চাচা-খালুকে বিয়ে, বহুবিবাহ ও পাবলিক সেন্টিমেন্ট

।। আরিফুল ইসলাম ।। 

বিয়ের প্রস্তাবের তিনটি দৃশ্যপট দিয়ে লেখাটি শুরু করছি। পুরো লেখাটি ভালোভাবে বুঝার জন্য দৃশ্যপটগুলো নিজের সাথে মিলিয়ে নিন। নিজেকে সেই জায়গায় কল্পনা করুন। পারিবারিক, সামাজিক নর্মগুলো মাথায় রাখুন।

১. আপনার বাবার আপন চাচাতো ভাই, ছোটোবেলা থেকেই আপনারা একসাথে বসবাস করেন। আপনার বাড়ি আর আপনার চাচার বাড়ি পাশাপাশি। আপনার চাচার বয়স ৩০ বছর। আপনি একজন মেয়ে, আপনার বয়স ১৮ বছর। আপনার বাবার চাচাতো ভাই, অর্থাৎ আপনার চাচা যদি আপনাকে বিয়ে করতে চান, আপনি কি মেনে নিবেন? কিংবা আমাদের সমাজে আপন চাচাতো বোনের মেয়ে অর্থাৎ ভাতিজীকে কেউ কি বিয়ের প্রস্তাব দেয়?

আপনি যদি ছেলে হোন, তাহলে চিন্তা করুন আপনার বোনকে আপনার পাশের ঘরের চাচা বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। আপনার কেমন লাগবে?

২. আপনার খালা আপনার অনেক প্রিয়। আপনার খালুকে ‘খালু’ হিশেবে আপনি যথেষ্ট সম্মান করেন। হঠাৎ করে আপনার খালা ইন্তেকাল করলেন। আপনার খালু বিপত্নীক। তিনি একা একা দিনযাপন করছেন, তার বাসায় ছোটো দুজন সন্তান আছে; আপনার খালাতো ভাই-বোন। এখন আপনার খালু আপনাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন বা আপনার পরিবারে কথাবার্তা চলছে আপনার খালুর সাথে আপনাকে বিয়ে দেয়া হবে। আপনার আপন খালু কিন্তু। স্বাভাবিকভাবে আপনি কি সেই প্রস্তাব মেনে নেবেন?

আপনি ছেলে হলে চিন্তা করুন, পারিবারিক মিটিংয়ে আপনি কী মতামত দিবেন, যখন বলা হবে- ‘তোর খালুর সাথে তোর বোনের বিয়ে নিয়ে ভাবছি। তোর কী মত?’

৩. আপনার বাবার বন্ধু বিদেশ থাকেন। ছোটোবেলায় আপনি তাকে দেখেছেন, আপনি তাকে ‘আংকেল’ বলে ডেকেছেন। বিদেশে তার স্ত্রী-সন্তান আছে। দেশে আসার পর একটি আলিসান বাড়ি বানিয়েছেন। সেই বাড়িটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন আসে। তার কয়েকজন বন্ধু তাকে পরামর্শ দিলো, এবার দেশে একটি বিয়ে করে নাও। তিনিও ভাবলেন, যেহেতু চারটি বিয়ে করার অপশন আছে, সেহেতু তিনি আরেকটি বিয়ে করবেন; আর্থিক সামর্থ্যও তার আছে।

খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলেন আপনাকে। আপনার বয়স তখন ১৮ বছর, আপনার বাবার বন্ধুর বয়স তখন ৬০ বছর। আপনি কি আপনার বাবার সেই বন্ধুকে বিয়ে করবেন, যার সাথে আপনার বয়সের পার্থক্য প্রায় ৪০ বছর?

আপনি ছেলে হলে আপনি কি আপনার বোনকে আপনার বাবার ‘বয়স্ক’ বন্ধুর সাথে বিয়ে দেবেন?

লেখাটি লেখার আগে আমি আমার আশেপাশের হলের রুমমেট, ফ্লোরমেটদেরকে জিজ্ঞেস করলাম। তারা এমন প্রশ্ন শুনে বলে, “ভাই, এগুলো কী বলেন? দুনিয়া উল্টে গেলেও আমি আমার বোনকে আমার বাবার চাচাতো ভাই, আমার খালু, আমার বাবার বন্ধুর সাথে বিয়ে দেবো না। প্রশ্নই আসে না!”

