ব্যালেস্টিক মিসাইল এর জনক মহিশূরের বাঘ টিপু সুলতান (রহ.)

জি.মোস্তফা

টিপু সুলতান জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ১৭৫০ সালের ২০ নভেম্বর। তার প্রকৃত নাম ফতেহ আলী খান। তার পিতা ছিলেন হায়দার আলী খান, মাতা ছিলেন ফকির উন নেসা।টিপু সুলতানের ৪ জন স্ত্রী, ১৫ জন পুত্র এবং কমপক্ষে ৮ জন কন্যা সন্তান ছিলো। কন্যাদের পরিচিতি অজানাই রয়ে যায়। তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। ইসলামের বিধি বিধান পালনে ছিলেন একনিষ্ঠ। রাজ্যের মসজিদগুলো তিনি বিশেষভাবে তত্ত্বাবধান করতেন।তিনি সকল শ্রেণির প্রজাদেরকে ভালোবাসতেন।তাদেরকে তিনি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতেন।

তিনি ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা,সমর কুশলী ও বিজ্ঞানী। তাকে মহিশূরের বাঘ নামে অভিহিত করা হয়।ছোটবেলা থেকেই টিপু, বাঘের গল্প শুনতে ভালোবাসতেন। বাবাই তাকে বাঘের গল্প শোনাতেন। কিশোর বয়সে টিপু সুলতান বাঘ পুষতে শুরু করেন। বাঘ নিয়ে তার ব্যঘ্রতার শেষ ছিলো না। বাবার মৃত্যুর পর তিনি যখন সিংহাসনে আরোহণ করলেন, তখন বাবার পুরনো সিংহাসনটি তিনি ঠিক পছন্দ করলেন না। তাই তিনি তৎকালিন শ্রেষ্ঠ কারিগর দিয়ে কাঠের ফ্রেমের উপর সোনার পাত বসিয়ে তার উপর মণিমুক্তো ও রত্নখচিত একটি সিংহাসন বানিয়ে নিলেন, যাকে বরং “ব্যাঘ্রাসন”ই (Tiger throne) বলা যায়। কারণ আট কোণবিশিষ্ট ঐ আসনটির ঠিক মাঝখানে ছিলো একটি বাঘের তসবির। ৮ ফুট চওড়া আসনটির রেলিংয়ের মাথায় বসানো ছিলো সম্পূর্ণ স্বর্ণে তৈরি দশটি বাঘের মাথা, আর উপরে উঠার জন্য ছিলো দুধারে, রূপার তৈরি সিঁড়ি। আর পুরো ব্যাঘ্রাসনটাই ছিলো বাঘের শরীরের মতো ডোরাকাটা।

টিপু সুলতানের রাজ্যের প্রতীক ছিলো বাঘ। এই বাঘ ছিলো তাঁর অনুপ্রেরণার মতো। তিনি সিংহাসনে বসে মাঝে মাঝেই বলতেন:

“ভেড়া বা শিয়ালের মতো দু’শো বছর বাঁচার চেয়ে বাঘের মতো দু’দিন বেঁচে থাকাও উত্তম”

তার সমস্ত পরিধেয় পোশাক ছিলো হলুদ-কালো রঙে ছাপানো আর বাঘের শরীরের মতো ডোরাকাটা। তিনি যে তলোয়ার ব্যবহার করতেন, তার গায়েও ছিলো ডোরা দাগ এবং হাতলে ছিলো খোদাই করা বাঘের মূর্তি। তার ব্যবহৃত রুমালও ছিলো বাঘের মতো ডোরাকাটা। তার রাজ্যের সমস্ত সৈনিকের পোশাকে থাকতো বাঘের ছবি। সৈন্যদের ব্যবহার্য তলোয়ার, বল্লম, বন্দুকগুলোর নল, কুদো, হ্যামারেও আঁকা থাকতো বিভিন্ন আকারের বাঘের প্রতিরূপ কিংবা মূর্তি। এমনকি তিনি তার রাজ্যের প্রধান প্রধান সড়কের পাশে, বাড়ির মালিকদেরকে বাড়ির দেয়ালে বাঘের ছবি আঁকার নির্দেশ জারি করেছিলেন। তখনও তার বাঘ পোষার বাতিক যায়নি এবং রাজবাড়িতে বেশ কয়েকটি পোষা বাঘ ছিলো। তার কয়েকটি আবার তার ঘরের দরজার সামনে বাঁধা থাকতো।

