আফ্রিকার মুসলিমরাই বিশ্বের প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা

তাওহিদ নোমান ও কাজী আখতার উদ্দিন 

দাওয়াত বা ধর্ম প্রচারের জন্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে সাহাবারা ও তাদের পর তাবেইন, তাবে তাবেইন ও একবিংশ শতাবদী পর্যন্ত নবীর উত্তরসূরি ও আবেদ আল্লাহওয়ালারা বের না হলে আজ আমরা প্রবাসে ননমুসলিম ইউরোপীয়ান, আমেরিকান, এশিয়ান ও আফ্রিকার দেশগুলোতে এতো মুসলমান মুসললা, মসজিদ, মকতব, দাওয়াহ মারকাজ ও মাদ্রাসা বা ইসলামিক স্কলার ও মাদ্রাসাগুলো পেতাম না।

ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার জ্ঞান পিপাসু মুসলিম স্কলাররা আজ থেকে প্রায় ১২০০ বছর আগে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করে অথচ আজ আমরা অনেকেই তার পায়োনিয়ার প্রতিষ্ঠাতার নামও জানিনা, চিনিনা কিন্তু খুব ভালো জানি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা উচচশিক্ষার জন্য টপ ৩ দেশের টপ ২০ এর কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, হারভার্ড, বার্কলে, প্রিন্সটন, ইয়েল, স্টানফোর্ড, কলাম্বিয়া, টরনটো, ম্যাকগিল ইত্যাদি নামগুলো।

বাস্তবে পৃথিবীর সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিদার একজন আফ্রিকান ও মুসলিমা কিন্তু মজার ব্যাপার হলো আজো আমরা সবাই জানি উচচশিক্ষার ও নিরক্ষরতায় আফ্রিকা মহাদেশে বেশীর ভাগ দেশগুলো অনেক পিছনে যার জন্য দায়ী ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শোসন।

পৃথিবীর সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ফাতিমা আল-ফিহরির নামটি ইতিহাসের পাতায় প্রথমেই অবস্থান করছে। একজন মুসলিমা নারীই উচ্চশিক্ষার অগ্রপথিক হিসেবে এমন একটি প্রতিষ্ঠান ৮৫৯ সনে গড়ে তুলেন যেখানে বিভিন্ন পর্যায়ের সনদ বিতরণ করা হতো।

তারপর ৯৭৯ খৃষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পৃথিবীর ২য় মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। সেটারও প্রতিষ্ঠাতা মিশরীয় আফ্রিকান মুসলিমরা।

তার ১০০ বছর পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়, ইতালির বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১০৮৮ সালে।

আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা দুটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামব্রিজ এবং অক্সফোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যথাক্রমে ১২০৯ এবং ১০৯৬ সালে। তবে পুরো বিশ্বের তো বটেই, এগুলোর কোনোটিই ইউরোপেরও প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না।

৯ম খৃষ্টাব্দের শুরুতে অভিজাত একটি পরিবার তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান থেকে মরোক্কোর ফেজ নগরীতে চলে আসেন। নয় শতকের প্রথমভাগে অনেক পরিবারই পশ্চিমের এই ব্যস্ত নগরীর অভিবাসী হতে চাইতেন। তিউনিসিয়ার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আল-ফিহরির জন্য ফেজ ছিল তার পারিবারিক ব্যবসা প্রসারের একটি চমৎকার স্থান। ফেজ নদীর বাম তীরে এই নগরীতেই ফাতিমার পরিবার স্থায়ী আবাস করলেন এবং এখানেই তার বিয়ে হয়।

তখন দ্বিতীয় ইদরিসের শাসন চলছিল,
যিনি একজন ধর্মপ্রাণ ও অসাধারণ শাসক ছিলেন। ফেজ ছিল মুসলিম-পশ্চিম তথা আল-মাগরেবের অন্যতম কর্মব্যস্ত রাজধানী এবং একটি সম্ভাবনাময় নগরী যা মানুষের মনে সৌভাগ্যের ধারণা ও পরম সুখের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরত। অন্যতম প্রভাবশালী এই ইসলামী নগরীতে ঐতিহ্যবাহী ও বিশ্বজনীন- উভয় ধরনের ধর্ম ও সংস্কৃতির সমাবেশ হয়েছিল।