এই লেখাটি যারা পড়ছেন, তাদের সবার উত্তর এমনই হবে বলে আশা রাখি। কারণ, আপনি আপনার আশেপাশে কখনো এমন বিয়ে দেখেননি এবং এমন বিয়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত নেই। সামাজিক যে নর্ম আছে, সেই নর্ম এমন বিয়ে সমর্থন তো করেই না, বরং কেউ যদি করে ফেলে তাহলে সমাজ তাকে ত্যাজ্য করে।

আমার পরিচিত একজন ছেলে তার মায়ের চাচাতো বোনের সাথে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। অর্থাৎ, ছেলেটি বিয়ে করে তার খালাকে, মেয়েটি বিয়ে করে তার বোনপোকে! পালিয়ে বিয়ে একটা সময় পর মেনে নিলেও এই বিয়েটা কেউ কখনো মেনে নিবে না। সবার মুখে একই কথা- মামাতো বোন, খালাতো বোনের সাথে পালিয়ে গেলে না হয় মেনে নেয়া যেতো, কিন্তু পাশের ঘরের খালাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে কেনো? সেই মেয়েটি তার চাচাতো বোনকে ‘আপা’ ডাকবে নাকি ‘শাশুড়িমা’ ডাকবে? এমন সমাজবিরোধী কাজের ফলে সমাজ ঐ পরিবারকে ‘একঘরে’ করে রেখেছে।

প্রতিটি সমাজে সামাজিক প্রচলিত প্রথা থাকে। সবাইকে সেগুলো মেনে চলতে হয় এবং স্বাভাবিকভাবে কেউ সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানায় না। তবে, সমাজের যেসব প্রথার ফলে মানুষকে নিপীড়ন করা হয়, যুলুম করা হয়, একটা না একটা সময় মানুষ সেগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। তখন সেগুলোর বিরুদ্ধে মানুষ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে।

উপরে যে কয়েকটি বিয়ের প্রস্তাবের কথা আলোচনা করলাম, স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় সেগুলো সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ এবং এগুলো এমন কোনো নিপীড়নমূলক বিষয় না যে এগুলোর বিরুদ্ধে কেউ চ্যালেঞ্জ জানাবে। বরং, কেউ যদি এগুলোকে স্বাভাবিক করতে চায়, তখনই দেখা যাবে যুলুমের পথ খুলে যাবে। কারণ, আমাদের সমাজের রুচি অনুযায়ী একজন মেয়ে কখনো চাইবে না যে, তার সাথে এমন একজনের বিয়ে হোক যার সাথে তার বয়সের ব্যবধান ৩০-৪০ বছর।

উপরের প্রথাগুলো যদি স্বাভাবিকীকরণের প্রয়াস চালানো হয়, তাহলে মেয়েরা আপত্তি জানাবে, বিয়ে দেয়া হলে জোর করে বিয়ে দেয়া হবে। একজন মেয়েকে জোর করে বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে ইসলামে ঘোর আপত্তি আছে; এমনকি মেয়ে চাইলে সেই বিয়ে ভেঙ্গে দিতে পারে। ইসলাম তাকে জোর করে, কোনোরকমে মানিয়ে নিতে বলে না।

একবার এক যুবতী মেয়ে এসে নবিজীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললো, “আমার বাবা তার ভাতিজার দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য আমাকে তার সাথে (বাবার ভাতিজা) বিয়ে দিয়েছেন।”

নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুরো ঘটনাটি শুনে বুঝলেন যে, বিয়েতে মেয়ের মতামত নেয়া হয়নি এবং সে রাজি ছিলো না। তিনি এখন পুরো বিষয়টি মেয়ের এখতিয়ারে ছেড়ে দেন। মেয়ে চাইলে বিয়ে রাখতে পারে। মেয়ে চাইলে বিয়েটি ভেঙ্গে দিতে পারে; যেহেতু তার অমতে বিয়ে হয়েছে।

তখন মেয়েটি বললো:

“আমার বাবা যা করেছেন, আমি তা বহাল রাখলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিলো, মেয়েরা জেনে নিক যে, বিয়ের ক্ষেত্রে বাবাদের (একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের) কোনো এখতিয়ার নেই।” [সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৭৪]

