আজকের নারী সমাজ

 

কথায় আছে “তাল দেবার লোক আছে গুড় দেবার নাই” ঠিক তাই। আমাদের সমাজটাই এরকম। ছোট কোন সমস্যা নিবারণের চেষ্টা করে বড় সমস্যা বাঁধিয়ে রাখে। সেটা সমাধান করার ক্ষমতা সে রাখে না। কারন সে নিতান্তই নগণ্য।

সেবার বাড়ি গিয়ে দেখলাম, এক চাচী তার উঠানে বসে কান্না করছে। আমি ভেবে উঠতে পারলাম না যে তাকে জিজ্ঞেস করবো কিনা “চাচি ভালো আছেন” কারন তার অবস্থায় জানিয়ে দিচ্ছে সে ভালো নেই। যার কারন আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থা। কি হয়েছে জানতে চাওয়ায় একগাদা উত্তর শুনলাম চাচীর মুখ থেকে। বাবা আমি অনেক অসহায়, এই সংসারের জন্য আমি কি না করেছি আজ আমি এ বাড়ীরই আগাছা হয়েছি। দুই মাস ধরে হাত- পায়ে ব্যথা, প্রেসার কম, চোখে তেমন দেখতে পায় না, কিন্তু আমার চিকিৎসা করার জন্য কেউ নায়। দুইদিন থেকে আমি নড়তেই পারছিনা।

তোমার চাচাকে বললাম ঔষুধ কিনে দেবার কথা কিন্তু তোমার চাচা বললো, তোমার জন্য ঔষুধ কেনার মত টাকা আমার নাই। ছেলে আমার বাড়িতে নেই। ভাবলাম, স্বামীর সংসারে এত খেটেও সে কিছু করলো না। কিন্তু আমার ছেলে, আমার নাড়ি ছেড়া ধন নিশ্চয়ই আমার কষ্ট বুঝবে। বাড়ি আসলে ঠিক টাকাটা দিয়ে দিবে বলে আমি পাড়ার ফার্মেসি থেকে ঔষুধটা কিনে নিয়ে আসি। কিন্তু সেটা মনে হয় আমার ভুল হয়েছিল কারন ছেলে আমার বাড়ি আসলে আমি তাকে সব খুলে বলি ঔষুধ কেনার কথা। কথাটা শুনে ছেলে আমার রেগে-মেগে একাকার। কি বললো জানো, তুই ঔষুধ কিনে নিয়ে এসেছিস তুই দাম দিবি আমি দিতে যাব কেন? কথাটা শুনে আমি দোকানে ঔষুধটা ফেরত দিয়ে এসে বসে এখানে কাঁদছি।

–এটাই কি হওয়ার কথা ছিল। মায়ের সেবার দাম বুঝি এভাবেই দেওয়া যায়। এটা গ্রামের প্রায় প্রতিটি মায়েরই কথা। তাদের বুকফাটা আর্তনাদ কেউ শুনতে পায়না কেউ না।

সমাজের একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত। কাহিনীর গোড়াতে লক্ষ করলে দেখা যায় অন্য কথা। এ ঘটনার জন্য কিছুটা দায়ী তার পরিবার, কিছুটা দায়ী এই সমাজব্যবস্থা আর বাকিটা দায়ী তার বাবার পরিবার।

একদিন আমি বসেছিলাম পাড়ার এক ননদের সাথে। সে তার মাকে বললো, ভাবিদের বাসাটা কি সুন্দর। আমার তো আসতেই ইচ্ছে করছিলোনা সেখান থেকে। শুনে তার মা বললো ভালো করে পড়, তাহলে তোকেও ওরকম চাকুরীজীবী দেখে বিয়ে দেবো যত টাকা লাগে লাগবে। কথাটা শুনে আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম। টাকার কি– দাপট। না জানি আরো টাকা থাকলে আরো কত কী করতেন। এ রকম অনেক বাবা-মা আছেন যারা নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে আনেন যার শেষ পরিণতি হবে ঐ চাচির মতো।

মেয়েকে যথাসাধ্য পড়াশোনা শেখান। যে টাকা বিয়ের পরে দেবেন সে টাকা তার জন্য আগেই খরচ করুন। তাকে যোগ্য করে তুলুন। স্বাবলম্বী করে তুলুন। দেখবেন, আত্মমর্যাদাশীল হয়ে আপনার মেয়ে বেঁচে থাকবে, সুখে থাকবে চিরকাল। আর জামাইকে টাকা দেবেন? কত টাকা দেবেন আপনি? যতই দেবেন তার আকাঙ্ক্ষা ততোই বাড়বে। সে আত্মমর্যাদা খুইয়ে বারবার হাত পাতবে আপনার কাছে। দিতে দিতে যখন নিঃস্ব হয়ে যাবেন, দেওয়া বন্ধ করে দেবেন। তখন শুরু হবে আপনার মেয়ের উপর অত্যাচার। হয় সহ্য করো নয় মর। এক পর্যায়ে সইতে না পেরে হয়তো আত্মহত্যা করবে। তাহলে এর পেছনে মূল হোতা তো –আপনি হলেন।

