ওসমানী সালতানাতের যতকথা (পর্ব-০১)

জান্নাত খাতুন

আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিশর, ইয়েমেন, সৌদি আরব, জর্দান, ইসরাইল, ফিলিস্তিন, কুয়েত, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, তুরস্ক, সাইপ্রাস, গ্রীস, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, সার্বিয়া, আলবেনিয়া, কসোভো এবং হাঙ্গেরী ছিলো একটি সম্রাজ্যের অংশ। যাকে ওসমানীয় সালতানাত বা “Ottoman Empire” বলা হয়। তিনটি মহাদেশ এবং ৬০০ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত এই সম্রাজ্য কীভাবে তৈরি হলো? কীভাবে এই সম্রাজ্য তৎকালীন সুপার পাওয়ার হয়েছিল? এবং তারপর কেন এমনভাবে ছিন্ন ভিন্ন হলো যার কারণে আজ ওসমানীয় সালতানাতের ইতিহাস খোঁজাও এক মহান কাজ। চলুন ওসমানীয় সালতানাতের যতকথা সিরিজের প্রথম পর্বে ওসমানীয় সালতানাতের স্বপ্নের বীজ সম্পর্কে জানা যাক।

আজকের তুরস্ককে হাজার বছর পূর্বে আনাতোলিয়া বলা হতো। যার পশ্চিমে ছিলো তুর্কী মুসলিম সম্রাজ্য সেলজুক সম্রাজ্য (Seljuk Empire)। আনাতোলিয়া ছিলো রোমানদের বাইজেন্টিন সম্রাজ্যের (Byzantine Empire) অংশ। বাইজেন্টিন সম্রাজ্য আনাতোলিয়া এবং ইউরোপের পূর্ব অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। এই সম্রাজ্যের রাজধানী ছিলো একটি দূর্গশহর কনস্ট্যান্টিনোপল (Constantinople)। যা আজকের ইস্তাম্বুল।আনাতোলিয়ার শেষ প্রান্তের কাছের এক জায়গায় আছে লেক ভান। কথিত আছে যে, লেক ভানে কুমির ও মাছের আকৃতির এক দানব থাকে। লেক ভানে কোন দানব না থাকলেও লেক ভানের রয়েছে অসাধারণ সৌন্দর্য। লেক ভানের পাশে খ্রিস্টানদের একটি গির্জা আছে। লেক ভানের তীরে ১০০০ বছর আগে এক ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। যা বাইজেন্টিন সম্রাজ্যের আয়তন অর্ধেক করে দিয়েছিলো। প্রতি বছর আগষ্টের মাসে এই যুদ্ধের স্মরণে অনুষ্ঠান হয়। এই অনুষ্ঠান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রতি বছর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এই অনুষ্ঠানে সেই যুদ্ধের স্মরণে একটি খেলার আয়োজন করা হয়। সেই খেলায় তুর্কী অশ্বারোহীরা ঘোড়ার লাগাম না ধরে পেছন ঘুরে নিশানায় তীর মেরে থাকে। এটা আজ শুধু এক খেলা হলেও ৯৩৮ বছর পূর্বে তুর্কীদের পূর্ব পুরুষরা এই কৌশলেই রোমানদেরকে আনাতোলিয়া থেকে বিতাড়িত করেছিলো। ১১ শতাব্দীতে সেলজুক এবং রোমানদের মধ্যে এই অঞ্চলের অধিকার নিয়ে সংঘর্ষ চলতো। আনাতোলিয়া রোমানদের বাইজেন্টিন সম্রাজ্যের অংশ হওয়ায় রোমানরা আনাতোলিয়ার সীমান্ত ঘেঁষে অনেকগুলো দুর্গ নির্মাণ করেছিলো। যা সীমান্ত চৌকি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। দুর্গগুলোর সৈন্যরা হামলাকারীদের প্রতিরোধ করতো। কিন্তু সেলজুকদের হামলা এতটা বেড়ে গিয়েছিলো যে, তা সামলাতে দুর্গগুলোও হিমশিম খেত। বাইজেন্টিন সম্রাজ্যের সম্রাট রোমানোস সেলজুকদের হুমকি চিরতরে শেষ করার জন্য ১ লাখ এর কিছু বেশী সৈন্য নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। রোমানোস যখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন তখন মহান সেলজুক সুলতাম আল্প আরসালান মিশরের ফাতেমীয় খিলাফাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন। সুলতান আল্প আরসালান ফাতেমীয়দের কাছ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস এবং সিরিয়ার সীমান্তাবর্তী অঞ্চল দখল করতে চাইছিলেন। সেলজুক সম্রাজ্য বা সালতানাত একই সাথে দুটি বড় যুদ্ধ করতে সক্ষম ছিলো না। তাই সুলতান আল্প আরসালান রোমানোসকে বার্তা পাঠান যে, সেলজুকরা আনাতোলিয়ায় রোমানদের অধিকারের স্বীকৃতি দেবে এবং আনাতোলিয়ায় হামলাও বন্ধ করবে। সাথে সাথে রোমানদেরও সেলজুক সালতানাতে অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। কিন্তু বাইজেন্টিন সম্রাট রোমানোস সন্ধি প্রস্তাব মানলেন না। রোমানোস সেলজুক সালতানাতের দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন। রোমানোস তাঁর সৈন্যসহ লেক ভানের সামনে এসে উপস্থিত হলো। সুলতান আল্প আরসালানও বাধ্য হয়ে যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য ইরানে ফিরে আসেন।