উপরে যে তিন ধরণের বিয়ের কথা বললাম, সেটা বাংলাদেশের সমাজে অপ্রচলিত এবং সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু, এই ধরণের বিয়ে যদি বিশ্বের অন্য যেকোনো সমাজে প্রচলিত থাকে, সামাজিকভাবেও যদি স্বীকৃত থাকে, তাহলে ইসলাম এমন বিয়ের অনুমতি দেয়।

মজার ব্যাপার হলো, বিয়ের ক্ষেত্রে ‘কাদেরকে বিয়ে করা যাবে না’ সংক্রান্ত ইসলাম ছোট্ট একটি লিস্ট দিয়েছে। ১৪ জন বা ১৪ শ্রেণীর মেয়ে ছাড়া যেকোনো মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করা যাবে। ‘কাকে বিয়ে করবো?’ এই প্রশ্ন ইসলাম ছেড়ে দিয়েছে সমাজের উপর। প্রায় ১৪০০ বছর ধরে মুসলিম সমাজে প্রচলিত সম্পর্কগুলোর মধ্যেই বিয়ে হয়। আর বিয়ে যেহেতু সামাজিক ও ধর্মীয় প্রথা, সেহেতু এই দুটোর মধ্যে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স করা হয়। বিয়ের সময় সমাজের নর্ম দেখা হয়, ধর্মের বিধান দেখা হয়। সেজন্য আমাদের সমাজে সাধারণত দূর-সম্পর্কের ফুফু-ভাইপো, চাচা-ভাতিজি, মামা-ভাগ্নের মধ্যে বিয়ে হয় না; যদিও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী এমন বিয়ে বৈধ, তবে সামাজিক প্রথা অনুযায়ী এমন বিয়ে নিষিদ্ধ হবার ফলে আমাদের সমাজের সম্মানিত আলেমগণ সামাজিক প্রথাকেও গুরুত্ব দেন।

সামাজিক এমন প্রথাকে ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় ‘উরফ’ বলা হয়। সামাজিক আইন হিশেবে উরফকে সিরিয়াসলি বিবেচনা করা হয়, বিশেষ করে হানাফী মাজহাব। সমাজে প্রচলিত এমন প্রথা, যা শরীয়ত বিরোধী নয়, কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক নয়, এমন প্রথা মেনে চলার ব্যাপারে উসূলী আলেমগণ উৎসাহ দেন। কারণ, এগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

এবার আসি, উপরের তিন ধরণের বিয়ের ক্লাসিক্যাল উদাহরণে।

১. আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার বাবার আপন চাচাতো ভাই। অর্থাৎ, আলী (রা.) ও ফাতিমা (রা.) –এর মধ্যকার সম্পর্ক হলো চাচা-ভাতিজী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলীর (রা.) আপন চাচাতো ভাই।

২. ফাতিমা (রা.) ইন্তেকালের পূর্বে তিনি স্বামীকে অসীয়ত করে যান, আলী (রা.) যেনো বিয়ে করেন উমামাহ বিনতে আবিল আ’স রাদিয়াল্লাহু আনহাকে। উমামাহ ছিলেন রাসূলুল্লাহর মেয়ে, ফাতিমা (রা.) –এর আপন বোন যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহার মেয়ে। অর্থাৎ, ফাতিমা ও উমামাহর সম্পর্ক খালা-বোনজী। উমামাহ (রা.) তাঁর আপন খালু আলীকে (রা.) বিয়ে করেন। তখন তাঁর খালুর বয়স ৩২ বছর, তাঁর বয়স সর্বোচ্চ ১০ বছর হবে। হাসান, হুসাইন, উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ছিলেন উমামাহর (রা.) আপন খালাতো ভাই-বোন। ফলে, তিনি তাঁর খালাতো ভাই-বোনের হয়ে যান ‘সৎ-মা’।

৩. উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর বয়স তখন ৫৫ বছর। আলী (রা.) তাঁর চেয়ে প্রায় ১৭ বছরের ছোটো। একসাথে চলাফেরার ফলে তাঁদের মধ্যে বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্ক গড়ে উঠলেও আসলে উমর ছিলের আলীর বন্ধুভাবাপন্ন বড়ো ভাইয়ের মতো। সেই উমর (রা.) আলীর (রা.) কাছে প্রস্তাব পাঠান, তিনি নবী পরিবারের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন। তখন উম্মে কুলসুমের বয়স মাত্র ১১ বছর। উম্মে কুলসুমের সম্মতিতে বিয়ে হয়।

