ইংল্যান্ড ও ইসলামঃ এক অনুসন্ধানী পথযাত্রা-৫

জিয়াউল হক

আরবভূমি থেকে হাজার হাজার মাইল দুরের এই জনপদে দূর্গটির নামের সাথে আরাবিয়া শব্দটি কেন ও কিভাবে এলো? উত্তর জানতে প্রায় দুই হাজার বসর আগেকার ইতিহাস ঘাঁটতে হবে। দেখতে হবে যে ঐতিহাসিক ক্রমধারায় রোমের সাথে আরবদের সংমিশ্রণ এবং সেই রোমানদের ঘাড়ে ভর করে আরব জনগোষ্ঠী কিভাবে, কোন সময় এবং কোন ঘটনা প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ইংল্যান্ডের মাটিতে এসে উঠলেন?

দূর্গটির নামকরণ নি:সন্দেহে একটা রহস্যময় বিষয়। আজ হতে দু হাজার বৎসর আগের প্যাগান ইংল্যন্ডে ডেন, জুটস, কিংবা এংলো-সেক্সন কোন জাতিগোষ্ঠির ভাষার সাথেই এই ‘র্এ্যবিয়া’ বা ‘এ্যরবিয়ে’ (Arbeia) শব্দটির উৎপত্তিগত বা ধ্বনীগত কোন মিল নেই।

আরও মজার বিষয় হলো এই যে, খৃষ্টপূর্ব ৫৫ এবং ৫৪ সালের সম্রাট জুলিয়াস সিজারের সময়কাল থেকে শুরু করে খৃষ্টপূর্ব ৩৪, ২৭ এবং ২৫ সালে সম্রাট অগাষ্টাস, ৪৩ খৃষ্টাব্দে ক্লাউডিয়াস কর্তৃক পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু আর ৭৭ খৃষ্টাব্দে ব্রিটেন দখল সমাপ্ত করে বর্তমানে ‘ইংল্যন্ড’ নামে পরিচিত এই দ্বীপটিকে রোমান সাম্রাজ্যভূক্ত করলেন এবং ‘ব্রিটানিয়া’ নামে নামকরণও করলেন, কাদের কারো নামের সাথেই এর কোন মিল নেই।

আবার যে রোমান সম্রাট হেড্রিয়ান সরেজমিনে নতুন এই রোমান প্রদেশটিকে দেখতে দুই দুইবার সেই সুদুর রোম থেকে ছুটে এলেন, এখানকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্কটল্যন্ড থেকে আলাদা করতে তিনি এখানে প্রায় ৭৪ মাইল লম্বা প্রাচীরও নির্মাণ করালেন, তার কিংবা যে রোমান সম্রাটের সময়কালে আলোচ্য এই দূর্গটি তার সর্বোচ্চ কর্মক্ষম অবস্থায় উঠে আসে, সেই সম্রাট ‘Septimius Severus’ তার নামের নামকরণ করা হয়নি। এইসব  সম্রাটদের, সকলেরই অফিসিয়াল ভাষা ছিল ল্যাটিন। ‘এ্যরবিয়া’ বা ‘এ্যরবিয়ে’ (Arbeia) শব্দটি সেই ল্যাটিন ভাষারও কোন শব্দ নয়।

তা হলে এর উৎসমূল কোথায়? আর এরকম নামকরণই বা কেন? অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক এ প্রশ্নটিরই উত্তর খোঁজার জন্য হাজির হয়েছিলাম দূর্গটির সাইট সংলগ্ন ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত বিভাগের মাঠ অফিসে।

রিসিপশনিষ্টের সাথে কথা বলার আগে সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত এলাকাটি। প্রত্নতাত্তিক খননকার্য চলছে, এমন সাইটে নানা বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা থাকে। সেগুলো মেনেই ঘুরে ঘুরে দেখলাম এবং কিছু ছবিও নিলাম।

