছায় “হবু সন্তানের অযোগ্য মা ও দুই জীবনে পথ চলার অনুপযুক্ত সাথী” বেছে নিলে যদি সংসারে অশান্তির বহ্নিশিখা জ্বলে ওঠে ও পরবর্তী প্রজন্ম বিপথে যায়,সে দায়ভার কি শুধু স্ত্রীর? ছেলে কিংবা ছেলে পক্ষের লোভাতুর মানসিকতা কি একটুও দায়ী নয়?

আসলে বিয়ে নিছক কোনো সামাজিক প্রথা কিংবা বংশবৃদ্ধির মাধ্যম নয়। বিয়ে হলো নিজের রক্ত ও বংশের সাথে অচেনা এমন একজনের রক্তকে মিশে যাওয়ার অনুমোদন যাকে দুই জীবনের দুর্গম পথের সাথী হিসেবে বিশ্বাস করা যায়, পরবর্তী প্রজন্মের মা/বাবা হিসেবে যোগ্য ভাবা যায়,আত্মার আত্মীয় হিসেবে যাকে মনে প্রাণে মেনে নেয়া যায়,হৃদয়ের গভীর থেকে যাকে ভালোবাসা যায়।

প্রতিটি পরিবার হলো সমাজ,রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থার এক একটি খুঁটি। খুঁটির ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয় তাহলে সুখের পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন অলীক কল্পনা নয় কি?

যৌতুক-নারী নির্যাতন-পুরুষ নির্যাতন-গলাকাটা মোহরানা-ডিভোর্স-সাংসারিক অশান্তি -পরকীয়া-সন্তানের মাদকাসক্তি ও বিপথগামীতা ইত্যাদি সামাজিক সমস্যাগুলো একটি আরেকটির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এক্ষেত্রে একতরফাভাবে স্বামী/স্ত্রী বা তাদের পরিবারকে দোষারোপ নিতান্তই অবিচার।

আমাদের এই সামাজিক সমস্যাগুলো যেন একটি বৃত্তাকার লোহার শিকলের মতো। শিকলের সম-আকৃতির প্রতিটি দানা সমশক্তি নিয়ে একে অপরের সাথে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত। এর নির্দিষ্ট ‘একটি’ সমস্যা সমাধানের পথে হাঁটলে অন্য সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পাওয়া কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।
তাই পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্রকে ঘিরে রাখা এই অদৃশ্য শিকল থেকে মুক্তির জন্য শিকলের প্রতিটি দানায় সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করে চূর্ণবিচূর্ণ করতে পারলেই আমাদের মুক্তি সম্ভব। প্রতিটি পরিবার ও মানুষের হৃদয়ে এই অশুভ শিকল ভাঙার আওয়াজ বেজে উঠুক এই শুভ কামনা।

প্রবন্ধঃ শিকল (বই থেকে সংক্ষেপিত)
বইঃ বিনি সুতোর বাঁধন

লেখকঃ ইসলামী বিষয়ে কলাম লেখক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

আরও পড়ুন