দাম্পত্য সিরিজঃ অরাজনৈতিক ঝগড়া (পর্ব-৫)

মাহজেবিন মম

– শোকেসের উপরে বিষের প্যাকেট টা আছে, একটু দিয়ে যান ত।

– কি সর্বনাশ!! আমি কি তোমাকে এতই যন্ত্রণা দেই যে তুমি বিষ খেতে চাচ্ছ?

– কি জ্বালা। আমি বিষ খেতে যাব কোন দুঃখে। ইঁদুর মারার বিষ এনে রেখেছিলাম। সেটাই দিতে বললাম আপনাকে।

– ও তাই বল। আমি আবার কি না কি ভাবলাম। তা বিষে কি ইঁদুর মরবে নাকি? তারচেয়ে লাঠি দিয়ে হত্যা করাই ভাল না?

– লাঠি দিয়ে তো আমাকেই হত্যা করতে হয়। আপনি তো ইঁদুর দেখলেই খাটে উঠে বসে থাকেন। একা একা কি ইঁদুর মারা যায় নাকি?

– দেখ, ইঁদুর একটা ভয়ানক প্রাণী। ১৪ শতকে ইউরোপে ভয়াবহ মহামারীর কারন ছিল কালো ইঁদুর। সে মহামারীতে ইউরোপের এক তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী মারা গিয়েছিল। এইত বছর দুয়েক আগে বিবিসির প্রতিবেদনে এসেছিল যে প্যারিসের জনগন তাদের ক্ষমতাসীন মেয়রকে ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে শুধুমাত্র তাদের শহরে ইঁদুরের উৎপাত বেড়ে গিয়েছিল বলে। তাছাড়া ২০১৮ সালের দিকে নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ বুহারি নিজ বাড়ি থেকে অফিস করেছেন এক সপ্তাহ। এর কারন কি ছিল জান? কারন হল, উনার কার্যালয়ে ইঁদুরের উৎপাত মারাত্মক আকার ধারন করেছিল। তাই বলছি –

“ওহে বঙ্গ ললনা
আমার ইঁদুর ভীতি নয়ত ছলনা”

– ঠিক আছে, আপনি বসে থাকেন। আমি ইঁদুর মারার বিষ দিয়ে আসি। আপনার প্রিয় বিক্কুর(বিস্কুট) সাথে বিষ মিশিয়ে ইঁদুরকে দিব। বিক্কুর জন্য আবার “মোরা একটি বিক্কুকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি” বলে গান শুরু করে দিয়েন না যেন।

(কিছুক্ষণ পর ইউটিউবে সিনেমা দেখছি, তার মাঝে নারিকেল তেলের বিজ্ঞাপন চলে আসল)

– আচ্ছা তুমি চুলে নারিকেল তেল দাও না কেন বল তো? এই যে বিজ্ঞাপনে দেখাচ্ছে নারিকেল তেল দিলে চুল সুন্দর হয়।

– এটা ওদের মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি, পণ্যের বিজ্ঞাপন এভাবেই করে ওরা। আর বিশিষ্ট ত্বক বিশারদ হাসিবুর রহমান বলেছেন যে, আমাদের মাথার ত্বকে প্রাকৃতিকভাবেই তেল থাকে, অতিরিক্ত তেলের প্রয়োজন নেই। তাই আমি নারিকেল তেল ব্যবহার করিনা। তবে আপনি চাইলে নারিকেল তেলে রান্না করে দিতে পারি কিন্তু।

– ইয়াক, কি সব বল তুমি। নারিকেল তেলের রান্না কে খায়?

– এরকম করার কিছু নাই। ভারতের তামিলনাড়ুতে নারিকেল তেলের রান্না খাওয়া হয়। ঐ রাজ্যে প্রচুর নাড়িকেল গাছ আছে। ওখানে গিয়ে যদি আপনি ভাবেন যে নারিকেল তেলের রান্না খাব না, প্যাকেটের শুকনো খাবার খাব তাতেও কোন ফায়দা নেই। চিপস থেকে শুরু করে আপনার প্রিয় বিক্কুতেও নারিকেল তেলের ফ্লেভার খুঁজে পাবেন৷ আর সব রান্নাতে ওরা কারি পাতা ব্যবহার কর।কারি পাতা অনেকটা নিম পাতার মত দেখতে। আমাদের দেশেও পাওয়া যায় কারিপাতা কিন্তু এটা খাওয়ার কথা আমরা ভাবতেও পারিনা। এছাড়া শ্রীলঙ্কার খাদ্য তালিকায় নারিকেলের দুধের উপস্থিতি খুবই বেশি।

– তুমি কি জান, তামিলনাড়ু আর শ্রীলঙ্কা পাশাপাশি হওয়ায় বহু কাল থেকেই শ্রীলঙ্কাতে তামিল জনগন বসবাস করে আসছে। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ কতৃক শ্রীলঙ্কা স্বাধীন হলে “সিলন সিটিজেনশিপ এ্যাক্ট” ঘোষনার মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় বসবাসকারী কিন্তু ভারতে জন্ম গ্রহনকারী তামিলদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। এরপর ১৯৫৬ সালে “সিনহালা অনলি এ্যাক্ট” দ্বারা সিংহলী ভাষাকে সর্বোচ্চ স্থান দেয়ায় তামিল ভাষা হুমকির মুখে পড়ে যায়। এসব কারনে তামিল ও সিংহলী জনতার সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। তামিলদের উপর নানা দমন পীড়ন চলতে থাকে। তারা জড়াতে থাকে নানা সংঘর্ষে। এরই ধারাবাহিকতায় ভেলুপিল্লায় প্রভাকরণ ১৯৭৬ সালে “লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম্” নামের সংগঠন গঠন করে।

– ও আচ্ছা, এই সংগঠনকেই তো সংক্ষেপে এলটিটিই বলা হয়। এরাই তো শ্রীলঙ্কার তামিল ভাষা ভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য দেশটির উত্তর – পূর্ব অংশ নিয়ে “তামিল ঈলাম” নামে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিল। ১৯৮৩ সাল থেকেই তো শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ চলছিল। শেষমেশ ২০০৯ সালে এলটিটিই পরাজিত হলে যুদ্ধ শেষ হয়।

– এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে তুমি আলতাফ পারভেজের “শ্রী লঙ্কার তামিল ইলম্” বইটা পড়া শুরু করতে পার।

– ওকে উস্তাদ। পেন্ডিং বইগুলো পড়ে শেষ করি আগে। কিন্তু এখন আপনি আমাকে নারিকেল এনে দেন। আপনার জন্য নারিকেলের স্পেশাল রেসিপি তৈরি করব আজ।

– ইয়া মাবুদ,, উদ্ধার কর আমাকে। আমি তোমার উদ্ভট রান্না খেয়ে অসুস্থ হতে চাই না গো। আমাকে ক্ষমা কর।

– কোন ক্ষমা নাই। আমি রান্নাঘরে যাই।

– তবে শুনে রাখ হে নিষ্ঠুর ললনা, আমি যেদিকে দু চোখ যায় চলে গেলুম।

” যেওনা সাথী ওওও, চলেছ একেলা কোথায়,

ভাল নারিকেল কিনতে পাবে নাকো, আমায় ছাড়া”

(গান গাইতে গাইতে রেডি হইতে চলিলাম)

লেখক- শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন