যেভাবে কন্সটান্টিনেপল জয় করেন সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ (পর্ব-২)

জিয়াউল হক

এরই মধ্যে হঠাৎ করে তার পিতা সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ ইন্তেকাল করলে ছেলেটা মাত্র একুশ বছর বয়েসে আবার দ্বিতীয় বারের মত তুরস্কের সিংহাসনে বসে। এর আগে মাত্র বারো বসরের ছেলে থাকাবস্থায় সেসিংহাসনে বসেছিল, দুই বসর সুলতান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল। তখনকার চাইতে এখন, এই একুশ বসর বয়সে সে রাজনীতি, প্রশাসন আঞ্চলিক ওআন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ধর্ম, সমাজ ও জীবন এসব বিষয়েই আরও পরিপক্ক, আরও দক্ষ হয়ে গড়ে উঠেছে। মাত্র একুশ বসর বয়সেই সে তুরস্কের সুলতান। নতুন সুলতান!

সিংহাসনে বসেই ছেলেটা তার রাজ্যেও প্রতিবাইরে রহুমকিকে চিরতরে থামিয়ে দেবার উপায় খুঁজতে থাকে। মাত্র কয়েকটি বৎসর আগে প্রতিবেশি খৃষ্টরাজ্য কন্সটান্টিনেপলের অন্যায় আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছে।তাদের পক্ষ থেকে আবারও আক্রমণের সমূহ সম্ভাবনা এখনও বিদ্যমান।বিদ্যমান এই হুমকির একটা বিহিত করতে হবে সেই সাথে সে রাজ্যের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংহত করাও একটা চৌকষ সেনা ও আধুনিক নৌ-বাহিনী গড়ে তোলার কাজে মনোনিবেশ করলো।

Orban নামে হাঙ্গেরীয় এক যুদ্ধবন্দী ছিল তুর্কি বাহিনীর কাছে। এই লোকটা উন্নত ধরনের কামান বানাতে পারদর্শী ছিল বিধায় নতুন সুলতান Orban’কে কামান বানানোর কাজে লাগিয়ে দিলেন। তিনি তুরস্কের ইউরোপীয় প্রান্তে অত্যন্ত শক্তিশালীও দূর্ভেদ্য দূর্গ বানালেন এবং সেই দূর্গসহ তার রাজ্যের উপকূল জুড়ে অন্যান্য দূর্গে কামানসহ পর্যাপ্ত সৈন্য ও রসদ মতোয়েন করলেন।
বসফরাস প্রণালীর মধ্যে দিয়েই উরোপীয় নৌজাহাজ নিজেদের ইচ্ছামত চলাচল করতো। সুলতান সেদিকেও নজর দিলেন।উক্ত নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী জাাহজের উপরে ট্যাক্স ধার্য করলেন, ভেনিসের এক বাণিজ্য জাহাজ ট্যাক্স দিতে অস্বীকার করে এবং উক্ত প্রণালী দিয়ে তাদের যাত্রা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করলে তুর্কিরা সে জাহাজে গোলা মেরে ডুবিয়ে দেয়।

