সোনালী দিনের গল্প

আব্দুল্লাহ আরমান

এডওয়ার্ড হালেট কারের মতে,“ইতিহাস হলো বর্তমান ও অতীতের মধ্যে এক অন্তহীন সংলাপ”। ডাচ ইতিহাসবিদ জন হুজিংগা বলেন, “ইতিহাস হলো সেই বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন, যাতে কোনো সভ্যতা নিজেই তার উত্থান-পতনের অতীত ব্যাখ্যা প্রদান করে”
সহজ ভাষায় ইতিহাস হলো সময়ের আয়না,যাতে রয়েছে অতীতের শিক্ষা, বর্তমানের সাথে অতীতের তূলনামূলক অবস্থান পর্যালোচনা ও ভবিষ্যতের কর্মপন্থা বিষয়ে সুস্পষ্ট বার্তা। যে জাতি ইতিহাস সচেতন নয় তার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।
মুসলিম জাতির গর্ব করার মতো একটি সোনালী ইতিহাস রয়েছে। শৌর্যবীর্য, ক্ষমতা, সুশাসন, শিক্ষা- সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও জ্ঞানচর্চায় শীর্ষ এ জাতির ইতিহাস আজ এই মুসলিম প্রজন্মের নিকট অজানা। আজকের ইউরোপের চোখ ধাঁধানো অগ্রগতির শুরুটা মুসলমানদের হাত ধরেই শুরু হয়েছে।
ইউরোপে যখন গির্জা ও মঠ ব্যতীত কোনো শিক্ষাগার ছিলো না তার শত শত বছর পূর্বেই মুসলিমরা বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিলো। মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত কোনো কোনো পাঠাগারে কয়েক লক্ষ বই ছিলো। স্পেনের অন্তর্গত আলমেরিয়ার উজীর ইবনে আব্বাসের লাইব্রেরীতে ৪ লক্ষ বই ছিলো। অথচ তৎকালীন ইউরোপের কোনো রাজার লাইব্রেরীতে এর এক সহস্র ভাগ বই-ও ছিলো না।
দ্বাদশ শতাব্দীতে মুসলিম গণিতবিদ মুহাম্মাদ ইবনে মূসা আল-খারিজমী সর্বপ্রথম ‘শূন্য’(Zero) ও দশমিক বিন্দুর প্রবর্তন করেন। তাঁর লেখা ‘হিসাবুল জবরে’র নামানুসারে অ্যালজেবরা(Algebra) তথা বীজগণিত নামকরণ করা হয়েছে।
আরবরাই চিকিৎসা শাস্ত্রকে সর্বপ্রথম প্রকৃত বিজ্ঞানে পরিণত করেন। ভেষজ ঔষধ, চেতনানাশক ও কয়েকটি জটিল অপারেশনের আবিস্কারক তারাই। এটা সেই সময়ের কথা যখন ইউরোপের খৃষ্টান ধর্মযাজকরা ঔষধের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে নিছক ধর্মানুষ্ঠান দ্বারা রোগের চিকিৎসা করতো। আল-রাজীর দশ খন্ডে লিখিত আয়ুর্বেদ বিশ্বকোষ ‘কিতাবুল মানসূরী’র নবম খন্ড ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের চিকিৎসা বিষয়ক সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
জাবির ইবনে হাইয়ানের হাত ধরে রসায়ন শাস্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। তিনি Alcohol, Potassium, Nitric Acid, Sulphuric Acid ইত্যাদি আবিষ্কার করেন।
এছাড়াও পদার্থবিজ্ঞানেও মুসলিমদের অসামান্য অবদান রয়েছে। পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জনক আল-হাজানের (ইবনুল হায়সাম) আবিস্কৃত প্রবর্ধক কাঁচ (Magnifying glass) তথা চশমা পাশ্চাত্যে আমদানি করে রজার বেকন আবিষ্কারকের আসন গ্রহণ করেছে!!
সাহিত্য চর্চায় জাহেলী যুগ থেকেই আরবরা অদ্বিতীয়। তাঁদের কবিতা ছিলো সম্পূর্ণ মৌলিক এবং গভীরতম সাহিত্যের ধারক ও বাহক । আরব্য উপন্যাসগুলো আজও সাহিত্যের আকাশে জ্বলজ্বল করছে।
ভূগোল শাস্ত্রেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তারাই প্রথম Compass এর ব্যবহার শুরু করে এবং ইউরোপ তাদের কাছ থেকে তা শিক্ষা করে। খৃষ্টানরা যখন পৃথিবী সমতল বলে ঘোষণা করেছে ততক্ষণে বাগদাদে তার পরিধি নির্ণয় সম্পন্ন হয়েছিলো!!
কারিগরী নকশার বৈচিত্র্যে, সৌন্দর্য ও শিল্পকলায় আরবরা ছিলো সারা বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সোনা,রূপা, তামা, লোহা, ইস্পাত শিল্প এমনকি কাপড় বুননেও আজ অবধি কেউ তাদের সমকক্ষ নয়। মসলিন কাপড়ের নামকরণ হয়েছে ইরাকের ‘মওসিল’ শহর থেকে, গাজা নগরী থেকে ‘গজ’ শব্দের উৎপত্তি। এছাড়াও সিরাপ, পারফিউম ইত্যাদির প্রথম আবিষ্কারক তারাই!
উৎকৃষ্ট পানি সেচ পদ্ধতি, জমিতে সারের ব্যবহার ও গাছের কলম কাটার প্রচলনও আরব মুসলিমদের মাধ্যমেই শুরু হয়েছে। প্রাচ্য হতে বহু গাছ ও চারা আমদানি করে তারা কৃষি বিষয়ক বিজ্ঞান সম্মত পুস্তক রচনা করেছে।এছাড়াও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রায় প্রতিটি শাখায় মুসলিমদের (বিশেষ করে আরবদের) দৃঢ় পদচারণা ছিলো।
ইসলাম মসজিদ কেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থা তবে তা মসজিদে সীমাবদ্ধ নয়। মসজিদ তথা আধ্যাত্মিকতায় এর মূল প্রোথিত হলেও ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি বৈশ্বিক জীবন পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে এর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
কিন্তু মূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু বৈষয়িক জীবন নিয়ে মত্ত থাকায় আজ মুসলিম জাতির এই অধঃপতন। সোনালী ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে আবারও সেই ওহীর বিধানে প্রত্যাবর্তন আবশ্যক।
10/04/2021
★তথ্যসূত্রঃ মুসলিম কীর্তি(ডঃ এম আঃ কাদের), জাতীয় পত্রিকা ও অন্যান্য।
লেখকঃ ইসলামী বিষয়ে কলাম লেখক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট
আরও পড়ুন