বিয়ের সময় উমরের (রা.) বয়স ৫৫ বছর, উম্মে কুলসুমের (রা.) বয়স ১১ বছর; স্বামী-স্ত্রীর এইজ গ্যাপ প্রায় ৪৪ বছর।

মদীনার সমাজে এরকম বিয়ের ঘটনা অহরহ। আমাদের কাছে এই সম্পর্কগুলোর বিয়ে, এমন এইজ গ্যাপ অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু, তৎকালীন আরব সমাজে এটা ছিলো খুবই স্বাভাবিক। এমনকি ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজেও এটা ছিলো স্বাভাবিক, সাহাবীদের মধ্যেও এমন অসংখ্য বিয়ের ঘটনা আছে।

আমাদের সমাজে এই ধরণের বিয়ে কতোটা অস্বাভাবিক, সেটার একটি উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন। হুমায়ূন আহমেদ ও মেহের আফরোজ শাওনের বিয়ে। বাংলাদেশের মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, অভিনেতা, পাবলিক ফিগার এক বউকে ছেড়ে আরেক মেয়েকে বিয়ে করবেন এটা স্বাভাবিক হলেও এই দম্পতির বিয়ে নিয়ে এতো কানাঘুষার মূল কারণ ছিলো- এইজ গ্যাপ এবং শীলা আহমেদের সাথে মেহের আফরোজ শাওনের সম্পর্ক। যার ফলে, এই কথাটি প্রচার করা হয়- ‘শাওন তাঁর বান্ধবীর বাবাকে বিয়ে করেছেন’!

এই বিয়ে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও বাংলাদেশে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিলো না, এখনো নেই। কিন্তু, আরবের সমাজে এমন বিয়ে সামাজিকভাবেও স্বাভাবিক ছিলো; ধর্মীয়ভাবে তো ছিলোই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ও রাসূলের কন্যা ফাতিমার (রা.) বয়সের পার্থক্য কমপক্ষে ১০ বছর ছিলো। ফাতিমা (রা.) ছিলের তাঁর সৎ-মায়ের চেয়ে কমপক্ষে ১০ বছরের বড়ো!

অন্যদিকে, উমর ইবনুল খাত্তাবের মেয়ে হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার চেয়ে তাঁর সৎ-মা উম্মে কুলসুম (রা.) ছিলেন ২২ বছরের ছোটো! হাফসার (রা.) আরেকজন সৎ মা আতিকা বিনতে যায়িদ রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন অবশ্য তাঁর সমবয়সী। দুজনের বয়সের পার্থক্য ৫ বছর।

নবী যুগের, সাহাবীদের মধ্যে বিয়ের এমন উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও এগুলো আমাদের সমাজে প্রযোজ্য হবে না। উমামাহ (রা.) তাঁর খালুকে বিয়ে করলেও, উম্মে কুলসুম (রা.) তাঁর বাবার বন্ধুকে বিয়ে করলেও, ফাতিমা (রা.) তাঁর চাচাকে বিয়ে করলেও আমাদের সমাজের কোনো বাবা তার মেয়েকে তার ভায়রা-ভাইয়ের কাছে, তার চাচাতো ভাইয়ের কাছে, তার বন্ধুর কাছে বিয়ে দেবেন না। কারণ, এটা আমাদের সমাজের নর্ম এবং ইসলাম এমন উরফের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বলে।

দুই.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী খুটিয়ে খুটিয়ে পড়লে তাঁর প্রতি ভালোবাসা অনেকগুণ বেড়ে যায়। তিনি আল্লাহর রাসূল, মক্কা বিজয়ের পর মক্কা-মদীনাসহ জাজিরাতুল আরবের অথোরিটি (শাসক) হওয়া সত্ত্বেও পাবলিক সেন্টিমেন্টকে গুরুত্ব দিতেন। তাঁর স্বপ্ন বা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ‘মানুষ কিভাবে নেবে’ এই ভেবে তিনি অনেক কাজে হাত দেননি। ঐ কাজটি করলে যতোটুকু সুবিধা হতো বা উদ্দেশ্যপূরণ হতো, দেখা যেতো যে কাজটি করার ফল মানুষের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে ধারণা বদলে যেতো এমনকি মানুষ সেটা মেনে নিতো না।