সুলতান আল্প আরসালান যুদ্ধের জন্য ৩০ হাজার সৈন্য প্রস্তুত করলেন। যাদের মধ্যে দক্ষ অশ্বারোহী এবং তীরন্দাজ ছিলো। ১০৭১ সালে বাইজেন্টিন সম্রাজ্যের সম্রাট সেলজুক সুলতান আল্প আরসালান এর সাথে যুদ্ধ করতে লেক ভান এর তীরে পৌঁছান। সুলতান আল্প আরসালান লম্বা পথে লেক ভান পৌঁছান এবং পিছন থেকে রোমানদের ওপর হামলা করেন। এই হামলায় রোমানদের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হলো। রোমানদের সাথে যুদ্ধ করতে আসা তুর্কী সৈন্যরাও সেলজুকদের সাথে যোগদান করলো। যা রোমানদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়। যখন সুলতান আল্প আরসালানের সৈন্যদের সাথে রোমানদের যুদ্ধ শুরু হলো তখন গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে, রোমানোস মারা গেছে। এই গুজব ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে রোমান সৈন্যরা পালিয়ে যেতে লাগলো। বাইজেন্টিন বা রোমানরা যারা বিশাল সৈন্যদল নিয়ে যুদ্ধে এসেছিলো তারা মাত্র ২৪ ঘন্টায় যু্দ্ধ হেরে গেল। কিন্তু তারপর যা হলো তার কাছে যুদ্ধের পরাজয় কিছুই নয়। এক সাধারণ সেলজুক সিপাহী সুলতান আল্প আরসালানের সামনে এক রোমানকে উপস্থিত করেন। আহত ও ধূলোবালি যুক্ত সেই রোমানকে দেখে সুলতান আল্প আরসালান জিজ্ঞেস করলেন কে এই ব্যক্তি? সেলজুক সিপাহী বললো জাঁহাপনা এই ব্যক্তি বাইজেন্টিন সম্রাট রোমানোস। সুলতান আল্প আরসালান বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে, বাইজেন্টিন সম্রাট তার পায়ের নিচে পড়ে রয়েছে। সুলতান আল্প আরসালান রোমানোস এর বুকে পা রাখলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন – রোমানোস আমি যদি তোমার সামনে এভাবে উপস্থিত হতাম তাহলে তুমি কী করতে? রোমানোস বললো – আমি তোমাকে হত্যা করতাম কিংবা তোমাকে শিকল দিয়ে বেঁধে কনস্ট্যান্টিনোপল এর বাজারে ঘুরাতাম। সুলতান আল্প আরসালান বললেন – এই তোমার প্রতিশোধের নমুনা। তুমি তো জানো না মুসলিমদের প্রতিশোধ কেমন? মুসলিমদের প্রতিশোধ হয়ে থাকে সবচেয়ে উত্তম। আমি প্রতিশোধ হিসেবে তোমাকে মাফ করে দিলাম। তারপর আল্প আরসালান রোমানোস এর সাথে খুবই উত্তম ব্যবহার করেন। রোমানোসকে উত্তম পোশাক ও খাবার দেওয়া হলো। সুলতান আল্প আরসালান রোমানোসের সাথে একটি চুক্তি করেন। সেই চুক্তি অনুসারে আনাতোলিয়ার অনেক অংশ সেলজুক সালতানাতের অংশ হয়।
রোমানোস ১৫ লক্ষ স্বর্নমুদ্রা দেন যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে। এছাড়াও প্রতি বছর রাজস্ব এবং রোমানোস তাঁর মেয়ের বিয়ে সুলতান আল্প আরসালানের ছেলের সাথে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর রোমানোসকে মুক্তি দেওয়া হয়। রোমানোস মুক্তি পাওয়ার পর কনস্ট্যান্টিনোপল পৌঁছানোর আগেই বাইজেন্টিন সৈন্যরা রোমানোসকে গ্রেফতার করলো। কারণ তখন রোমানোসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো বাইজেন্টিন সম্রাজ্যে এবং নতুন বাইজেন্টিন সম্রাট সপ্তম মিকাইল ডুউকাস ক্ষমতাও গ্রহণ করেছিলো। রোমানোসকে বন্দী করা হয়। তাঁর চোখ উপড়ে ফেলা হয় এবং কারাগারে রোমানোস খুব কষ্টদায়কভাবে মারা যায়। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত কখনো আনাতোলিয়া খ্রিস্টানদের দখলে যায় নি। খ্রিস্টানরা আনাতোলিয়া দখলের জন্য অনেক চেষ্টা করলেও বার বার ব্যর্থ হয়। ইতিহাসে তারপর আনাতোলিয়া খুব বিখ্যাত হয়ে যায় কারণ এখানেই ছিলো সেই তুর্কী যাযাবর সম্প্রদায় যারা নিজেদের গবাদিপশু বিভিন্ন জায়গায় লালন পালন ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। যাদের আজ ইতিহাস ওসমানী তুর্কী বলে জানে। এই তুর্কী যাযাবররা আনাতোলিয়ায় কোথায় থাকতো, শুরুতে তাদের ধর্ম কী ছিলো? এসব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায় না। কারণ ওসমানী তুর্কীদের ইতিহাস ওসমানী সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পর লেখা শুরু হয়েছিলো। যেগুলোর মধ্যে অনেক মিথ্যাও থাকতে পারে। অন্যান্য তুর্কী যাযাবরদের মতো এরাও আনাতোলিয়ার সবুজ শ্যামল ভূমিতে বসবাস করতে লাগলো। এরা ছিলো তুখোড় যোদ্ধা জাতি। সেলজুক সালতানাতের ওপর যে কোন হামলা সর্বপ্রথম এরাই মোকাবেলা করতো। এরা সেলজুক সম্রাজ্যের ঢাল হিসেবে কাজ করতো। কিন্তু সেলজুকদের জন্য আসল হুমকি বাইজেন্টিনরা ছিলো না। বরং সেলজুকদের জন্য আসল হুমকি ছিলো পূর্বের মোঙ্গলরা।

