যেভাবে বিজয় উদযাপন করেছেন আমাদের প্রিয় রাসুল (সাঃ)

।। সালমা সাহলি ।।

ইসলামে বিজয় দিন দেশ রক্ষার মর্যাদা প্রতি বছর এক অনন্য গৌরব আর উৎসব মূখর হয়ে আমাদের সম্মুখে আবির্ভূত হয় বিজয় স্মরণীয় দিন ১৬ই ডিসেম্বর। তবে এবারের এই দিনটি স্বাধীনতা বিজয়ের সূবর্ণজয়ন্তী। সাম্য, ন্যায়, এবং সুশাসন প্রত্যাশী আমাদের বাবা, দাদারা ১৯৭১ সালে যে সংগ্রাম করেছিলেন সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা মুক্তি ও বিজয় লাভ করি। এবং বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

ইসলাম মাতৃভূমির সর্বভৌমত্ব রক্ষার শুধু উৎসাহিতই করেনি বরং জোরালো তাগিদ দিয়েছে। অন্যায় অত্যাচার বন্ধ করে মানুষের জন্য সুন্দর সুশৃংখল স্বাধীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ইসলামের লক্ষ্য। কারণ পরাধীনতা শৃংখল সমাজে নির্যাতন অন্যায় অবিচার ও জুলুমের মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয়।

রাসুল (সঃ) দেশের সীমানা রক্ষী সম্পর্কে বলেছেন। “রাষ্ট্রের সীমানা পাহারা দেয়া পৃথিবী ও তার মধ্যকার সব কিছুর চেয়ে উত্তম।”

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

মৃত ব্যক্তির সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে ঐ ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে রাষ্ট্রের সীমানা প্রহরা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে। তার আমল কিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং তার কবরের প্রশ্নোত্তর থেকেও সে মুক্ত থাকবে।” তিরমিজি ও আবুদাউদ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত এই হাদিস গুলো পড়লেই অনুধাবন করা যায় স্বাধিনতা রক্ষা, দেশ প্রেম, দেশের জন্য শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের মর্যাদা কত সুউচ্চ।

দীর্ঘ প্রায় নয় মাস সংগ্রাম করে আমাদের এই বিজয় অর্জিত হলেও এ বিজয় নিঃসন্দেহে আমাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার এক বিরাট অনুগ্রহ। কেননা শুধুমাত্র অস্ত্র, রণকৌশল, কিংবা আত্মত্যাগের জোরে কখনো বিজয় অর্জন করা যায় না। আমাদের সম্মুখে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যে অনেক দেশ, জাতি দাসত্ব ও পরাধীনতার শেকলে আবদ্ধ হয়ে আছে এবং তারা স্বাধীনতার জন্য বছরের পর বছর যুদ্ধ করে যাচ্ছে, কিন্তু বিজয় সাফল্য অর্জন করতে পারছে না। তাই আমাদের প্রতি আল্লাহর তায়ালার এই দয়া ও অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা উচিৎ। উচিৎ মু’মিন মুত্তাকী হয়ে আল্লাহর বিধান মেনে ন্যায় ও সত্যের পথে চলা, যা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেক মু’মিনের জন্য অপরিহার্য। অন্যান্য বিষয়ের মতো দেশের বিজয় উদযাপন সম্পর্কেও ইসলামের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা রয়েছে।

রাসুল (সঃ) এর জন্মভূমি মক্কা বিজয় ছিল ইসলামের সবচেয়ে বড় বিজয়। যে বিজয়ের সংবাদ আল্লাহতায়ালা আগেই সূরা নাসর (বিজয়) এর মাধ্যমে তাঁকে অবহিত করে নাযিল করেন। মাত্র তিন আয়াতের এই ছোট সূরায় রাসুল (সাঃ)-কে আল্লাহ তায়ালা বিজয়ের দিনের কয়েকটি নির্দেশনা দিয়ে দেন।

আল্লাহতায়ালা বলেন, “যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য এবং বিজয় আসবে এবং আপনি মানুষকে দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাকারী” (সূরা নাসর, আয়াত ১-৩)।

বিজয় উদযাপনে তিনটি দিক নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে এখানে।