এমন একটি কাজ ছিলো কাবা ঘর পুনর্নির্মাণ করা।

কাবা ঘরের প্রতি শ্রদ্ধা মুসলিমদের যেমন ছিলো, মক্কার মুশরিকদেরও ছিলো। তারা সদ্য ইসলাম গ্রহণ করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর স্ত্রী আয়িশা (রা.) –কে বললেন, “তুমি কি জানো যে, তোমার কওম যখন কাবা ঘর নির্মাণ করেছিলো, তখন তা ইব্রাহীম (আ.) –এর ভিত্ত থেকে ছোটো করেছে?”

আয়িশা (রা.) প্রস্তাব দিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহলে আপনি তা ইব্রাহীম (আ.) –এর ভিত্তির ওপর নির্মাণ করছেন না কেনো?”

“তোমার কওম তো মাত্র কিছুদিন আগেই কুফরি হতে প্রত্যাবর্তন করলো!” [সহীহ বুখারী: ৩৩৬৮]

অর্থাৎ, এই মুহূর্তে যদি কাবা ঘর পুনর্নির্মাণে হাত দেয়া হয়, তাহলে যারা কিছুদিন আগে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাদের সেন্টিমেন্টে আঘাত লাগবে। কাবা ঘর তাদের কাছে পূর্বেও ‘Holy’ ছিলো। এখন যখন দেখবে কাবা ঘরের শেইপ চেঞ্জ করা হচ্ছে, তখন তারা ভাববে এতে কাবার ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে, তারা আবার কুফরির দিকে প্রত্যাবর্তন করতে পারে।

মক্কা বিজয়ের পরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই বছরের বেশি সময় জীবিত ছিলেন। কিন্তু, তাঁর সময়ে তাঁর এই স্বপ্নটি পূরণ করতে পারেননি এমনকি পরবর্তীতে তাঁর সাহাবীদেরকে নির্দেশও দেননি।

রাসূলুল্লাহ পাবলিক সেন্টিমেন্টকে গুরুত্ব দিলেও মক্কা বিজয়ের সময় কাবা ঘরে থাকা ৩৬০ টি মূর্তির ব্যাপারে আপোষ করেননি। শিরকের সাথে তাঁর আপোষ ছিলো না। মক্কা বিজয়ের সাথে সাথে সেগুলো ভেঙ্গে ফেলা হয়। মক্কাকে শিরক মুক্ত করা হয়। অন্যদিকে, প্রায়োরিটির প্রশ্নে কাবা ঘরের পুনর্নির্মাণ ছিলো কম গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ মানুষের সেন্টিমেন্টকে গুরুত্ব দিয়ে সেটা স্থগিত রাখেন।

তিন.

অনেকেই বলেন, “মেয়েরা সব সহ্য করতে পারলেও বহুবিবাহ সহ্য করতে পারে না। মেয়েরা ইসলামের এই বিধান সহজে মেনে নেয় না। তারা চায় না তাদের স্বামী আরেক বিয়ে করুক।”

এই কথাটি একটি ফ্যাক্ট হলেও খুবই জেনারেলাইজড কথা এবং শুধু মেয়েদের ওপর একপাক্ষিক দোষ চাপানো। উদাহরণ দিই।

আবু বকর, উমর, উসমান আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম যে বয়সে ‘মাসনা-সুলাসা’ তথা বহুবিবাহ করেন, আমার বাবা এখন সেই বয়সে। আমার বাবা যদি এখন আরেকটি বিয়ে করতে চান, স্বাভাবিকভাবে আমি মেনে নিতে পারবো না। আমার বন্ধুদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, তারাও একই জবাব দিলো। তারাও তাদের বাবার বহুবিবাহ মেনে নিতে পারবে না।