মোঙ্গলদের বাদশাহ চেঙ্গিস খান মসৃণ কাপড় খুব পছন্দ করতেন এবং এই কাপড় তৈরি হতো তৎকালীন মুসলিম সম্রাজ্যগুলোতে। তো চেঙ্গিস খান কয়েকজন কাপড় ব্যবসায়ীকে সুলতান খোয়ারেজম শাহের কাছে পাঠালো। যারা চেঙ্গিস খানের জন্য কাপড় সংগ্রহ করতে এসেছিলো। খোয়ারেজম শাহ তাদের ভিন দেশী গুপ্তচর মনে করে হত্যা করলেন। চেঙ্গিস খান এই খবর পেয়ে প্রচন্ড রাগান্বিত হন এবং এই ব্যাপারে সঠিক তথ্য জানার জন্য খোয়ারেজম শাহের দরবারে একজন দূতও পাঠান। দূতকেও খোয়ারেজম শাহের নির্দেশে হত্যা করা হয়। দূতকে হত্যার খবর পেয়ে চেঙ্গিস খান মুসলিম সম্রাজ্যগুলোর ওপর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের মতো হামলা করে মুসলিম সম্রাজ্যগুলোকে ধংসস্তুপে পরিণত করেন। বাগদাদ নগরীকে এমনভাবে ধংস করেন যে, বাগদাদ নগরীকে দেখে মনে হতো এ যেন কোন সভ্যতার ধংসপ্রাপ্ত অঞ্চল। মোঙ্গলরা আনাতোলিয়া পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। সেলজুক সম্রাজ্যও ছোট থেকে ছোট হয়ে গেল। আনাতোলিয়ায় রয়ে গেল একটি সেলজুক সম্রাজ্য যাকে বলা হতো Seljuk Sultanete of Rum। মূলত এটি ছিলো কয়েকটি ছোট ছোট রাজ্য দ্বারা গঠিত এক সম্রাজ্য। যেখানে সুলতান আল্প আরসালানের বংশধরেরা রাজত্ব করতো। তো এই ছোট সেলজুক সালতানাত এবং বাইজেন্টিন সম্রাজ্যের সীমান্তে সেই তুর্কী যাযাবর সম্প্রদায় তাদের সর্দার ওসমান বের নেতৃত্বে সংগঠিত হচ্ছিলো। ওসমান কোথায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তাঁর বাল্যকাল কীভাবে কেটে ছিলো তা সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। ওসমানের নাম সত্যিই কী ওসমান ছিলো কি না এ নিয়েও মতভেদ আছে। না কী ওসমানের উথমান উথ্থামান ছিলো। কারণ আরবী উসমান নাম তাঁকে অনেক পরে দেওয়া হয়েছিলো। ওসমান অনেক সাহসী এবং দক্ষ যোদ্ধা ছিলেন। তাঁর সৈন্যরাও অনেক দক্ষ ছিলো। ওসমানের সৈন্যরা এতটাই দক্ষ ছিলো যে, তারা ঘোড়ার লাগাম না ধরেই পিছন ফিরে নিশানায় তীর ছুঁড়তে পারতো। ওসমান তাঁর সৈন্যদের সাথে খুব মিলেমিশে থাকতো।

