কঠোর লকডাউনে যেভাবে তুরস্ক থেকে দেশে ফিরেছিলাম

শেখ সাফওয়ানা জেরিন 

গতবছরের এই সময়টার কথা মনে পড়ে।আনকারায় আটকা পড়েছিলাম।বাবা স্ট্রোক করে বিছানায়,হাজব্যান্ড লকডাউনে সিলেটে একা একলা কষ্টে,সদ্য বিবাহিত ছোটবোনের নিজের সংসার ফেলে বাবাকে দেখার জন্য বাসায় বাধ্য হয়ে থাকা। কিন্ত প্লেন তো একটা ও উড়ে না। হাজার মাইল দূরের পথ,যাওয়ার কোনো বিকল্প উপায়ও নেই।

অনেকে মজা করে গরু-ভেড়ার সাথে জাহাজে করে রওনা দিতে বললো।তাও তো দু-তিন মাস লাগবেই।হযরত ইউনুস(আ.) যেমন মাছের পেটে পড়ে দোয়া পড়েছিলেন,আমিও সারাদিন দোয়া ইউনুস জপতে থাকলাম একশভাগ বিলিভ নিয়ে যে এই বিপদ থেকে আল্লাহ আমাকে উদ্ধার করবেনই।সাথে সাথে নফল রোযা,আর রাত জেগে আল্লাহর কাছে চাওয়া।

আমার হাউজমেটদের ও চোখে সয়ে গিয়েছিলো কমনরুম খুলেই আমাকে নামাযের বিছানায় দেখবে,অথবা প্রতিদিনই রোজা রাখতে দেখবে।দোয়া কবুলের জন্য আল্লাহকে ডাকা,তাকে খুশি করে দোয়া কবুল করিয়ে নেওয়ার জিদ চেপে বসেছিলো এক কথায়।

এক শুক্রবার রাতে একজন জানালো সোমবার রাতে ইস্তাম্বুল থেকে একটা বিশেষ ফ্লাইট যাবে,ইউরোপ থেকে এসে আটকে পড়া কিছু সেনাবাহিনী সদস্যদের নিয়ে।তবে এম্বাসি এখন চাচ্ছে না ছাত্ররা যাক।

খবরটা শুনে সেদিন রাতে আর ঘুম হলো না।সকালে এম্বাসিতে অনেক কাকুতি মিনতি করলাম যেভাবেই হোক আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিক।রবিবার দুপুর লাগলো সেই অনুমতি মিলতে মিলতে,পরেরদিন সন্ধ্যায় ফ্লাইট।প্লেইনে ওঠার তো অনুমতি পাওয়া গেলো,কিন্ত ইস্তাম্বুল কীভাবে যাবো? কারফিউ চলছে তার্কিতে।রাস্তায় একটা কাকপক্ষী নেই।আমি বুথ থেকে টাকা তুলতে বের হলে পুলিশরা আমাকে সতর্ক করে দিলো।এলাকার গলিগুলো সব তার্কিশ বাঘা কুকুরদের দখলে।

স্টুডেন্ট হাউজের গার্ডিয়ান আপাকে জানালাম অবস্থা।উনি বললেন রাত ১২টায় কারফিউ উঠে গেলে আমাকে নিয়ে যাবেন আনকারার বাস স্টেশন আশতিতে।রাত সাড়ে বারোটায় সেই তার্কিশ সুপারভাইজার তার হাজব্যান্ডসহ আমাকে বাস স্টেশনে নিতে আসলো।বাস স্টেশনে যেয়ে দেখি চারদিক শুনশান নীরব।একটা দরজার পাল্লাও খোলা নেই।ওনার হাজব্যান্ড যেয়ে দেখে এসে জানালো সব বন্ধ। ম্যাডাম আমার দিকে তাকিয়ে বললো-আম্মু,আমাদের ফিরে যাওয়াই ভালো,তোমার মনে হয় যাওয়া হবেনা।ম্যাডামের হাজব্যান্ড বললো-তুমি কী চাও আম্মু বলো?আমরা তোমাকে গাড়ি দিয়ে ইস্তাম্বুল দিয়ে আসতে পারি!

আমার চোখ পানিতে টলটল করে উঠলো যেতে পারবোনা ভেবে,আমি বললাম আপনাদের ইচ্ছা।আমার চোখের পানি দেখেই হাজব্যান্ড ওয়াইফ দুজন চোখের ইশারায় কথা বলে গাড়ি ইস্তাম্বুলের দিকে ঘুরিয়ে দিলো।

বন্ধুরা বলেছিলো আমাকে যে সিচুয়েশন ৯৯%সম্ভাবনা নেই আমি দেশে যেতে পারবো যে।বান্ধুবি ফাতোশ বলেছিলো ৯৯.৯৯%সম্ভাবনাও নেই যেতে পারবো যে।বেচারী অনেক চেস্টা করেও আমার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করতে পারেনি।
ম্যাডামের হাজব্যান্ড সারাদিন অফিস করে এসেছেন,ঘুম যেন না আসে তাই কুরআন তেলওয়াত শুনলেন ৭-৮টা ঘন্টা ড্রাইভিং এর সময়টা।আমি সেইরাতের কথা সেই মানুষগুলোর কথা কোনোদিন ভুলতে পারবোনা।

আরও ভুলতে পারবো না জীবনের এই শিক্ষা যে অসম্ভবকে সম্ভব করার মালিক আল্লাহ-তায়ালা চাইলে যে কোনো আকাশকুসুম অবান্তর দোয়াকেও কবুল করে নিতে পারেন।৯৯.৯৯%সম্ভাবনা না থাকলেও আল্লাহ তা সম্ভব করে দিতে পারেন।

হযরত ইউনুস(আ.)কে মাছের পেট থেকে উদ্ধারকারী আমাদের মহান রব আমাদেরকেও চাইলেই যে কোনো বড় বিপদ থেকে বের করে আনার অসীম খমতা রাখেন।শুধু চাওয়ার সময় মনে এই খুতটা রাখা যাবেনা যে যতোই চাই আল্লাহ কী আর দিবেন?অথবা আল্লাহ দিলেও দিতে পারেন না দিলেও না দিতে পারেন! চাইতে হবে শক্ত বিলিভ নিয়ে যে আল্লাহ অবশ্যই দিবেন,এর মাঝে যদি ভালো থাকে আল্লাহ অবশ্যই দিবেন।

লেখকঃ কলামিস্ট, মহীয়সীর সহ-সম্পাদক ও পিএইচডি গবেষক, হ্যাসেটটাইপ বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্ক

আরও পড়ুন