পদ-পদবীর টিকেট নিয়ে ক্ষমতার প্রদর্শন নেই যুক্তরাষ্ট্রে

রউফুল আলম 

স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে কাজ করার সময় আমার এক সহপাঠী ছিলো, যার বাবা ছিলো স্থানীয় এমপি। ছেলেটার সাথে পরিচয়ে প্রায় সাত-আট মাস পর সেটা জেনেছিলাম। তাও প্রসঙ্গত কারণে। ছেলেটা একটা সাইকেল চেপে আসতো প্রতিদিন। এমনকি সামার ব্রেইকে, সুপারস্টোরে কাজ করতো।

২০১৭ সালে, ওয়াশিংটনে, আমেরিকান কেমিক‍্যাল সোসাইটির (ACS) মিটিং ও এক্সপোজিশনে গেলাম। এক্সপোজিশনে মূলত বিভিন্ন পাবলিশার্স ও কোম্পানিগুলোর ছোট ছোট স্টল থাকে। ওয়াইলি (Willy) পার্বলিশার্স থেকে একটা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করবেন নোবেল বিজয়ী কেমিস্ট স্টুডার্ট ফ্রাসের (Stoddart Fraser)। ফ্রাসেরের সাথে আমি কথা বলবো এবং ইন্টারভিউর জন‍্য আলোচনা করবো, এই লক্ষ‍্যে আমিও এক্সপোজিশনের গেইটের দিকে ছুটলাম। মূল এন্ট্রেসের কাছে যেতেই দেখি তিনিও সেখান দিয়ে ভিতরে চলে যাচ্ছিলেন। ঘড়ির দিকে হয়তো তার নজর ছিলো না। ঠিক তখনই সিকিউরিটির লোকটা তাকে আটকে দিলো। এক্সপোজিশন শুরু হবে সকাল দশটায়। তখনও পাঁচ-সাত মিনিট বাকী। সিকিউরিটির লোক তো আর জানে না, সে কি নোবেল বিজয়ী নাকি অন‍্যকিছু। আর প্রফেসর ফ্রাসেরও নিশ্চয় সিকিউরিটির কাছে বলতে যাবে না—তুই জানিস, আমি কে?

আমাদের দেশের মতো ক্ষমতার প্রর্দশন দুনিয়ার কোথাও নেই! রাস্তা-ঘাট, অফিস আদালত এমনকি শ্বশুড় বাড়িতেও পদ-পদবীর প্রদর্শন, পদের নাম বেঁচে খাওয়ার প্রবণতা, পৃথিবীর আর কোথাও দেখবেন না। ২০১৮ সালে যখন বাংলাদেশে গিয়েছি, ঢাকার রাস্তায় দেখেছি, ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতার পরিচয় দিয়ে গাড়িতে স্টিকার লাগানো। আমি অবাক হলাম, এই সংস্কৃতি কবে থেকে চালু হলো! ওয়ার্ডের নেতাও গাড়িতে স্টিকার লাগিয়ে ঘুরে?

গ্রামের যে ছেলেটা নকল করে মেট্রিক পাশ করতে পারেনি, আমি তাকে দেখেছি নেতা হয়ে যেতে। গ্রামের বিচার-আচার ঠিক করতে। গ্রামের স্কুল কমিটি চালাতে। মধ‍্যপ্রাচ‍্য থেকে কিছু টাকা কামাই করে এসে, স্থানীয় রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে নেতা হয়েছে। সেই নেতা কথায় কথায় বলে,‘তুই চিনস, আমি কে?’-এই হলো আমাদের সমাজের প্রকৃত চিত্র!