ওসমানের এই স্বভাবের কারণেই ওসমান ছিলো তাঁর সৈন্যদের নিকট খুব প্রিয়। ওসমানের সৈন্যরা ওসমানের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত থাকতো। ওসমান অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ বড় একটি সৈন্যদল তৈরি করলো। এছাড়াও বাকী তুর্কী সর্দারদেরও ওসমান নিজের সাথে মিলিয়ে নেয়। এর ফলে ওসমান বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠে এবং মোঙ্গলদের মাঝারি আকারের সৈন্যদলও ওসমানের সাথে যুদ্ধ করতে ভয় পেত। ওসমান বাইজেন্টিনদের ওপর হামলা করে কিছু এলাকা দখল করতে চাইছিলো যাতে ওসমান নিজের একটি সম্রাজ্য তৈরি করতে পারে। কিন্তু এখানে একটি বাঁধা ছিলো।
সেটি ছিলো River Sakarya। এই নদীর ওপারে ছিলো বাইজেন্টিন সম্রাজ্য। বাইজেন্টিন সম্রাজ্য নদীর ওপারে অনেক মজবুত দূর্গ নিমার্ণ করে রেখেছিলো। ওসমানের সৈন্যরা বাইজেন্টিন সীমান্তে হামলা করলে দুর্গ থেকে তীরন্দাজরা তীর নিক্ষেপ করতে থাকতো। ফলে ওসমানের সৈন্যরা অগ্রসর হতে পারতো না। তারপর এক অলৌকিক ঘটনা ঘটলো ১৩০২ সালে River Sakarya তার গতিপথ পরিবর্তন করে ফেললো। এর ফলে বাইজেন্টিনদের দুর্গগুলো নদী গর্ভে বিলিন হয়ে যেতে লাগলো। এই সুযোগে ওসমান নদী পার হলো এবং হামলা করলেন। বাইজেন্টিনরা যখন ওসমানের হামলার খবর পেল তখন তারা একটি সৈন্যদল প্রেরণ করলো। ওসমান তখন বাইজেন্টিনদের মোকাবেলায় এমন যুদ্ধ কৌশল ব্যবহার করলো যা সে মোঙ্গলদের কাছ থেকে শিখেছিলো এবং পরে তা ওসমানীয়দের যুদ্ধ করার রীতি হয়ে যায়। প্রথমে ওসমান একটি ছোট সেনা দল বাইজেন্টিনদের সামনে পাঠালো। এই সেনাদল বাইজেন্টিনদের সামনে এসে পিছু হটতে লাগলো। ওসমানের সেনাদলকে ধাওয়া করতে শুরু করে বাইজেন্টিন সেনা দল। ওসমানী সেনাদল বাইজেন্টিনদের বোকা বানিয়ে তাদেরকে ওসমানীয়দের ঘেরার ভিতর নিয়ে এলো। ওসমান বাইজেন্টিনিরা ভেতর প্রবেশ করা মাত্রই দু দিকে প্রচন্ড হামলা করেন। বাইজেন্টিনরা পরাজিত হলো ওসমানীয়দের হাতে। তারপর ওসমান বাইজেন্টিনদের বেশ কিছু বড় শহর ও দুর্গ দখল করে নেন। বড় শহরগুলোর মধ্যে Yeni শহরও ছিলো। যেই শহরকে ওসমান তার রাজধানী করেন। অসাধারণ বিজয়ের ফলে ওসমানী তুর্কীদের ত্রাণকর্তা হয়ে উঠে এবং অনেক তুর্কী যাযাবর গোষ্ঠী ওসমানের সম্রাজ্যে বসবাস করে ও তাঁর আনুগত্য করতে থাকে। ওসমানের সেনাবাহিনী বড় হতে থাকে। কিন্তু তাও তা বাইজেন্টিনদের সেনাবাহিনী থেকে অনেক ছোট ছিলো।