টিপু সুলতানের উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন পণ্ডিত পুরণাইয়া।টিপু সুলতান সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন সরদার গাজী খান এর কাছ থেকে।টিপু সুলতান ছিলেন বহুভাষায় পারদর্শী।টিপু সুলতান যুদ্ধবিদ্যায় অসম্ভব পারদর্শী ছিলেন। তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিখুত যুদ্ধ পরিকল্পনা তৈরি করতে পারতেন, যা বর্তমান সময়ে চিন্তা করা অসম্ভব। তিনি তাঁর শৌর্যবীর্যের কারণে শের-ই-মহিশূর (মহিশূরের বাঘ) নামে পরিচিত ছিলেন।টিপু সুলতান পরবর্তী জীবনে তার নামের প্রমাণ রেখেছেন তার কাজের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন বাঘের মতো সাহসী, ক্ষিপ্র এবং তেজী। এছাড়া বাঘের প্রতি তার ছিলো অনেক ভালোবাসা।

১৭৬৭ সালে মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে মহিশুরের প্রথম যুদ্ধে সাত হাজার সৈন্যের এক বাহিনীর নেতৃত্ব দেন এবং বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শন করে ইংরেজদের পরাস্ত করেন। টিপু সুলতানের পুরো জীবনটাই জিহাদ তথা যুদ্ধ; যুদ্ধের মাঝে জন্ম, বেড়ে উঠা, যুদ্ধেই মৃত্যু।তার পিতা হায়দার আলী খানেরও সারা জীবন কেটেছে যুদ্ধে। টিপু সুলতান যতো দিন বেঁচে ছিলেন ততো দিন ইংরেজদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছেন, দেশের স্বাধীনতা আগলে রেখেছেন।

টিপু সুলতান সর্বপ্রথম জ্বালানি সমৃদ্ধ রকেট বা মিসাইল প্রযু্ক্তি ব্যবহার করেন। তিনি জ্বালানি সমৃদ্ধ কোনো ধাতব বস্তুকে ত্বরণ প্রয়োগে মধ্যাকর্ষণ শক্তির বিপরীতে ঊর্ধ্বে নিক্ষেপ করে সর্বাধিক অনুমিত নির্দিষ্ট দূরত্বে পাঠাতে সক্ষম হন। অর্থাৎ লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হন।

কর্ণাটকের এক দুর্গের তলা থেকে উদ্ধার হয় কিছু যুদ্ধাস্ত্র। অন্তত হাজার খানেক অস্ত্র বেরিয়ে এসেছিল মাটির তলা থেকে। যেগুলি অষ্টাদশ শতকের কোনও যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। তবে যেমন-তেমন অস্ত্র নয়, সেগুলি আসলে লোহার মোড়কে থাকা মিসাইল। আর এসব অস্ত্র টিপু সুলতানের আমলের। ভারতের অত্যাধুনিক যুদ্ধকৌশলের পথপ্রদর্শক ছিলেন তিনি।

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সেই মিসাইল রকেট ছুঁড়ে দিতেন টিপু সুলতান ও মাইসোরের আর্মি। যে ফর্মুলা আজ ব্যবহৃত হয় আধুনিক অস্ত্রে। আধুনিক অস্ত্র প্রযুক্তিতে টিপু সুলতানের সেই অবদান মনে রেখেছে খাস আমেরিকাও। তাই নাসার একটি অফিসের দেওয়ালে শোভা পায় টিপু সুলতানের সেই ছবি।