এক) আল্লাহর মহিমা ও পবিত্রতা বর্ণনা করা।

দুই) আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা।

তিন) অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলত্রুটির জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

কারণ যুদ্ধ ক্ষেত্রে তো বটেই, দৈনিক জীবনেও আমাদের অনেক ভুলত্রুটি সংঘটিত হয়ে যায়।

পরবর্তীতে রাসুল (সঃ) মক্কা বিজয়ের দিন শুকরিয়া স্বরূপ নামাজ আদায় করেন। রাসুল (সঃ) এর দেখাদেখি অনেক সাহাবিও তখন এই নফল নামাজ আদায় করেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি এতো বেশী খুশী হয়েছিলেন, যে সেদিন তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। অবশ্য তিনি সব সময়ই ছিলেন উদার এবং কল্যাণকর এক মাহানুভব সত্তা। বিজয়ার্জিত মক্কায় প্রবেশের সময়েও তার চেহারায় বা আচরণে ছিল না কোনো দাম্ভিকতা বা অহংকার। বরং তিনি ছিলেন বিনয় বিগলিত, আল্লাহর সামনে কৃতজ্ঞতায় নত। (সহিহ বুখারি, এবং সিরাতগ্রন্থ থেকে আমরা তা জানি।)

ইসলাম একটি পূর্ণাংগ জীবন বিধান। জীবনের প্রতিটি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া আছে। আমরা তা পালন করে আমাদের দেশের জন্য মঙ্গল কামনা করে রাসুল (সঃ) এর অনুসরণ করে বিজয় উদযাপন করতে পারি। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই বিজয় অর্জিত হয়েছে তাদের জন্য দুয়া করা আমাদের একান্ত দায়িত্ব। আমরা যাদের ত্যাগ, রক্ত এবং জীবনের বিনিময়ে একটি সার্বভৌম দেশ পেয়েছি, তাদের কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করে তাদের জন্য দুয়া করা, তাদের পরিবারের খোঁজখবর রাখা, তাদের প্রয়োজনে পাশের দাঁড়ানো রাষ্ট্র এবং প্রত্যেক নাগরকের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের নাজাতের জন্য দান-খয়রাত ও সদকায়ে জারিয়া করা তাদের কবরে সওয়াব পৌঁছানোর নিয়তে তাদের নামে মসজিদ-মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয় স্থাপন, সড়ক, ব্রিজ ইত্যাদি জনহিতকর কাজ করা উচিৎ। এই নীতি আদর্শই ইসলামের শিক্ষা।

বিজয় উৎসবে উদ্বেলিত হয়ে শুধু মাইক বাজিয়ে আর আনন্দ প্রকাশ করার জন্য এই মুক্তির সংগ্রাম হয়নি। অন্যায়, অবিচার ও শোষণমুক্ত জীবন ও সমাজর নির্মাণের লক্ষ্যেই ছিল আমাদের সংগ্রাম এবং এই লক্ষ্যেই ছিল আমাদের বিজয় অর্জন। তাই বিজয়ের দিনের আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপনের পাশাপাশি এর সুরক্ষা, উন্নয়ন, দেশের প্রত্যেকটা মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য আমাদের কাজ করার শপথ নিতে হবে। সুশাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটা দেশের বিজয় অটুট ও সমুন্নত থাকে। আপনাকে আমাকে সদা সচেতন থাকতে হবে আমাদের দিয়ে যেন একজন মানুষেরও ক্ষতি না হয়। আল্লাহ আমাদের সুনাগরিক হয়ে সবাইকে শান্তি দিয়ে ও নিজেরা শান্তি পেয়ে বাঁচার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের দেশকে শুত্রুদের কুনজর থেকে রক্ষা নিরাপত্তা দান করুন, আমীন। 

লেখকঃ লেখক ও গবেষক, লস এঞ্জেলেস, ইউএসএ

আরও পড়ুন- কেমন হবে একজন মুসলিমের সাহিত্যচর্চা?

রাসুলের বিষয় উদযাপন- রাসুলের বিষয় উদযাপন – রাসুলের বিষয় উদযাপন

আরও পড়ুন