অপরাধী

তাজ রহমান

লিপি বেগম। একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের একজন শিক্ষিকা। মাাসছয়েক আগে তার ডির্ভোস হয়েছে। তাই সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে বাবার বাসার ঘর আর কর্মস্হলের মধ্যে। জীবীকার তাগিদে সে কর্মস্হলে যায়।কর্মস্হলের কাজ শেষ হলে সে বাসায় ফিরে ঘরে বসে পড়াশুনা করে বেশিরভাগ সময় কাটায়।আর নিজেকে বন্দী করে রাখে ঘরের চার দেয়ালের মাঝে।
লিপির বাবার বাসায় একজন মহিলা কাজ করত।কাজের এ মহিলাকে সকলে ফাতেমার মা বলেই ডাকত।তিনি ফাতেমার মা নামেই পরিচিত। লিপি ছুটির দিনে যখন বাসায় থাকত,তখন সে বেশ কিছুদিন লক্ষ্য করেছে যে ফাতেমার মা ঘরের মেঝে মোছার সময়,মেঝের সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ দুটো ও মুছত অনবরত। যদিও অন্য সময় অন্য সবার সঙ্গে সে হাসি মুখে কথা বলত এবং বেশির ভাগ সময়ই হাস্যোজ্জ্বল থাকত।
এক শুক্রবারে লিপির বাবা মা একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে দাওয়াত খেতে যায়। সে দিন লিপি বাসায় একাই ছিল।লিপি আবার লক্ষ্য করল যে ফাতেমার মা আবার কাঁদছে।
তাই সে কাছে গিয়ে জিঙ্গেস করল-
– কি হয়েছে, কাঁদছো কেন?
ফাতেমার মা বলল-
– কিছু না আপা এমনি কাঁদছি।
লিপি বলল
-এমনি এমনি কেউ কি কান্না করে? কি হয়েছে তোমার আমাকে বল?
-ফাতেমার মা বলল আপা আপনি যে কারণে কান্না করেন আমিও সেই কারণেই কান্না করি।আমার স্বামী সন্তানের জন্য কান্না করি।
লিপি বলল
– তোমার সন্তানতো তোমার সঙ্গেই থাকে।আর তোমার স্বামী কোথায়?

সে বলল
-আপা আমার ফাতেমা আর সোলাইমান ছাড়াও আর একটি সন্তান আছে।ঐ সন্তানের জন্য কান্না করি।আর ফাতেমার বাপে ঐসন্তানকে পৃথিবীতে নিয়ে আসার অপরাধে আমাকে তালাক দিয়েছে।আমিতো লেখাপড়া জানি না মুর্খ মানুষ। তাই আমার শরীর খারাপের তারিখও ঠিকমতো মনে রাখতে পারি নাই।তারপরও আমার স্বামীরে বলছিলাম পরীক্ষা করাতে। কিন্তু উনি করাননি।তারপর যখন আমার শারীরিক পরিবর্তন ঘটে তখন আমি বুঝতে পারি যে আমি আবার মা হতে চলেছি। তারে বলি।তিনি আমার গর্ভের সন্তানকে নষ্ট করতে বলেন।কিন্তু আমি পারি নাই গর্ভের সন্তানকে নষ্ট করতে।যখন ফাতেমা আর সোলাইমান এর দিকে তাকাতাম তখন মনে হতো পেটেরটাও তো এদের মতো।মা হয়ে যদি এদের মেরে ফেলতে না পারি,তাহলে ওকে কি করে মেরে ফেলব।তাই রাজি হতে পরিনি।আর এই কারণে আমার স্বামী আমাকে তালাক দিয়ে অন্য জায়গায় সংসার পাতছে ।
লিপি জিঙ্গেস করে,
-তোমার সেই সন্তান?
-সেই সন্তানটাও পোলা হইছিল আপা।কিন্তু ওরে যদি আমার কাছে রাখি তাহলে তো কাজ করতে পারব না।আর কাজ না করলে ফাতেমা আর সোলাইমান কে খাবার দিতে পারব না । তাই ওকে ঢাকায় এক নিঃসন্তান দম্পতির নিকট দত্তক দিছি। ওরে দেখার জন্য কলিজাটা ফেটে যেতে চায় আপা।বুক ফেটে কান্না আসে, তাই কাঁদি।তারপরও এটাই শান্তি যে ও বেঁচে আছে, ওকে আমি মেরে ফেলিনি।
লিপির দুচোখ বেয়ে অশ্রু নামে।সে দ্রুত চলে যায় নিজের ঘরে।এই সন্তানের জন্য আজ সে ডির্ভোস প্রাপ্ত।লিপি পরপর দুবার কনসেপ্ট করে।কিন্তু প্রথমটা পঞ্চম মাসে এবং দ্বিতীয়টা সপ্তম মাসে নষ্ট হয়ে যায়।এর কিছুদিন পরে লিপির স্বামী লিপিকে ডির্ভোস দেয়।
লিপি ওর স্বামীকে অনেক বুঝিয়েছিল। কিন্তু কাজ হয়নি।
লিপি ভাবে আমিও কাঁদছি, ফাতেমার মাও কাদছে। কান্নার কারণ ও একই।স্বামী,সন্তান।পার্থক্য শুধু এজায়গায় আমি কাঁদছি সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে পৃথিবীতে নিয়ে আসতে না পারার অপরাধে। আর সে কাদছে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে পৃথিবীতে নিয়ে আসার অপরাধে। সত্যিই এ পৃথিবীতে কত বিচিত্র কারণেই নারীরা হয় অপরাধী।

লেখকঃ শিক্ষক ও গল্পকার

আরও পড়ুন