নাসার দেওয়ালে ভারতের এই সুলতানের ছবির কথা উল্লেখ করেছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি তথা বিশিষ্ট বিজ্ঞানী আব্দুল কালাম আজাদ। এক বিশেষ ট্রেনিং প্রোগ্রামের জন্য তিনি গিয়েছিলেন নাসায়।সব শেষে তিনি যান ইস্ট কোস্ট, ভার্জিনিয়ার ওয়ালপ আইল্যান্ডে। সেখানে রয়েছে নাসার ‘ওয়ালপ ফ্লাইট ফেসিলিটি’। এই সেন্টারেই হয় নাসার সাউন্ডিং রকেট প্রোগ্রাম।

নাসার ওই সেন্টারের দেওয়ালে একটি ছবি চোখে পড়ে তাঁর। একটি আঁকা ছবি। যেখানে কয়েকজন সেনা রকেট লঞ্চ করছে। কিন্তু এটা দেখেই অবাক হয়েছিলেন যে যারা রকেট লঞ্চ করছে তারা কালো চামড়ার মানুষ। বেশ কয়েকদিন ধরে ছবিটি তাঁকে আকর্ষণ করছিল। একদিন ছবিটির কাছে যান সেটি খুঁটিয়ে দেখতে। ভালভাবে দেখেন, ছবিটিতে আঁকা রয়েছে, ব্রিটিশ আর্মির সঙ্গে লড়াই করছেন টিপু সুলতান।

পিতা হায়দার আলীর মৃত্যুর পর মহিশুরের মসনদে বসেন টিপু সুলতান৷ ব্রিটিশদের সঙ্গে অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করে লড়েছিলেন তিনি বলে ইতিহাস জানায়৷ তিনিই প্রথম সুলতান, যিনি সেনাকে অত্যাধুনিক সমর কৌশল শিখিয়েছিলেন৷ অষ্টাদশ শতকেই প্রথম ব্যবহার করেছিলেন রকেট৷ এই রকেটগুলি দিয়ে প্রায় ২ কিমি দূরের লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করা যায় বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা৷ অধিকাংশ গবেষকদের মতে তার আবিস্কৃত মিসাইল ৩ কিলোমিটার দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম ছিলো।

২০০২ সালে এই বিদানুরু দুর্গেই খননের সময় ১৬০টি অব্যবহৃত মরচে পড়া রকেট পান প্রত্নতাত্ত্বিকরা। পাঁচ বছর পর তাঁরা পরীক্ষায় জানতে পারেন সেগুলি টিপু সুলতানের আমলের। এরপরই ওই এলাকায় আরও অস্ত্র মওজুদ থাকতে পারে, এই সন্দেহে খননকার্য চালাতে শুরু করে প্রত্নতাত্ত্বিক এবং শ্রমিকদের ১৫ জনের একটি দল।

খননকার্যের সময় ওই শুকনো কুয়োর মাটি থেকে গানপাউডার, পটাশিয়াম নাইট্রেট, কাঠকয়লা এবং ম্যাগনেশিয়াম পাউডারের গন্ধ পাওয়া যায়৷ তারপরেই তাঁরা নিশ্চিত হন যে সেখানে যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ১৭৮০ সালে দ্বিতীয় অ্যাংলো মহিশূর যুদ্ধের সময় এই রকেটগুলি ব্যবহার করা হয়েছিল৷ ব্রিটিশদের কাছে টিপু সুলতানের এই সমর কৌশল বড়সড় চ্যালেঞ্জ ছিল৷