আমাদের সমাজে নামে শিক্ষিত এমন অনেকেই আছেন যাদের মতে, মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি বাপের বাড়ি থেকে আট-দশ লাখ টাকার জিনিসই না যায় তাহলে কি প্রেস্টিজ থাকে। থুথু ছিটাই সেই সকল প্রেস্টিজ ওয়ালা ভন্ড অভিভাবকদের। যারা প্রেস্টিজের নামে সমাজটাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাদের জন্য প্রতিনিয়ত চলে যাচ্ছে হাজারো প্রাণ।

আরে বাবা টাকা, সম্পদ যদি আপনার থাকে তবে সেটা তো সে পাবেই, আগে কি প্রয়োজন দেবার আর যদি সেটাতেও সন্তুষ্ট না হন তো, তার নামেই ব্যাংকে রাখেন তবে সেটা তাকে না জানিয়ে। কিংবা তার নামে কিছু একটা করেন। জামাইয়ের নামে নয়। অন্যের ছেলের হাতে সবটুকু তুলে দিয়ে নয়। এখনতো যৌতুকের রূপ বদলেছে। নিজের খাবার পয়সা নেই অথচ মেয়ের বাড়িতে পাঠাও সকল ফার্নিচার। বটি, খুনতি থেকে শুরু করে খাট- পালং পর্যন্ত।

কেন, ছেলে কি এতোদিন মেঝেতে ঘুমাতো। হাড়ি পাতিলের অভাবে কি না খেয়ে থাকতো তবে কেন? কেন এই অধঃপতন। কেন এই হীনমন্যতা।

বিভিন্ন উৎসবে পাঠাতে হবে ডালি ভর্তি সাজন। কেন? এ নিয়ম কোথা থেকে এসেছে? কে করেছে? কেন করেছে? এভাবেই কি মেয়েকে সুখী করবে তারা। এতে তারা তাদের মেয়েকে সুখী করছে না বরং প্রতিটি মেয়ের কান্না হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আমি দেখেছি, বাবা দিনমজুর, একটা মেয়ের বিয়ে দেওয়ার টাকা পর্যন্ত নেই। পাড়ার সকলে টাকা উঠিয়ে তার মেয়ের বিয়ে দিলো। অথচ মেয়েই বেঁকে বসলো ৬০ হাজার টাকা না হলে সে শ্বশুরবাড়ি যাবেনা। টাকা নিয়ে তারপর শ্বশুরবাড়িতে গেল। সে একবারও চিন্তা করলো না বাবার পরিস্থিতিটা। আবার প্রতিটা উৎসবে নিজেরা না খেয়ে মেয়ের বাড়িতে পাঠায় সাজন। আমি খুব অবাক হয়ে যায় এদের দেখে। মেয়েটি কি ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে পারবে সেখানে। কে বলতে পারে তাকে যে তাড়িয়ে দেয়া হবে না। আর মেয়েটি এসব শিখলে কোথা থেকে। নিশ্চয়ই এই লোভ-লালসিত সমাজ থেকে।

আবার অনেক বাবা-মাকেই দেখি মোহরানা নিয়ে বাক -বিতর্ক করতে। বিশেষ করে ওপরমহলের লোকজনকে, তারা মনে করেন মোহরানা বেশি টাকা হলে হয়তো মেয়েকে বেশি মূল্য দেবে। ছাড়াছাড়ির ভয় থাকবে না। সত্যিই কি তাই যে ছেলে ভাত দেবে সে দু’ টাকা মোহরানা হলেও দেবে আবার যে ছেলে ভাত দেবে না সে ছেলে দশ লাখ টাকা হলেও তাড়িয়েই ছাড়বে। আর ইসলামে তো আছেই- যার মোহরানা যত কম হবে সেই দম্পতির মাঝে আল্লাহর রহমত ততোবেশি থাকবে।

এখন আপনিই চিন্তা করে দেখুন। মেয়ের ভবিষ্যৎ ভালো করতে গিয়ে কত বড়ই না সর্বনাশ ডেকে আনছেন। কি দরকার এসব বাড়াবাড়ির বরং যথানিয়মে, প্রাকৃতিক নিয়মে চলুন। সন্তানকে সঠিক পথে মানুষ করুন। নিজে সৎ পথে চলুন। দেখবেন আপনার সন্তান ও আপনাকে অনুকরণ করে সঠিক পথেই এগোচ্ছে। ঝেড়ে ফেলুন এসব চিন্তা ধারা। উপড়ে ফেলুন সকল কাঁটা সমাজ থেকে। নির্মূল করুন একেবারে গোড়া থেকে। তাহলে দেখবেন উচ্ছল, প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে আমাদের সেই আগের সমাজ।।

 

রাজিয়া সুলতানা- কবিও সাহিত্যিক ।

আরও পড়ুন