ওসমানের এসব দুঃসাহসী কাজের জন্য ওসমানের শত্রু বাড়ছিলো। একবার ওসমানের একমাত্র চাচা ওসমানকে বাইজেন্টিন সম্রাজ্যে হামলা করতে নিষেধ করেন। এর ফলে ওসমান তার চাচার ওপর এত অখুশী হলো যে, ওসমান তাঁর চাচাকে হত্যা করলো। কিন্তু সব ব্যাপারে ওসমান একজনের পরামর্শ নিতেন। যার নাম শাইখ আদবালি (Sheikh Edebali)। ওসমান শাইখ আদবালিকে তার পথপ্রদর্শক মনে করতো। শাইখ আদবালির মেয়েক ওসমান বিয়ে করতে চাচ্ছিলো। একদিন ওসমান স্বপ্ন দেখলো যে, শাইখ আদবালির শরীর থেকে একটি চাঁদ বের হয়ে ওসমানের হৃদয়ে ঢুকে যায়। তারপর ওসমানের হৃদয় থেকে একটি বড় গাছ বের হয়। যার মূল গুলো পূর্ব এবং পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ে। গাছের মূলগুলো থেকে ৪ টি বড় নদী প্রবাহিত থাকে এবং ৪ টি বড় পাহাড় গাছের মূলগুলোকে রক্ষা করতে থাকে। তারপর বাতাস বইতে থাকে। বাতাসে গাছের পাতাগুলো উড়ে থাকে একটি সুন্দর এক শহরের দিকে। যেখানে দুটি সাগর এবং দুটি মহাদেশ মিলিত হয়। সেই শহর একটিআংটির মতো ছিলো। ওসমান সেই আংটি পরতে চাচ্ছিলো। তখন ওসমানের স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল। ওসমান এই স্বপ্ন শাইখ আদবালিকে খুলে বলেন। শাইখ আদবালি বলেন – “অভিনন্দন, আল্লাহ তোমাকে এক বৃহৎ সম্রাজ্য দান করবেন এবং তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করবে।” ইতিহাস সাক্ষী ওসমানের এই স্বপ্ন সত্য হয়েছিলো। আর স্বপ্ন সত্যি হওয়া শুরু হয়েছিলো শাইখ আদবালির মেয়ে রাবেয়ার সাথে ওসমানের বিয়ের মাধ্যমে। স্বপ্নের ব্যাখা এবং দূর্বল হতে থাকা বাইজেন্টিন সম্রাজ্য ওসমানের মনোবল বাড়াতে থাকে। ১৩১৭ সালে ওসমান বাইজেন্টিনদের গুরুত্বপূর্ণ শহর বুরসা অবরোধ করেন। এই অবরোধ ১০ বছর যাবৎ চললো। শেষে বুরসার গভর্নর ওসমানীয়দের কাছে আত্ন সমর্পন করে।

