২০২১ হবে ইতিহাসের ঘোমটা উন্মোচনের বছর

জিয়াউল হক

লন্ডন থেকে প্রায় ২৯২ মাইল উত্তর পূর্বে স্কটল্যন্ডের সীমান্ত ঘেঁষে ইংল্যন্ডের বিখ্যাত নৌবন্দর ও ঐতিহাসিক শহর সাউথশিল্ডস। ইংল্যান্ডের ইতিহাসে, পুরো ইংরেজ জাতির ইতিহাসে এ শহরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই প্রাচিন কাল থেকেই সামরিক দিক বিচারে এই শহরটি পুরো ইংলিশ ও স্কটিশ জাতির জীবনে এক বিরাট ঘটনাবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করে এসেছে।

আটলান্টিকের সাথে সংযোগ স্থাপনকারী উত্তর মহাসাগরের সাথে টাইন নদীর (River Tyne) মিলনস্থলেই এ শহরটির অবস্থান। সাউথ শিল্ডস ঐতিহাসিক একটা শহর এ কারণে যে, এখানে প্রাগৈতিহাসিক কাল, প্রস্তর যুগ ও তাম্রযুগের মানববসতির চিহ্ন ছাড়াও এ নদীবন্দরটি প্রাচীন যুগ থেকেই নৌ বাণ্যিজের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছে।

তা ছাড়া ভৌগলিক অবস্থানগত কারণেও এলাকাটির অপরিসিম গুরুত্ব রয়েছে প্রাচীনকাল থেকেই। সমুদ্রগামী বড়ো বড়ো নৌযান নির্মাণের ক্ষেত্রেও এক কালে এ শহরটির সূনাম ছিল। ইউরোপের রাজ রাজড়াদের জন্য যেমন বড় বড় নৌযান তৈরি করা হতো, তেমনই ক্রুসেড যুদ্ধ চলাকালীন প্রায় আড়াইশত বৎসর সময়কালে এখান থেকেই ক্রুসেডারদের জন্য বিশাল বিশাল যুদ্ধজাহাজ তৈরি করা হতো।

আর ক্রুসেডকালীন সময়ে সাউথ শিল্ডস থেকে বড় বড় যুদ্ধ জাহাজ ভরে সৈন্য ও রসদ ভরে ক্রুসেডাররা মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতো।
কিন্তু তারও আগে ইসলাম পূর্ব সেই রোমান যুগেও এখানে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা খুবই চিত্তাকর্ষক এবং আমাদের গবেষণার জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়। ১৬০ খৃষ্টাব্দে এই টাইন নদীর কুল ঘেঁষে রোমানরা একটা দূর্গ ও সেনানিবাস নির্মাণ করে। রোমান সম্রাট হেড্রিয়ান ইংল্যন্ড ও স্কটল্যান্ডের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিয়াত্তর বা চুয়াত্তর মাইল দীর্ঘ যে বিশাল প্রাচীর নির্মাণ করেন, যা ইতিহাসে আজও ‘হেড্রিয়ান ওয়াল’ (Hadrian Wall) হিসেবে, তার প্রতি সোয়া এক মাইল পর পর তিনি সেনাচৌকি বা পর্যবেক্ষণ টাওয়ারও বসান। এর প্রতিটিতে রোমান সৈন্যরা পাহারায় নিয়োজিত ছিল।
এই বিশাল প্রাচীর আর সোয়া এক মাইল দূরত্ব পর পর সেনাছাউনি নির্মাণসহ অবস্থানরত সৈন্যদের সময়মত পর্যাপ্ত রসদ সরবরাহ ছিল এক দুরুহ কাজ। এই দুরুহ কাজটিই সুচারুরুপে আঞ্জাম দেবার জন্যই রোমান সরকার টাইন নদীর উপকুলে সামরিক দিক বিচারে অত্যন্ত কৌশলগত পয়েন্টে একটি দূর্গ নির্মাণ করে। এই দূর্গটির ধংসাবশেষ আজও উত্তর পূর্ব ইংল্যান্ডের সাউথ শিল্ডস শহরে রয়েছে।