মোহাম্মদ আল-ফিহরির দুুই কন্যা ফাতিমা ও মরিয়ম, উভয়েই সুশিক্ষিত ছিলেন। ফাতিমার স্বামী, পিতা ও ভাই স্বল্প বিরতিতে পরপর মৃত্যবরণ করায় তিনি ও তার একমাত্র বোন মরিয়ম উত্তরাধিকার সূত্রে প্রচুর সম্পত্তির মালিক হন। জীবনের পরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের বিশিষ্ট ও সম্মানিত করে গড়ে তুলেন।

দুই বোনই সুশিক্ষা লাভ করার পর অতিদ্রুত সব সম্পদ সমাজের কল্যাণে নিবেদন করেন। দিন দিন নামাজিদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ফেজের স্থানীয় মসজিদে স্থান সংকুলান হতো না। এদের মধ্যে মুসলিম স্পেন থেকে আগত অনেক শরণার্থীও ছিলেন। এ অবস্থা লক্ষ্য করে ২৪৫ হি/ ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে মরিয়ম অত্যন্ত মনোরম এবং বিশাল একটি আন্দালুসিয় মসজিদ নির্মাণ করেন।

আর ফাতিমা আল-কারাউইন মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, এটি বিশ্বের প্রাচীনতম সনদ বিতরণকারী বিশ্ববিদ্যালয়, যা এখনও কাজ করছে। গ্রিনিস বুক অফ রেকর্ড অনুযায়ী এ বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বের প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ফাতিমা স্বয়ং নির্মাণকাজের তদারকি করেছিলেন এবং নির্মাণ প্রক্রিয়ায় অনেক দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এতে তার লক্ষ্যের প্রতি তার গভীর নিষ্ঠা বোঝা যায়, অথচ এসব বিষয়ে তার বিশেষ জ্ঞান বা দক্ষতা ছিল না!

ফাতিমার গভীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, তাই তিনি প্রথম থেকেই মসজিদের পাশে জমি কিনে এর পরিসর বৃদ্ধি করেন। পুরো পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করার জন্য যতটুকু অর্থ ও সময়ের প্রয়োজন ছিল তা তিনি ব্যয় করেন। অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ফাতিমা ধর্মপালনের বিষয়ে খুবই আন্তরিক ছিলেন।

তিনি একটি নিয়ত করলেন এবং ২৪৫ হিজরি/৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের রমজান মাসে নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকে শুরু করে প্রায় দুই বছর পর পুরো কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন রোজা রাখলেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করে সে মসজিদ নির্মাণ শেষ করেছিলেন, অবশেষে সেই মসজিদে শুকরিয়া আদায় করে নামাজ পড়লেন।

মসজিদ আল-কারওয়াইন উত্তর আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ মসজিদ ছিল এবং এতে যে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল তা, মধ্যযুগে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হল।

এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট মুসলিম চিন্তাবিদ বের হয়ে আসেন, তাদের মধ্যে ছিলেন আবুল-আব্বাস, আইনবিদ আল-ফাসি এবং বিখ্যাত লেখক ও পর্যটক লিও আফ্রিকানাস।

এ ছাড়া আরও অনেক বিখ্যাত মনীষীর নাম এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত হয়ে রয়েছে- এরা হলেন মালিকি আইনবিদ ইবন আল-আরাবি (মৃ. ৫৪৩হি/১১৪৮খ্রি.), ঐতিহাসিক ইবন খালদুন (মৃ. ৮০৮ হি./১৪০৬খ্রি.) এবং জ্যোর্তিবিদ আল-বিতরুজি (মৃ. ১২০৪ খ্রি.)।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অমুসলিমদেরও ভর্তি করা হতো। প্রকৃতপক্ষে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ মানে আকৃষ্ট হয়ে অভার্ণর গারবার এখানে ভর্তি হয়েছিলেন। ইনি পরবর্তীকালে পোপ দ্বিতীয় সিলভেস্টার হন এবং মধ্যযুগের ইউরোপে আরবি সংখ্যা ও শূন্যের ধারণার প্রচলন করেন। ইহুদি চিকিৎসাবিদ ও দার্শনিক মায়মোনাইডস এই বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম বিখ্যাত একজন ছাত্র ছিলেন।