আমি চাইবো না আমার বাবা আমাদের ঘরে আমার মায়ের একজন সতীন নিয়ে আসুক, আমি চাই না আমার মায়ের চোখের পানি দেখতে। আমার মা না চাওয়াটা স্বাভাবিক, ফ্রম ইমোশনাল পয়েন্ট অব ভিউ, আমি কক্ষনো চাইবো না আমার বাবা আমার জন্য আরেকজন ‘মা’ নিয়ে আসুক। বাংলাদেশের কোনো সন্তান চাইবে না তাদের মা বেঁচে থাকা সত্ত্বেও তাদের বাবা আরেকটি বিয়ে করুক।

আমার বাবার আশেপাশের (আমার চাচা, মামা, দাদা, নানা) কেউই বহুবিবাহ করেনি, অন্তত গতো ৫০ বছরে এমন কোনো উদাহরণ নেই। এটা হতে স্ত্রী মারা যাবার পর আরেকটি বিয়ে, যেটা স্বাভাবিক।

মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা পরিবারের খরচ চালাতে হিমশিম খায়। ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ, ঈদসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কাপড় কিনে দেবার খরচ, মাসে দুই-তিনদিন ‘ফিস্ট’ তথা গরুর মাংস, বড়ো মাছ কিনে খেতে কয়েকবার ভাবতে হয়। সেই জায়গায় যদি আমাদের বাবারা বলে উঠে, ‘আমি আরেকটা বিয়ে করবো’ তাহলে মনে মনে আমাদের অনেকের মনে শঙ্কা জাগবে- আমাদের বাবারা মেন্টালি ফিট কিনা? তাকে ডাক্তার দেখাতে হবে কিনা? কারণ, আর্থ-সামাজিক অবস্থান থেকে এমন প্রস্তাব আসা অস্বাভাবিক।

আমার বাবা যদি বিয়ে করেন, আমাদের এই সমাজে না তিনি মুখ দেখাতে পারবেন, না তার সন্তান হিশেবে আমরা মুখ দেখাতে পারবো। আমি আমার বন্ধুদের কাছে গেলে তারা মশকরা করে বলবে, “তোর বাবা নাকি শুনলাম আরেকটি বিয়ে করছেন!” সামাজিকভাবে এই প্রশ্নগুলোর মোকাবিলা করা কতোটা অস্বাভাবিক, কতোটা বিব্রতকর, একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন। আমার নানা বাড়িতে আমার বাবার যে ইমেইজ ছিলো, সেটা কি তখন থাকবে? বাবার বন্ধুদের কাছে বাবার যে ইমেইজ ছিলো, সেটা থাকবে? আত্মীয়-স্বজনরা বাবাকে যেভাবে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবে, সেগুলোর উত্তর কি তিনি দিতে পারবেন?

বহুবিবাহ সংক্রান্ত যতোই আলাপ-আলোচনা হোক না কেনো, অনলাইনে সব আলাপে লিপ্ত ১৫-৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী। থিওরিটিক্যাল কথাবার্তা বললেও প্রেকটিক্যাল চিন্তায় তারা কতোটা ‘অসামাজিক’ বা ‘সমাজবিরুদ্ধ’ থিওরি উপস্থাপন করছে, সেগুলো তাদের লেখার মধ্যেই ফুটে ওঠে। পাবলিক সেন্টিমেন্টকে তারা বিবেচনা করতেই রাজি না। এমনকি নিজের বাবাকে, নিজের ভাইকেও বহুবিবাহের ব্যাপারে উৎসাহ দিতে বলে তারা তখন চুপ থাকবে! কারণ, তারা চায় না তাদের বাপ-ভাই আরেকটি বিয়ে করুক। সেটা স্বাভাবিকভাবে কেউই চায় না।

যখন শুনবো আবু বকর (রা.) ৪ টি, উমর (রা.) ৭ টি, উসমান (রা.) ৮ টি, আলী (রা.) ১০ টি বিয়ে করেছেন (একসাথে একইসময় চারজনের বেশি না) তখন বলবো, ‘মা শা আল্লাহ, ভালো’। সেই সমাজের স্বাভাবিক একটি কাজ তারা করেছেন। যখন শুনবো পাকিস্তানের একজন আলেম, বাংলাদেশের একজন চার বিয়ে করেছেন, তখনো বলবো ‘মা শা আল্লাহ, ভালো। তারা তাদের পারিপার্শ্বিক সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই বিয়ে করেছেন। তাদের পরিবেশ সাপোর্টিভ ছিলো’।