বিদেশে আপনি মুদির দোকানদার হলেও যা, হার্ভাডের প্রফেসর হলেও তা। অনেক বড়ো ডাক্তার হলেও যা, হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় হলেও তাই। এখানে কেউ কারো সাথে ক্ষমতা প্রর্দশন করতে যায় না। বরং এটা যে করতে যায়, তাকে সবাই স্টুপিড মনে করে! আপনি কারো কাছ থেকে পাত্তা আশা করার দরকার নেই। কাউকে আপনার পাত্তা দেয়ারও দরকার নেই।-এই হলো সংস্কৃতি।

যার যখন যে কাজ, যে দায়িত্ব, সে সেটা করে যাবে নিয়ম মাফিক। আলগা ভাব বা আলগা পাত্তার আশা করার প্রবণতাটাই এখানে গড়ে উঠেনি। আর আমার যে বন্ধু বুয়েটে পড়তো, সে পরিচয় দিতে গিয়ে তার নাম বলার আগে বলতো, বুয়েটে পড়ে। সেই রকমের বহু ছেলে-পেলে দেখেছি, বিদেশে এসে বিড়াল হয়ে যেতে। কারণ, সেসব আলগা ভাব তো নেয়ার আর সুযোগ থাকে না।

বিদেশে আমার সাথে এক সচিবালয়ের কর্মকর্তার পরিচয় হয়েছিলো। ঘনিষ্ঠতার এক পর্যায়ে বললেন, আসলে বিদেশে শান্তি নাই। জানতে চাইলাম কেন। বললো, দেশে কতো আরামে থাকি। সরকারী কর্মচারী থাকে। ড্রাইভার থাকে। যেখানে যাই সেখানেই সবাই একটা সমীহ করে। বিদেশে তো কেউ কাউরে কেয়ার করে না। মনে মনে বললাম, বৃটিশরা একসময় বাঙালীর সাথে যা করেছিলো, আপনারা মূলত এখন স্বজাতির সাথে তাই করছেন। দায়িত্ব নিয়ে মাথ‍া ব‍্যাথা নেই কিন্তু পদ-পদবি বেচা-কেনায় কোথায় কমতি হলো, সে নিয়ে একেবারে ষোল আনা হিসাব!

পদ-পদবী যে একটা দায়িত্ব, একটা কর্তব‍্য সেটা আমারা বুঝি না। উপলব্ধি করি না। আমাদের কথা হলো পদ-পদবীর টিকেট নিয়ে ক্ষমতার প্রদর্শন করে বেড়াও। রাষ্ট্রের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত এই চর্চা। দায়িত্ব পালনের বেলায় মুলোটা হলেও, ক্ষমতা প্রদর্শনের বেলায় একেবারে ওস্তাদ। এবং এইটা হলো একটা কেইয়টিক সোসাইটির অন‍্যতম প‍্যারামিটার। যেখানে সকল ব‍্যবস্থাপনা খুব নাজুক থাকে। সহজেই ভেঙ্গে পড়ে।—এ ফ্রেজাইল ম‍্যানেজম‍্যান্ট!

এই ধরণের ফ্রেজাইল ম‍্যানেজম‍্যান্ট তৈরি হয় বহু কারণে। অন‍্যতম কারণ হলো, রাজনীতি যখন তার স্বার্থে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম মানুষটিকেও কাছে টানে, তখন সেটা হয়। রাজনীতি যখন নিজের স্বার্থে রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে ন‍্যাংটাভাবে ব‍্যবহার করে তখন সেটা হয়। স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান বলে কিছুই গড়ে উঠে না।

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে পর্যন্ত আমেরিকার পুলিশ প্রধান বলতে পেরেছিলো, চুপ থাকার জন‍্য। অপ্রয়োজনীয় কথা না বলার জন‍্য। কারণ, এখানে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বতন্ত্রভাবে গড়ে উঠেছে। এটা হলো মৌলিক ভিত্তি। দেশের অন‍্যান‍্য বহু সমস‍্যা থাকলেও, এই মৌলিক বিষয়গুলোকে আগে দাঁড়া করাতে হয়। ব‍্যবস্থাপনা যদি সিস্টেমেটিক এবং স্বতন্ত্র-স্বাধীনভাবে গড়ে না উঠে, পদ-পদবির চেয়ে দায়িত্ববোধের চর্চা যদি বড়ো না হয়, তাহলে শুধু কামড়া-কামড়িই থাকে। পারস্পরিক রেস্পেক্ট কখনো গড়ে উঠে না। সমাজটা হয়ে যায় পদ-পদবী বেচা কেনার হাট।

লেখকঃ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক ও গবেষক, নিউজার্সি, যুক্তরাষ্ট্র

আরও পড়ুন