১৪ শতকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আল-কারাউইন গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একটি গ্রন্থাগার হিসেবে এখনও বিরাজ করছে। এখানে ইসলামের বেশ কয়েকটি মূল্যবান পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে।

এর মধ্যে রয়েছে- হরিণের চামড়ার ওপর লেখা ইমাম মালিকের মুওয়াত্তা, ইবনে ইসহাকের সিরাহ, ইবন খালদুনের প্রধান রচনা আল-ইবার এবং ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আহমেদ আল-মনসুরের কাছ থেকে উপহার পাওয়া একটি কোরআন।

৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে আল-কারাউইন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রায় ১২০০ বছর পার হয়ে গেছে এবং এখনও এখানে ধর্মীয় এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে ছাত্ররা স্নাতক অধ্যয়ন করছে এবং তাদের যথাযথ ডিগ্রিও প্রদান করা হচ্ছে। ১৪ শতকে এই বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮০০০ ছাত্র ছিল।

কোরআন ও ফিকহ্ ছাড়াও এখানে অন্যান্য বিষয়, যেমন- ব্যাকরণ, চিকিৎসাবিদ্যা, গণিত, জ্যোর্তিবিদ্যা, ভূগোল এবং সঙ্গীত শিক্ষা দেয়া হতো। ক্রমশ আরও অন্যান্য বিষয়ও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, বিশেষত প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা ও বিদেশী ভাষা।

ফাতিমা সারা জীবন ইসলামী ঐতিহ্যবাহী ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পেছনে অতিবাহিত করেছেন। আর মানবতার একজন প্রকৃত হিতকারী মানুষ হিসেবে আল্লাহতায়ালার প্রিয়জন হয়েছেন। পৃথিবী তাঁর কর্ম গ্রহণ করে উপকৃত হয়েছে।

আজ ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও প্রায় ৭০টি মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর শিক্ষার জন্য ননমুসলিমপ্রধান
পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে এসে দুর্বল ঈমান ও ইলম বা ইসলামিক জ্ঞান নিয়ে যখন স্বদেশে ফেরত যাই দেশটাকে বিজাতীয় ও অপসংস্কৃতি দিয়ে ধংস করে ফেলেছি এবং
নিজ মুসলিমপ্রধান দেশের মুসলিম শিশু থেকে দ্বাদশ শ্রেনীর মাদ্রাসা সাথে হাফেজখানা, কিতাবখানা, এতিমখানা এমনকি উচ্চশিক্ষার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারদের বুঝিনা।

আর এজন্য আমাদের মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে পাশ্চাত্যের একাডেমিক স্কলার ও একই সাথে ইসলামিক স্কলার সবল ঈমানদার শাসক নির্বাচন করলেই দেশবাসীর দুনিয়া ও চিরস্থায়ী আখেরাতের সফলতা আসবে ইনশাললাহ।

মহান আল্লাহই একমাত্র আমাদের সদিচ্ছা, সততা ও সৎকর্মের উপর সবাইকে সফল করতে পারবেন।

হে আললাহ দয়া করে আমাদের সবাইকে হৃদয় জুড়ে ঐক্যবদ্ধ করে সফলতার জন্য কবুল করুন, আমীন।

লেখকসুত্র :
কাজী আখতার উদ্দিন ও
তাওহিদ নোমান, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স লিডিং ডক্টরেট শিক্ষার্থী, গবেষক, অবসরপ্রাপ্ত একাডেমিক শিক্ষক, ধর্ম প্রচারের মুহাজির বা অভিবাসী ও সমাজকর্মী 

আরও পড়ুন