সমন্বিত মূল্যবোধের চাষ

।। ওমর ফারুক ।।

সংক্রামক কোনো ব্যাধি নয়, ব্যাধির চেয়েও বেশি, মহামারী। হাসি, কাশি,কান্না, দুর্নীতি সংক্রমিত হয় দ্রুত।তবে মূল্যবোধ! এ আবার সংক্রমিত হয় নাকি ? হ্যাঁ মূল্যবোধও সংক্রমিত হতে পারে ,তবে সে সংক্রমণ বিপরীত বস্তুটাকেই বাড়িয়ে তোলে।সহজ করে বললে নেতিবাচক এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিসের প্রতি সহজাত একটা স্থিতিস্থাপক টান জোরের সাথেই চলে।বিষয়টা বাহ্যিক দৃষ্টিতে ধরা নাও পড়তে পারে।এতোটা সূক্ষ এবং বিবেচনাপ্রসূত নয় বলে দৃষ্টি সেখানটায় নিবন্ধিতই হয় না।

মূল্যবোধ সমন্বিত হয় কিনা এ নিয়ে অনেকেরই সংশয় আছে।একক এবং এককেন্দ্রিক ভাবখানা বহুরুপতায়, বহুগামি হয়ে যাক এ আশা আমারও নেই। কিন্তু আশা তো আর সহজ নিয়মকে বদলে ফেলতে পারে না।মূল্যবোধ এক আপেক্ষিক আর নিয়মতান্ত্রিক বিয়ষ।বৈশ্বিক জলবায়ু তাকে স্পর্শ করে না ঠিকই, আবার সে আবহাওয়া থেকে নিস্তারও পায় না।মূল্যবোধ তো গড়ে ওঠে নিজের ভেতরে, একান্তে, আবরণ ছাড়া। প্রশ্ন সেটা নয়।প্রশ্ন হলো মূল্যবোধ সমন্বিত ভাবে চাষ করতে হবে কেন ? বা মূল্যবোধ কি চাষের বস্তু ? এ বিষয়ে বিস্তর প্রশ্ন আসতে পারে মনে।আর এমন প্রশ্নের রাস্তাও প্রসারিত। অনেক সময় ধরণ দেখেই ভেতরটা আচ করা যায়।কিন্তু এখানে অনুমানের সম্ভাবনা সীমিত এবং বিপদজনক।

এখন সবচেয়ে জরুরি দরকার হলো মূল্যবোধ পয়দা।কিন্তু এ তো আলু, পটলের মূল্য নয়।এ হলো বোধের বিষয়। যার তীব্র অভাব চারদিকে। এ অভাববোধের কারণেই জন্ম নিচ্ছে বিভিন্ন অমানবিক উপসর্গ।

মূল্যবোধের চাষ হয় কিনা এ নিয়ে সংশয় থাকতে পারে, কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কেউ হয়তো দ্বিমত করবে না।এখন আশা যাক কিভাবে সমন্বিত হাইব্রীড মুক্ত মূল্যবোধের চাষ করা যায় সে বিষয়ে দু -চার কথা বলি।প্রথমেই বলে রাখি মানুষ সহজে বদলাতে চায় না।সে যেমন আছে তেমনিভাবে কাটিয়ে দেয়ার একটা নিউটনীয় প্রবণতা তার রয়েছে।আর প্রবণতা মানুষের আমিত্ববোধ এবং নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে সংরক্ষণ করছে।শুধু সংরক্ষণ নয়, বীজের মতো বিস্তারেও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।সেজন্য প্রথমেই এর বিস্তরণ বন্ধের বা বিস্তরণ ঠেকানোর ব্যবস্থা করতে হবে।মানুষ সহজে বদলায় না বা বদলাতে চায় না এটা অত্যন্ত আদিম ধারণা। মানুষ কেন বদলাতে চায়না এনিয়ে নানা মতামত রয়েছে।তবে কাছাকাছি এবং সহজ মত হলো, “মানুষ নিজের সম্পর্কে অতি বেশি সংশয়ে ভোগে এবং নিজেকে নতুনের সাথে মিলাতে চায় কম।এখন এই যে সম্মিলন না হওয়া এর ফলে এক ধরনের গোঁড়ামি পয়দা হচ্ছে।আর এই অসহনশীল গোঁড়ামি মানুষের মূল্যবোধ সৃষ্টিতে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর এ কারণেই চারপাশের আবহাওয়া দ্রুত দূষিত হচ্ছে।সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার বাঁচাতে হলে প্রথমেই মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে হবে।কিন্তু মূল প্রশ্নের এতে সমাধান হচ্ছে না।মূল্যবোধ কীভাবে পয়দা হতে পারে। কারণ এটা দৃশ্যমান এবং পরিমাপযোগ্য হলেও আপেক্ষিক। আর এই আপেক্ষিক বস্তু মানুষের মাঝে কীভাবে সংক্রমিত হতে পারে এনিয়ে বিস্তর সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

সমাজে সব মানুষ সাদাকে সাদা বলে না, সুদকে ত্যাগ করেনা, মিথ্যে বলা দূষণীয় মনে করে না।হ্যাঁ জলকে সবাই তরল মনে করে, দুধকে আদর্শ খাদ্য মনে করে।কিন্তু এগুলো সর্বব্যাপী এবং নিজের প্রয়োজনীয়। এই প্রয়োজনীয়তাটাই হলো আসল বস্তু। এই দরকারী বস্তুটাকে যখন নৈব্যচনিক থেকে আবশ্যিক করা যাবে তখনই সমাজে মূল্যবোধের চাষ সম্ভব হবে।

এর জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন পড়বে না।পরিবারই মূল্যবোধ চাষের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।সময়ের প্রয়োজনে এখন মূল্যবোধ চাষ জরুরী হয়ে উঠেছে।সমাজ,রাষ্ট্র যেভাবে সামাজিক অবক্ষয়কে ধারণ করেছে, যেভাবে নীতিবোধ ছেড়ে নতুনভাবে, কৌশলে সবকিছুর সংজ্ঞা বদলে ফেলা হচ্ছে তাতে করে সমাজ পরিবর্তন হয়তো হচ্ছে কিন্তু সমাজ আদিম সমাজের চরিত্র ধারণ করে কতদূর যেতে পারবে।সমাজের চলার পথ, কাঠামো ঠিক রাখতে হলেও মানবিকতা চর্চার প্রয়োজন রয়েছে।

এখন বড় প্রশ্ন হলো সমন্বিত মূল্যবোধ কেন চাষ করতে হবে ? মূল্যবোধ সৃষ্টি ব্যক্তির নিজস্ব ধারণা, নিজস্ব বিশ্বাসের বিষয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই।কিন্তু এই বিশ্বাস যদি বহুধাবিভক্ত হয়, এর যদি অনেক শাখা -প্রশাখা থাকে, ব্যত্বয়টা ঠিক সে জায়গায়ই ঘটে।বিভিন্ন বিশ্বাসকে পুঁজি করে গড়ে উঠে দুষ্ট চক্র, বলয়।আর এ বলয় দ্রুত ঢুকে পড়ে সমাজের রন্ধ্রে। আর তখন সমাজ রাহু গ্রাসে আক্রান্ত হয়।এই রাহু মুক্তির জন্যই সমন্বিত বিশ্বাসের, মূল্যবোধের প্রয়োজন। যার আবাদ হবে পরিবারে, ব্যক্তির চর্চায়।আর এ বিষয়টিই এখন জরুরী হয়ে উঠেছে।

লেখকঃ কলাম লেখক

আরও পড়ুন