যা হোক, সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সুলতান দুই লক্ষ পঁয়ষট্টি হাজার সৈন্য নিয়ে কন্সটান্টিনেপল অবরোধ করে বসলেন। সম্রাট একাদশ কন্সটান্টিন পুরো বসফরাস প্রণালী জুড়ে শক্ত নৌ অবরোধ বসালেন যেন কোনো তুর্কি জাহাজ তা ভেদে করে শহর অভিমূখে এগিয়ে আসতে না পারে। এমনকি সমুদ্রের পানির নীচ দিয়ে লোহার শক্ত শেকল টেনে নিলেন এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত।রাতের আঁধারে গোপনে তুর্কি জাহাজ সে অবরোধের চোখ ফাকি দিয়ে শহর তীর অভিমূখে যাত্রা করতে গিয়ে খৃষ্টান বাহিনীর কামানের গোলার আঘাতে পর্যুদস্থ হলো, জাহাজ ডুবে গেলো।
ও দিকে খৃষ্টান বাহিনীর সাহায্যের জন্য রোম থেকে পোপ আরও কয়েকটি জাহাজ ভর্তি করে রসদ ও অস্ত্রসহ সৈন্য পাঠালেন। এভাবে অবরোধ দীর্ঘায়িত হতে থাকলো আর অপরপক্ষে খৃষ্টান বাহিনী ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত হতে নিত্য নতুন সৈন্য ও রসদের সরবরাহ পেতে থাকলো।
তুর্কির নতুন সুলতান চিন্তায় পড়ে গেলেন।এভাবে চলতে থাকলে তার নিজের সৈন্য বাহিনী যেমন হতোদ্যম হয়ে পড়বে, তেমনি তার রসদেও টান পড়বে। আর এর পাশাপাশি শত্রুপক্ষ নিত্য নতুন রসদ ও সৈন্যের সরবরাহ পেয়ে দিনেদিনে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে পড়বে।তাই অতি দ্রুত কিছু একটা করতে হবে তাকে।তিনি পথ খুঁজতে লাগলেন, ভাবতে লাগলেন, কী করা যায়!

কন্সটান্টিনেপল শহরের ভৈৗগলিক অবস্থানটাই এমন যে, এর তিন দিকে সমুদ্র, ভু-ভাগের দিকে খৃষ্টানবাহিনীর দূর্ভেদ্য দূর্গ আর বিশাল সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে, সেই সাথে রয়েছে অত্যাধুনিক কামান। নৌপথে রয়েছে অসংখ্য যুদ্ধ জাহাজ এবং পানির নীচে দিয়ে টানা রয়েছে লোহার শেকল!
একমাত্র পথ হলো তারা তুর্কিবাহিনীর দিকে মুখ করে যেসব জাহাজ মোতায়েন করেছে, সেইসব জাহাজের পেছনে সমুদ্রের মধ্যে কোনোমতে উপস্থিত হয়ে পেছন দিক থেকে খৃস্টবাহিনীর উপরে আক্রমণ করা।

এমনটা করা গেলে সেটা হতো সবচেয়ে কার্যকর একটা পথ। কারণ ঐ একই সময়ে তারা সামনে থেকেও আক্রমণ পরিচালনা করতে পারতো।কিন্তু সমস্যা হলো, শত্রুবাহিনীর পেছনের জলসীমায় পৌছুনোর কোনো রাস্তাই তো খোলা নেই!
নতুন সুলতান খোঁজ নিয়ে দেখলেন তার নিজ রাজ্যের সীমান্তের ভেতরে উঁচু উঁচু পাহাড়ের উপর দিয়ে প্রায় ষোল কিলোমিটার বা দশ মাইল পাহাড় ডিঙ্গিয়ে সৈন্য নিয়ে যাওয়া যায় অপরপ্রান্তে, খৃষ্টানবাহিনীর পেছনে, তাদের জলসীমায়।

সৈন্য না হয় নেয়া গেলো, কিন্তু নৌকা? নৌকা কেমন করে পাহাড়ের উপর দিয়ে নেবেন তিনি? তবে কী কন্সটান্টিনেপল জয় করে প্রিয় রাসুল সা: এর ভবিষ্যৎবাণীকৃত মর্যাদাবান সেনাপতি হবার আজীবন লালিত স্বপ্নটা তার পূরণ হবে না?
এই একটা মাত্র স্বপ্ন পূরণের জন্যই তিনি প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত অপেক্ষার প্রহর গুনেছেন।আর কোনো উপায়ন্তর না দেখে তিনি সংকল্পক রলেন, যে করেই হোক ঐ দশ মাইল পাহাড়ী রাস্তার উপরে দিয়েই তিনি তার নৌকাগুলো নিয়ে গিয়ে অপর প্রান্তের জলসীমায় শত্রুবাহিনীর পেছনে আচমকা নামাবেন!
কিন্তু পাহাড়ের উপর দিয়ে নৌকাগুলো নেবেন কিভাবে? পাহাড়ের উপরে কি নৌকা চলে?সাররাত ভেবে ভেবে তিনি এক দারুণ ফন্দি আঁটলেন। তার সৈন্যদের হুকুম দিলেন পাশের জঙ্গল থেকে বড় বড় গাছের গুড়ি কেটে আনতে।