কিন্তু, এই উদাহরণগুলো দিয়ে যদি বহুলভাবে বলা হয়, সাহাবীরা বহুবিবাহ করেছেন, আপনারা কেনো এই আমল করছেন না, সমাজের সবাই কেনো বহুবিবাহ করছে না? তাহলে বলতে হয়- এটা ইবাদাতের প্রশ্ন না, সামাজিকতার প্রশ্ন। ইবাদাতের প্রশ্নে সাহাবীরা আমাদের আদর্শ, তাদেরকে অনুসরণ করতে হবে; কিন্তু সামাজিক রীতি-নীতির প্রশ্নে সাহাবীদেরকে পর্যন্ত আমরা হুবহু অনুসরণ করবো না। সেক্ষেত্রে আমরা দেখবো আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক আচার।

ঠিক যেমনভাবে আমরা আমাদের বোনকে আমাদের আপন বিপত্নীক খালুর সাথে বিয়ে দেবো না, আমার বাবার বয়স্ক বন্ধুর সাথে বিয়ে দেবো না, আমার বাবার চাচাতো ভাইয়ের তথা আমার চাচার সাথে বিয়ে দেবো না; যদিও সাহাবীদের সময় এমন বিয়ে হতো। সেই উদাহরণ আমার সমাজে হুবহু অনুসরণ করা হয়নি, হচ্ছেও না, হবেও না।

বহুবিবাহের জন্য আমাদের সমাজ সামাজিকভাবে সেই অবস্থায় নেই, যেই অবস্থায় সাহাবীরা ছিলেন। তারপরও আমাদের সমাজে কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে বহুবিবাহ করে, তাহলে তিনি করতে পারেন। কারণ, ইসলাম বহুবিবাহের অনুমতি দিয়েছে, নির্দেশ দেয়নি। এটা না করলে কেউ গুনাহগার হবেন, এমন না। ব্যক্তি পর্যায়ে কারো জন্য একাধিক বিয়ে করা ‘ওয়াজিব’ হতে পারে, কারো জন্য ‘মাকরুহ’ হতে পারে।

গতো ১৪০০ বছর ধরে আলেমগণ খুব ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সাহাবীদের কোন কাজটি আদর্শ তথা ইবাদাতের ক্ষেত্রে রেফারেন্স আর কোন কাজটি সামাজিক প্রথা। আলী-ফাতিমার (রা.) বিয়েতে মোহরানার ব্যাপারটিকে মোহরানার একটি আদর্শ স্ট্যান্ডার্ড হিশেবে ধরা হলেও এই উদাহরণ দিয়ে ‘আপন চাচাতো ভাইয়ের মেয়েকে বিয়ে করো’ কথাটি ঢালাওভাবে কেউ বলেনি। গতোকাল বাংলাদেশের কয়েকজন সম্মানিত মুফতিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তারাও বলেছেন, সমাজে এই উদাহরণ টেনে বিয়ের ব্যবস্থা হলে সামগ্রিক ফিতনার আশঙ্কা আছে। ফলে, আলী (রা.) তাঁর আপন চাচাতো ভাইয়ের মেয়েকে বিয়ে করলেও আমাদের সমাজে যেনো সেটাকে ঢালাওভাবে উৎসাহিত করা না হয়।

বহুবিবাহ পুরোটাই আর্থ-সামাজিক ব্যাপার; শরীয়ত সেটাকে ‘অনুমতি’ দিয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা মোটাদাগে বহুবিবাহের অনুপযোগী। এটা সত্ত্বেও কারো যদি আর্থ-সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক সক্ষমতা থাকে, তিনি করতে পারেন; কিন্তু এটাকে ট্রেন্ড বানানো যাবে না। এতে করে পারিবারিক ও সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হয়।

বহুবিবাহের পক্ষে লেখালেখি করার আগে মাকাসিদে শরীয়াহর আলোকে একশোবার ভাবতে হবে, আপনার লেখাগুলো কারো সংসারের সাজানো বাগানের অশান্তি সৃষ্টির কারণ কিনা।

৩ ডিসেম্বর ২০২১

লেখকঃ ইসলামী বিষয়ে কলাম লেখক 

লেখকের আরও লেখা পড়ুন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেনো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো?

আরও পড়ুন