১৩২৬ সালে ওসমান মৃত্যু শয্যায় ছিলেন তখন ওসমানের ছেলে ওরহান তাঁর বাবাকে বুরসা বিজয়ের সংবাদ দিলো। ওসমান বিজয়ের খবর শুনে খুব খুশি হলো এবং ওরহানকে তার উত্তরসূরি ঘোষণা করেন। আর ওসিয়ত করেন যেন তাঁকে বুরসায় সমাধিস্থ করা হয়। বুরসায় আজও ওসমান গাজীর কবর বুরসায় আছে। ওরহান তাঁর ইচ্ছেমত বুরসাকে নতুন রাজধানী করেন। তখন ওসমানীয়দের হাতে এত অঞ্চল ছিলো যাকে সালতানাত বলা যায়। তাই ওসমানের রাজ্যকে ওসমানীয় সালতানাত বা অটোমান সম্রাজ্য নাম দেওয়া হয়। ওরহান সুলতান উপাধি ধারণ করেন। ওরহানই হয়ে উঠেন ওসমানীয় সালতানাতের প্রথম সুলতান।
ওসামানীয় সালতানাত তখন নতুন এক সালতানাত যার পূর্বে বাইজেন্টিন সম্রাজ্য এবং পশ্চিমে তুর্কী মুসলিম সম্রাজ্য কিরাছী (Karasi)। এই দুটি সম্রাজ্য নবগঠিত সম্রাজ্য ওসমানীয় সালতানাতের ওপর হামলা করতে পারতো। এই জন্য ওসমানী সুলতান চিন্তিত থাকতেন। তারপর আল্লাহ তা’লার ইচ্ছায় ওরহান এমন এক সুযোগ পান যা কোন রাজা হয়তো কোন শতাব্দীতে একবার পায়। তারপর এমন কী হলো যার ফলে ছোট ওসমানী সালতানাত বাইজেন্টিনদের পূর্ব এবং পশ্চিম পাশে পৌঁছে গেল। এমন কী হলো যার ফলে ওসমানীয় সালতানাতের আয়তন বহুগুণ বেড়ে গেল একজন সুলতানের শাসনামলে।
(চলবে)

তথ্যসূত্রঃ The Ottoman Empire – DSJ
DSJ Maps
TRT World
A History of Ottoman Empire by
Ottoman Empire by Douglas A
Howard
Between Two Worlds The
Construction Ottoman State by
Camel Kafadar
History Of The Ottoman Empire And
Modern Turkey by Stanford Shaw

লেখিকাঃ প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্ক।

আরও পড়ুন