প্রবেশ পথেরই এক কোণে সুন্দর পরিপাটি আধুনিক সুবিধা সম্বলিত একটা অফিস রয়েছে, সেখানে নিজের কাজে ব্যস্ত থাকা রিসেপশনিষ্টের মাধ্যমে যোগাযোগ করলাম সাইটটিতে ব্রিটিশ আর্কিওলোজিস্ট ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে চিফ আর্কিওলোজিষ্ট এবং এখানে খননকার্যের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত আছেন প্রায় ষাটোর্ধা অভিজ্ঞ এবং প্রাজ্ঞ এক নারী গবেষক; মিসেস এ্যলেক্স ক্রুম (Alexandra Croom) এর সাথে। পেশাগত জীবনে আলেক্স একজন ডাকসাইটে আর্কিওলোজিষ্ট, ইংল্যান্ডের নানা প্রান্তে অবস্থিত রোমান সাইটি সমূহে খননকাজে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্না একজন অভিজ্ঞ গবেষক। সেই ১৯৮৭ সাল থেকে সাউথশিল্ডসের এই রোমান ফোর্ট খননকার্যে জড়িত আছেন। এখানকার প্রধান প্রত্নতত্তবীদই কেবল নন, প্রকল্পটির Projects Manager বা পরিচালকও বটে।

পূর্বনির্ধারিত এ্যপয়েন্টমন্টে না থাকার সত্তেও তিনি সময় দিলেন। সাইটটটির এক কোণে অস্থায়ী ভিত্তিতে নির্মিত কাঠের অফিসে ঢুকে বিষ্ময়াভিভূত না হয়ে পারা যায় না। ঘরের চারিদিকে, আনাচে কানাচে নানা ধরনের সারী সারী বাক্স সাঁজানো, যার মধ্যে খনন এলাকা থেকে পাওয়া রোমান জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত সামগ্রী! প্রায় দুই হাজার বৎসর আগেকার বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিসপত্রের মধ্যে যুদ্ধাস্ত্র, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য বস্তু থেকে শুরু করে মাটির হাড়ি পাতিল, বসতবাড়ীর আসবাবপত্রের ভগ্নাবশেষের নানা টুকরো জমা করা হয়েছে। প্রত্যেকটি আইটেমের সাথে একটা করে ফাইল বিস্তারিত বিবরণ, প্রাপ্তিস্থানের নিখুঁত বর্ণনা দিন-তারিখ’সহ উল্লেখ করা হয়েছে ভবিষ্যতে আরও বিস্তারিত ও বিশদ গবেষণার জন্য।

আলেক্সের কাছে জানতে চাইলে তিনি নির্দ্বিধায় এবং এক কথায় সোজা সাপ্টা জানিয়ে দিলেন আরবিয়্যে রোমান টেম্পল হিসেবে নামকরণের পেছনে একটামাত্র কারণ হলো, এই দূর্গটিতে আরবীয় রোমান সৈন্যদের মোতায়েন করা হয়েছিল দ্বিতীয় শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধ সময়কাল থেকে তৃতীয় শতাব্দির মধ্যবর্তি সময়কালের নানা সময়ে আগতদের।

এই দূর্গটিতে আরব সৈন্য ছাড়া অন্য কোন রোমান সৈন্য মোতায়েন ছিল না, তেমনটা বলা যাবে না, সম্ভবত ছিল। তবে এখানে প্রধানত ও মূলত ফোরাত নদীর আশে পাশের এলাকা হতে আনা আরবদের নিয়ে গঠিত ‘Tigris bargemen’ নামের একটি প্লাটুন মোতায়েন করা হয়েছিল, এরকম নিশ্চিত তথ্য আমাদের হাতে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ঠ বিষয়ে একজন গবেষকের মুখে এরকম নিশ্চয়তা’সহ এরকম অকাট্য তথ্য পাওয়া বাধ্য হয়েই আমাকে ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ খুঁজতে হবে কার মাধ্যমে, কখন? আরবের কোন অঞ্চল হতে এবং ঠিক কতোজন আরব এসেছিলেন ইংল্যান্ডের মাটিতে? তাদের ধর্মবিশ্বাস কি ছিল?

এ সব প্রশ্নের উত্তর।

(চলবে)

আগের পর্ব-ইংল‍্যান্ড ও ইসলাম: এক অনুসন্ধানী পথযাত্রা-৪

লেখক: ইংল‍্যান্ডের বেসরকারী মানসিক হাসপাতালের সাবেক সহকারী পরিচালক ও লেখক, ইংল‍্যান্ড

আরও পড়ুন