তিনি ‘ফাতহুল মুজাহিদিন’ নামে একটি মিলিটারি ম্যানুয়াল (সাপ্তাহিক পত্রিকা) প্রচলন করেন; যেখানে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম জ্বালানি রকেট-এর ব্যবহারবিধি এবং একাধিক রকেট লঞ্চার কিভাবে ব্যবহার করতে হবে তা বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীতে এই প্রযুক্তিটি ব্রিটিশরা চুরি করে নিয়ে যায় এবং এই নতুন বিষয় পেয়ে ব্রিটিশরা তাদের গবেষণাগার রকেট প্রযুক্তির উপর গবেষণা শুরু করে এবং রকেট প্রযুক্তির উন্নয়ন-এর জন্য ব্যবহার করে। টিপু সুলতানের মিসাইলের দুটি নমুনা ইংল্যান্ডের Royal Aritillery Museum এ সংরক্ষিত রয়েছে।

টিপু সুলতানের প্রায় ১৫০ বছর পর মিসাইলের আধুনিকায়ন করেন জার্মান বিজ্ঞানী ওয়ানার ডন ব্রাউন।’ফাতহুল মুজাহিদিন’ নামে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকাটি তার তত্ত্ববধানে প্রকাশিত হতো এবং এতে মুসলিম মুজাহিদদের দায়িত্ব ও করণীয় সম্পর্কে উল্লেখ থাকতো।

জাওয়াহিরুল কোরআন (পবিত্র কোরআনের মুক্তামালা), যাদুল মুজাহিদীন (মুজাহিদের পাথেয়), মুফাররেহুল কুলুব (আত্মার প্রশান্তি) এসব প্রখর জ্ঞান সমৃদ্ধ কিতাবাদি টিপু সুলতানের একান্ত তত্ত্বাবধানে রচিত হয়।

টিপু সুলতান নতুন সৌর ক্যালেন্ডার-এর উদ্ভাবন করেন, নতুন মুদ্রা প্রথার প্রচলন করেন, নতুন ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার প্রচলনসহ আরো অসংখ্য জিনিস উদ্ভাবন করেন। ভারত উপমহাদেশে তিনিই সর্বপ্রথম উর্দু পত্রিকা প্রকাশ করেন।

তিনি প্রজাদের নিরাপত্তার জন্য নিজ প্রাণপ্রিয় পুত্রদের ইংরেজদের কাছে বন্ধক রাখেন। ঐ সময় তার প্রজারা অবাক হয়ে বলেছিলো- “আপনার পুত্রদের জন্য আমরা জীবন দিতে প্রস্তুত, আর আমাদের মত নগণ্য প্রজাদের জন্য আপনি পুত্রদের বন্ধক দিলেন ?”

ইংরেজরা একমাত্র টিপু সুলতান এর প্রতিরোধের কারণেই গোটা ভারত কব্জা করতে ব্যর্থ হচ্ছিলো। এই কারণে তারা তার বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। মহিশুর বাহিনীর সাথে ইংরেজ বাহিনীর ফয়সালাকারী যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৭৯৯ সালের মে মাসে। ৪ মে টিপু সুলতান শত্রু বাহিনীর মোকাবেলায় অবতীর্ণ হন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্রে তিনি পরাজয় বরণ করেন।

১৭৯৯ সালে টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর ব্রিটিশরা ঘোষণা দিয়েছিল যে, ‘এখন গোটা ভারত আমাদের’। সেসময় ব্রিটিশ সৈন্যরা শুধু সুলতানের প্রাসাদেই লুটপাট চালায়নি পাশাপাশি ওই শহরের এক লাখ অধিবাসীর ঘরেও লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করেছিল ব্রিটিশ বাহিনী।

প্রাসাদের সম্পদ দেখে অনেকেরেই চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল। শুধুমাত্র প্রাসাদ থেকেই প্রায় দেড় মিলিয়ন স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া যায়। তাছাড়া প্রাসাদ থেকে ব্রিটিশরা মুসলিম উম্মাহর অনেক সম্পদ, স্বর্ণের সিংহাসন, হীরক খচিত তলোয়ার, স্বর্ণ-রৌপ্যের বাসন, বহু মূল্যবান রত্নাদি নিয়ে যায়।

লেখকঃ কলাম লেখক 

আরও পড়ুন