অনিশ্চিত নারী জীবন

কামরুন নাহার মিশু

মেয়েদের সংসার জীবন কত অনিশ্চিত! ঠিক যেন টলটলে স্বচ্ছ কচু পাতার পানির মতো। এই আছে এই নেই। যখন আমি খুব ছোট! ছোট মানে একদম ছোট । প্রাথমিকের গন্ডিটাও তখনো অতিক্রম করিনি। তবে সম্পর্কের গুরুত্ব বুঝতাম।

একদিন পাশের বাড়িতে বিরাট এলাহী কান্ড ঘটেছে। বিশ বছর ধরে সংসার করা এক মহিলা ছয় সন্তানের জননী। ছেলের গৃহশিক্ষকের সাথে হেসে হেসে কথা বলার অপরাধে বিনা নোটিশে বদ মেজাজি, সন্দেহপ্রবন স্বামী তাকে ভরা মজলিসে সবার সন্মুখে তালাক দিয়েছিল।

মহিলার কিছুই বলার ছিল না। কেবল নির্বাক চেয়ে থাকা ছাড়া। কারণ ঐ গৃহশিক্ষক তাকে চাচী বলে সম্বোধন করত। ঐ সময় মহিলা সন্তান সম্ভাবা ছিল। সবাই বলাবলি করল সন্তান সম্ভাবা অবস্হায় তালাক দিলে সেটা কার্যকর হয় না।

তালাক কার্যকর হোক বা না হোক লোকটা পরের সপ্তাহে দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন বউ ঘরে তুলেছিল।

মহিলার হতদরিদ্র ভাইরা প্রতিবাদ করায় কাজের কাজ কিছু হয়নি। উল্টো গর্ভের সন্তানের স্বীকৃতি জানাতেও সে লোকটা অস্বীকার জানাল।
এক পৃথিবী সমান অপবাদ মাথায় নিয়ে মহিলাকে তিন বছর, পাঁচ বছর, সাত বছর, দশ বছর, এক বছর বয়সের পাঁচটা সন্তান সাথে নিজের সাজানো সংসার রেখে নিশ্চুপে চলে যেতে হলো।

অনেকবছর পর একদিন লোকটা আমাদের বাড়ি এসেছিল। আব্বা প্রসঙ্গক্রমে তার প্রথম স্ত্রীর কথা জানতে চাইলেন।
লোকটার সেকি অপরাধবোধ চোখে মুখে

” চাচা জীবনে যে পাপ করেছি অন্যের কথায় প্ররোচিত হয়ে, নিজের সতীসাধ্বী স্ত্রীকে সবার চোখে পাপী বানিয়ে ঘর ছাড়া করেছি। যেসময় নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছি তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আপনার চাচী সেদিন বাবার বাড়ি না গিয়ে কোথায় যেন নিরুদ্দেশ হয়েছিল, অনেক বছর কোনো খবর পাইনি। পরে যখন খবর পেয়েছি, তখন আর ফেরানোর সুযোগ ছিল না।”

আচ্ছা লোকটার অপরাধবোধে কি মহিলা তার সংসার ফিরে পেয়েছে? সম্মান ফিরে পেয়েছে? পায়নি তো!

আব্বা প্রথমেই জানতেন এটা এক ধরনের ফ্যামিলি পলিটিক্স ছিল। পরিবারের কাছের কিছু লোকজন হিংসা করে মিথ্যা বদনাম রটিয়েছে। লোকটাও কাজের কারণে মাসের পঁচিশ দিনই অন্য জেলা শহরে থাকত। তাই সবকিছু ভালোভাবে যাচাই করার সুযোগ পায়নি।হঠাৎ করে বাইর থেকে এসে দুজনকে একসাথে কথা বলতে দেখায়, তার মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। লোকটা এমনিতে বদমেজাজি এবং সন্দেহ প্রবন ছিল। ফলাফল একটা সাজানো সুন্দর সংসার কাঁচের মতো ভেঙে খানখান হয়ে গেলো।