ইংল্যন্ডের প্রত্নতাত্তিক বিভাগ ১৮৭০ সাল থেকে এখানে খননকার্য পরিচালনা করে আসছে, যা এখনও শেষ হয়নি। খনন কার্যের মাধ্যমে ঐতিহাসিক এ দূর্গটি উদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণের সাথে সাথে সরকার এখানে একটা মিউজিয়ামও প্রতিষ্ঠা করেছে। ইংল্যান্ডের প্রত্নতাত্তিক বিভাগে এর সরকারি পরিচিতি হলো ‘Arbeia Roman Fort and Museum’ নামে।
দূর্গটির পরিচিতি তুলে ধরতে গিয়ে যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে, তার প্রথম ক’টি লাইন হলো এরকম;
Wellcome to Arbeia
Arbeia Roman Forte was built around AD 160 but continued to be in development over the next 150 years as its purpose and function changed. It overlooked the mouth of the river Tyne and guarded the entrance to the northern frontier of the Roman Empire.
It later became the military supply base for soldiers stationed in the 17 forts along Hadrian’s Wall. Today Arbiea is a living, breathing Archaeological site providing a unique insight into life during the Roman Occupation.

এই যে ‘Arbeia’ শব্দটি, এটাই আমার সকল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। আমার যুক্তি ও দাবী হলো, শব্দটি আর কিছুই নয়; ‘Arabia’ বা ‘Arab থেকেই উদ্ভূত। ১২০ খৃষ্টাব্দে নির্মিত এই সেনাদূর্গে রোমান সরকার রোমান সৈন্যদের একটা প্লাটুন মোতায়েন করে।
এই রোমান সৈন্যরা কেউই রোমের নাগরিক ছিল না, ছিল রোমের হাতে যুদ্ধবন্দী। তারা ছিল বাগদাদের দজলা নদী সংলগ্ন এলাকায় বসবাসরত আরব জনগোষ্ঠী। এদের দাস হিসেবে ধরে আনা হয়েছিল। এদের কেউই আর নিজ দেশে ফেরত যেতে পারেন নি। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন হযরত ইসা আ: এর উম্মত; মুসলমান।

এরা এখানে বাস করেছেন, এখানেই মৃত্যুবরণ করেছেন। স্থানীয় ভাষা, কৃুষ্টি, লোকগাঁথা, প্রবচণ এসবের কোন না কোন কিছুুতে তাদের স্মৃতিচিহ্ন আছে। বিগত ২০০৭ সাল থেকে খুঁজে ফিরছি। ২০০৯ সালে সর্বপ্রথম একজনের নাম ও কর্মকান্ড জানতে পারি।
তিনি অবশ্য দজলাতীরের কেউ নন, এসেছিলেন সিরিয়া থেকে, তিনিও একজন আরব। এলাকার এক কুমারী দাসীর প্রেমে পড়েছিলেন। বিয়েও করেছিলেন। উক্ত দাসীকে বিয়ে করতে গিয়ে সম্ভবত নিজের বাপ-দাদার ধর্মও বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাদের শেষ সমাধির সন্ধান পেয়েছি ২০১২ সালে।
এদের প্রেম কাহিনী ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। সাথে সাথে জড়িয়ে রয়েছে আমার ধর্ম ও সংস্কৃতি ইসলামের ইতিহাসও। আমার আগ্রহ হলো ইসলামের এই ইতিহাস; ‘ইংল্যান্ডে ইসলামের ইতিহাসে’র দিকেই।
এই ইতিহাস তুলে আনতে হবে, তথ্য প্রমাণ’সহ। ইসলামের ইতিহাসকে ঢেঁকে রাখতে ইংলিশ ইতিহাসের মুখে টানানো ঘোমটা উন্মোচন করতেই হবে। ইনশাআল্লাহ ২০২১ হবে সেই ঘোমটা উন্মোচনের বছরচ ।

লেখকঃ ইংল্যান্ডের বেসরকারি মানসিক হাসাপাতালের প্রাক্তন পরিচালক ও লেখক

আরও পড়ুন