শত শত গাছের গুড়ি কেটে আনা হলে সেগুলো রেললাইনের স্লিপারের মত করে একই সমান্তরালে পাহাড়ের উপরে বিছিয়ে তার উপরে আলকাতরা, ঘী, পশুর চর্বি গলিয়ে তরল করে ঢেলে দেয়া হলো।ফলে ঐ সব গাছের গুড়ি পিচ্ছিল হয়ে গেল।
এরপরে তিনি সৈন্যদের হুকুম করলেন বড় বড় নৌকাগুলোকে সবাই মিলে ধরে ধরে পাহাড়ের উপরে শুইয়ে দেয়া ঐ সব গাছের গুড়ির উপরে তুলতে। তারা তাই করলো।এরপরে সৈন্যরা মিলে ঐ নৌকাগুলোকে পিচ্ছিল সেইসব গাছের গুড়ির উপরে দিয়ে ঠেলেঠেলে পাহাড়ের অপর প্রান্তে নিয়ে সমুদ্রের মধ্যে নামিয়ে নিল।

এভাবে ঐ এক রাতেই সত্তরটি বড় বড় নৌকা তারা পার করে নিল! ভোর হতে না হতেই সামনের দিকে মোতয়েনকৃত সৈন্যরা যখন আক্রমণ শুরু করলো, ঠিক একই সময়ে, একই সাথে পেছন দিক থেকেও এই সত্তরটি নৌকা বোঝাই সৈন্যরা যুগপৎ আক্রমণ করে বসলো।
খৃষ্টানবাহিনী তােদর সামনে থেকে আক্রমণ হবে সেটা জানতো এবং সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। কিন্তু পেছন থেকেও যে আক্রমণ হতে পারে, এটা তারা কল্পনাতেও চিন্তা করেনি।কারণ পেছন দিকের জলসীমায় তুর্কি বাহিনী ঢোকার কোনো পথই ছিল না।তারা কখনো চিন্তাও করেনি যে, মুসলিম বাহিনী পাহাড়ের উপর দিয়ে একটি দুটিন য়, সত্তরটি বড় বড় নৌকা দীর্ঘ দশ মাইল টেনে আনবে।তারা বাপকালেও শোনেনি যে, নৌকা দিয়ে দশমাইল দীর্ঘ পাহাড় ডিঙ্গানো যায়! না শুনলে কি হবে? এবারে তারা সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা নিজেদের চোখেই দেখলো।
এভাবেই ১৪৫৩ সালের ২৯শে মে মঙ্গলবার মাত্র একুশ বছর বয়সি এই মুসলিম সেনাপতি র চমৎকার যুদ্ধকৌশল ও দক্ষতা, কঠিন জেদ ও পরিশ্রম এবং অসীম মনোবল ও সাহসের কারণে কন্সটান্টিনেপলের পতন হয়।

তোমরা কি জানো নতুন সেই সুলতান তথা অত্যন্ত জেদি সেই ছেলেটার নাম কি? তিনি বিশ্ব ইতিহাসের গৌরব, এক অসীম সাহসীবীর, মুসলিম সেনাপতি সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ ফাতিহ।মাত্র উনপঞ্চাশ বছর বয়সে এই মহান বীর তুরস্কেই ইন্তেকাল করেন।
তিনি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, অসীম মনোবল ও সাহস, লক্ষ্য অর্জনে কঠোর পরিশ্রম ও মনের কোণে তীব্র জেদ থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়!

আগের পর্ব-যেভাবে কন্সটান্টিনেপল জয় করেন সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ (পর্ব-১)

লেখকঃ ইংল্যান্ডের বেসরকারি মানসিক হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ও প্রবাসী লেখক , ইংল্যান্ড 

আরও পড়ুন