কী অদ্ভুত নিয়ম! তিন কথায় একটা মানুষ, একটা পরিবার, পরিবারের সব নিয়ম কানুন একজন মেয়েকে আপন করে নিতে হয়। প্রাকৃতির নিয়মে মেয়েরা করেও নেয়। আবার ভাগ্য যখন প্রতারিত করে ঠিক তিন কথায় সব ছেড়ে চলে যেতে হয়। হোক নিজের হাতে গড়া সংসার, হোক না অনেক সন্তানের মা। মুহূর্তে পুরো পরিবার তার পর হয়ে যায়।

গতকাল রাতে শুনতে পেলাম। মেয়ের বাবার এক বন্ধুর সতেরো বছরের সংসার হঠাৎ করে বনিবনা হচ্ছে না, সে অজুহাতে ডিভোর্স হয়ে গেলো। তাদের সংসারেও তিনটা সন্তান আছে। বড় মেয়ের বয়স চৌদ্দ, ছোট ছেলের বয়স তিন। তাদেরও সুখের সংসার ছিল। তাদের সংসারেও সুখ ছিল, ভালোবাসা ছিল। হঠাৎ করে ভাগ্য বিড়ম্বনা করল।

যদিও সবাই মেয়েটারই দোষ দিচ্ছে। জানি না মহিলাটা কতটুকু দোষী বা আদৌ দোষী কি-না।
যতটুকু জানি মেয়েরা বড় বেশি সংসার প্রেমী হয়। কোনো কিছুর বিনিময়ে সংসার ছাড়তে চায় না।
অনেক মেয়েকেই বলতে শুনেছি, এমন অবহেলা, অপমান সহ্য করেই পড়ে আছি শুধু সংসার ভালোবাসি বলে। সন্তান থাকলে তো কথাই নেই।

একদিন সংসার করা পুরুষের প্রতিও নারীদের আজন্ম একটা টান হয়। মেয়েরা সবসময় ভালো খাবার স্বামীকে খাওয়তে পছন্দ করে। আমার আম্মাকে দেখতাম মাছের বড় পিস, মুরগির রানের টুকরা সবাই খাওয়ার আগে আব্বার জন্য তুলে রাখতেন। বাংলার প্রতিটা ঘরে ঘরে মনে হয় একই নিয়ম প্রচলিত।

একদিন শ্বশুর বাড়িতে কীভাবে যেন কথার প্রসঙ্গে তাদের বাড়িকে নিজের বাড়ি বলায়। চাচাতো জা সাথে সাথে বলে বসলেন
” নিজের বাড়ি আবার বলা শিখলে কবে থেকে! এখনো শাশুড়ি জীবিত আছেন।”
লজ্জা পেয়ে চুপ হয়ে গেলাম। কারণ আমি যৌথ পরিবার থাকি। কারো মুখে মুখে তর্ক করা পরিবার থেকে শিখে আসিনি। বিশেষ করে আমি বিশ্বাস করি সবার সাথে তর্ক করে জিতে যাওয়াও কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

পরে ভাবলাম ঠিকই তো বলেছেন ভাবী, মেয়েদের আসলে একান্ত নিজের বলতে কী আছে?
বিয়ের পর বাবার বাড়ি পর হয়ে যায়। শাশুড়ি জীবিত থাকলে স্বামীর বাড়িকে নিজের বাড়ি বলা যায় না। সন্তানও একান্ত নিজের নয়। ভালো কাজ করলে বাবার মতো হয়েছে। একটু ব্যতিক্রম হলেই মায়ের মতো অথর্ব।
সংসার জীবনের সব ব্যর্থতার দায় কোনো কারণ ছাড়াই মেয়েদের ঘাড়ে এসে পড়ে। অথচ সারাটা জীবন মেয়েরা মায়া দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, শ্রম দিয়ে, সেবা দিয়ে স্বামীর সংসারকে নিজের সংসার মনে করে সাজিয়ে তোলে।

ভাগ্য খারাপ হলে আবার যেকোন সময়, যেকোনো বয়সে সব ছেড়ে চলে যেতে হয়।

হায়রে নারী জীবন!

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন