রাখাইন পল্লী ও বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শন

হোসনে আরা মেঘনা

অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত পরিদর্শনের। আল্লাহর ইচ্ছেয় একদিন সে আশা পূর্ণ হলো। দক্ষিণ বঙ্গের পটুয়াখালী জেলায় অবস্থিত কুয়াকাটা সমুদ্র বন্দর। সেখান হতে আট কিলোমিটার দূরে মিশ্রিপাড়া রাখাইন পল্লী ও ঐহিহ্যবাহী বৌদ্ধ বিহার অবস্থিত।

আমরা বাগমারার শিক্ষক এবং সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার জনাব মোঃ সফিকুল ইসলাম স্যার এবং তাঁর পরিবার মিলে মোট পঁয়তাল্লিশ জন একটি বাস নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের টিমের সৎ, নিষ্ঠ, সুষ্ঠু এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ছিলেন সফিকুল স্যার। তাঁকে সহযোগিতা করছিলেন বিদেশ কুমার, আলমগীর কবীর এবং মকবুল স্যার। ভ্রমণের প্রথম দিন আমাদের নিয়ে গেলেন মিশ্রিপাড়া রাখাইন পল্লী এবং বৌদ্ধবিহার পরিদর্শনে।

সমুদ্র সৈকতের হোটেল হতে বেরিয়ে এসে চারটি অটোরিকশা রিজার্ভ করা হলো সারাদিনের জন্য। কিছু রাস্তা পেরিয়ে শুরু হলো মাটির রাস্তা। কিছু দূর যাওয়ার পর আবার পীচের রাস্তা। পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য এ রাস্তার মেরামত বা পূণনির্মাণ অতীব প্রয়োজন। যাই হোক, আমরা নির্বিঘ্নে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। প্রথমে বৌদ্ধবিহার পরিদর্শনের জন্য সবাইকে দশ টাকার টিকিট নিতে হলো। ভেতরে প্রবেশ করে মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেলো। বৌদ্ধ মন্দির হতে দুইশত ফিট উঁচু চালা আস্তে আস্তে থাকে থাকে নীচু হয়ে চলে এসেছে গেটে। ভেতরে ঢুকে দেখলাম ছত্রিশ ফুট উঁচু প্রার্থনারত বুদ্ধ দেবের ঐতিহ্যবাহী মূর্তি এবং সামনে ফুলের মডেল। এ মূর্তিটির ওজন সাঁইত্রিশ মণ যা অষ্টধাতু দ্বারা নির্মিত।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এ বৌদ্ধবিহার বেশ ভূমিকা রাখছে। জানা যায় এটি এশিয়ার বৃহৎ বুদ্ধ মূর্তি। বৌদ্ধদের ধারণা, এখানে প্রার্থনা করলে পূর্ণতা মেলে। তাই এশিয়ার বিভিন্ন দেশ হতে বৌদ্ধ ধর্মের লোকেরা এখানে প্রার্থনা করতে আসে। তারা অন্তরে বুদ্ধের এ মূর্তিকে খোদা বা খুদি ধারণ করে প্রার্থনা করে মুক্তির পথ খুঁজে।

মন্দিরের বাইরে ঐতিহাসিক মিষ্টি পানির কুয়া সংরক্ষণ করা আছে। এক পাশে দেখা যাচ্ছে একটি বট গাছের তলায় পানি রাখার মাটির পাত্র এবং চার দিকে বসার জন্য পাথরের স্থাপনা। ভেতরটা দেখা হয়ে গেলে মিশ্রিবাজার দেখতে বেরিয়ে পড়লাম।

মায়ানমার হতে আগত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐকান্তিক পরিশ্রমের ফলস্বরূপ তৈরী হয়েছে এই রাখাইন পল্লী ও মিশ্রিপাড়া বাজার। এখানকার অধিকাংশ অধিবাসীদের ঘর বাড়ি টিনের বেড়া এবং টিনের ছাউনি দিয়ে গঠিত। দু’একটা বাড়ি রয়েছে ইটের তৈরী। এদের বাড়িতে রয়েছে তাঁতশিল্পের ব্যাবস্থাপনা।

এক রাখাইন তাঁতের কাপড় ব্যবসায়ী মেয়ের কাছে জানলাম  এরা দোকানে যে কাপড়গুলো রেখেছে তার সবগুলোই নিজেদের পল্লীতে তৈরী তাঁতবস্ত্র। দোকানে দেখলাম গায়ের চাদর, বেড সীট এবং মেয়েদের থ্রী-পীচ। ছেলেদের শার্টের পীচ এবং লুঙ্গিও দেখলাম। বাজারটি বেশ বড় এবং লোক সমাগমে বেশ জমজমাট।

সমুদ্র হতে শামুক ঝিনুক সংগ্রহ করে তৈরী করেছে ঘরের শোভা বর্ধক নানা সোপিচ, মেয়েদের সাজগোজের সামগ্রী এবং শিশুদের খেলনাপাতি। অনেক দোকানে দেখলাম রাখাইন মহিলা দোকানদার। আমরা সব দোকান ঘুরে ঘুরে দেখলাম এবং টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনলাম।
ততক্ষণে সূর্য্যটা মাথার উপরে উঠে গেছে। রোদের তাপও বেশ তীর্যক। বাজার হতে বেরিয়ে এসে গেটে দেখা হলো স্থানীয় এক হিন্দু সধবা বৃদ্ধা মহিলার সাথে। নাম সোভা রানী। তার সাথে বেশ জমিয়ে গল্প করলাম কিছুক্ষণ। জানলাম তার তিনটি ছেলে আছে। ওরা সবাই এম.এ. পাস। ভারতে থাকে।

জিজ্ঞেস করলাম, “ও মাসী, আপনি কি লেখাপড়া জানেন ? ”
মুখে একরাশ হাসি নিয়ে বললো,” যার ছেলেরা এম.এ. পাস, তার লেখাপড়া না জানলে চলে?
আমিও একগাল হেসে রসিয়ে বললাম, “সেই তো, এত সুন্দর একটা মানুষ লেখাপড়া তো জানতেই হয়।”

আসার সময় খুব করে বলছিল তার বাড়িতে দর্শন দিতে। বলছিল বৌদ্ধবিহারের পেছনেই নাকি তার বাড়ি। কিন্তু আমাদের আর বেড়ানোর সময় হলো না, তাই যাওয়া হলো না। অবশেষে বললো তার দোকান দেখতে যেতে কিন্তু তাও হলো না।

রাখাইনের তাঁতপল্লী বাজারে তার একটি দোকান আছে। দোকানে লোক রাখা আছে এবং সে নিজেও তার দোকানে বসে। শেষে শোভা রানী মন খারাপ করে চলে গেলো তার দোকানে। আমরাও হোটেলের উদ্দেশ্যে গাড়িতে চেপে বসলাম।

লেখকঃ কবি, সাহিত্যিক ও শিক্ষক

আরও পড়ুন