যেভাবে কন্সটান্টিনেপল জয় করেন সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ (পর্ব-১)

জিয়াউল হক

এবারে তোমাদের আরও একজন জেদী ছেলের গল্প শোনাবো। ছেলেটা তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের চতুর্থ সন্তান।নামটা তোমাদের পরে বলি।আগে ঐ ছেলেটার জেদও আত্মসম্মানবোধের কথা, লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ় সংকল্প ও প্রচন্ড পরিশ্রম করার কথা বলে নেই।ছেলেটা যে রাজপরিবারে জন্ম নিয়েছে এবং তার বাবা নিজেই যে একজন সুলতান বা বাদশাহ ছিলেন, তাতো বললামই। ছোটকাল থেকেই ছেলেটা বাবা সুলতান প্রথম মুরাদ ১৪৪৪ খৃষ্টাব্দে তাকে মাত্র বারো বছর বয়সেই সিংহাসনে বসালেন।তাঁর ইচ্ছা ছিল ছেলেটা সিংহাসনে বসে রাজ্য শাসন শুরু করুক। তিনি পাশে থেকে প্রয়োজনে তাকে শলা-পরামর্শ দেবেন। এমনভেবে অনেকদিন পরে রাজ্য পরিচালনা থেকে ফুরসত পেয়ে বাবা সুলতান প্রথম মুরাদ নিরিবলি সময় কাটাতে উত্তর পশ্চিম তুরস্কের ‘বুরসা’ (Bursa ) শহরে অবসরে গেলেন, সেখানে নিরুপদ্রবে বসে আল্লাহর ইবাদাত করে সময় কাটাবেন ভেবে।

এদিকে মাত্র বারো বৎসর বয়সের একটা ছেলেকে রাজ্যের সিংহাসনে বসতে দেখে পার্শ্ববর্তি খৃষ্টান রাজ্য কন্সটান্টিনেপল, ভেনিস আর হাঙ্গেরির রাজারা সবাই যেন উঠে পড়ে লাগলো। যে কোনো মুল্যে তারা বালক এ রাজার রাজ্য তুরস্ককে দখল করে নেবে।বারো বৎসরের একটা পূঁচকে ছোকরা মাত্র, ওর কাছ থেকে রাজ্য কেড়ে নিতে আর কত সময়ই বা লাগবে!
এমনটা ভেবে তারা মরিয়া হয়ে যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করে দিল আর ছেলেটা সিংহাসন আরোহনের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ইইউরোপের (প্রধানত কন্সটান্টিনেপল ও হাঙ্গেরি) খৃষ্টবাহিনী রোমে অবস্থানরত খৃষ্টানধর্মগুরুপোপ-এর পরামর্শে কৃষ্ণসাগরের উপকূলে অবস্থিত তুর্কি শহর ঠধৎহধ আক্রমণ করে বসলো।

দেশ শাসন ও যুদ্ধ পরিচালনায় অনভিজ্ঞ ছেলেটা এসময়ে দূরে অবস্থানরত তার বাবা সুলতান প্রথম মুরাদকে দ্রুত আসতে বললে বাবা সেই দূর থেকেই তা কে পরামর্শ দিতে শুরু করলে ছেলেটা রেগে গিয়ে বাবাকে একটা ছোট্ট চিঠি লিখলো, সে লিখলো; “আপনি যদি সুলতান হয়ে থাকেন, তবে আপনি নিজে এসে আপনার রাজ্য রক্ষা করুন।আর আমি যদি সুলতান হয়ে থাকি, তবে সুলতান হিসেবে আদেশ দিচ্ছি, একজন নাগরিক হিসেবে নিজ দেশের প্রতিরক্ষায় অংশ নিন এবং শত্রুর মুখোমুখি হোন।”
মাত্র বারো বছরের ছেলের কাছ থেকে এমন একটা চিঠি বাবা আশা করেননি।তাই তিনি চিঠিটা পেয়ে দ্রুত ফিরে আসলেন এবং যুদ্ধের হাল ধরলেন, ক্রুসেডারদের মোকাবেলা করে তাদের পরাজিত করলেন।

এরপরে আভ্যন্তরীণ প্রয়োজন এবং সেইসাথে পার্শ্ববর্তি খৃষ্টানদেশগুলোর পক্ষ থেকে সামরিক আগ্রাসনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে বাবা সুলতান দ্বিতীয় মুরাদই বেশ কয়েক বৎসর দেশ পরিচালনা করতে থেকে ছেলেটাকে পাঠিয়ে দিলেন ভিন্ন এক শহরে বিখ্যাত দুই আলেমের কাছে শিক্ষার জন্য।
এরপর থেকে তুরস্কের বিখ্যাত আলেম শেখ সামসুদ্দিন আলওয়ালির কাছেই ছেলেটা লেখাপড়া করতে থাকলো। সেখানে সে কুরআন হেফজ করলো এর সাথে সাথে সে হাদিসশাস্ত্র, সাহিত্য, দর্শন ও আর্কিটেকচার শিখলো। একজন যুগশ্রেষ্ঠ আলেমের প্রত্যক্ষ ত্বত্তাবধানে থেকে ছেলেটা নিজেও মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যেই একজন জাঁদরেল আলেম হয়ে উঠলো।।

জ্ঞানার্জনে তার প্রচন্ড আগ্রহ ছিল, আর এই জ্ঞানার্জনের জন্য নিজ মাতৃভাষা তুর্কি ছাড়াও ভিন্ন ভাষায় বই পড়ার দরকার হয়ে পড়লে সে এক এক করে ছয়টি ভাষা শিখে ফেললো! মাতৃভাষা তুর্কি ছাড়াও সে আরবি, ফার্সি, গ্রিক, ল্যাটিন, হিব্রু, সার্বিয়ান ও ফ্রেঞ্চ ভাষা শিখে ফেললো।তার মেধা ও ছিল অসাধারণ!
একদিন ওস্তাদের কাছে সে প্রিয় রাসুল সা: এর একটা হাদিস শুনলো।রাসূলুল্লাহসা: একবার তাঁর সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন; “তোমরা নিশ্চিতভাবেই কন্সটান্টিনেপল জয় করবে। কি মহানই না হবে সেই দলের নেতা, আর কি চমৎকারই না হবে সেই সেনাদল!”
ওস্তাদের মুখে হাদিসটি শুনে তার মনে পড়লো নিজের পূর্বপুরুষদের কথা, তার বাবা সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের দাদা সুলতান প্রথম বায়েজিদও কন্সটান্টিনেপল জয় করার চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়েছেন। সে কথা সে নিজ বাবার মুখে যেমন শুনেছে তেমনি শুনেছে তার ওস্তাদ সহ রাজপরিবারের অনেকের মুখেই।

ছেলেটা মনেমনে প্রতিজ্ঞা করে যে, সেই হয়ে উঠবে প্রিয় রাসুল (সা এর ভবিষ্যৎ বাণীকৃত মহান সেই সৈনিক ও সেনাপতি। মাত্র উনিশ কুড়ি বসর বয়সে তার মনে এই যে প্রতিজ্ঞা বাসা বেঁধেছিল, এরপরে আর কোনো বাসনা তাকে তার লক্ষ্য থেকে টলাতে পারেনি।
এরই মধ্যে হঠাৎ করে তার পিতা সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ ইন্তেকাল করলে…।
(চলবে)

পরের পর্ব-যেভাবে কন্সটান্টিনেপল জয় করেন সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ (পর্ব-২)

লেখকঃ ইংল্যান্ডের বেসরকারি মানসিক হাসপাতালের প্রাক্তন পরিচালক ও লেখক

আরও পড়ুন