আমিও একদিন শাশুড়ি হবো

জিনাত আরা জিতু

আমি একজন নারী।দুই সন্তানের জননী অর্থাৎ “মা” কালের পরিক্রমায় যদি বেঁচে থাকি তো “শাশুড়ি” হবো একদিন।
তাই শাশুড়ি প্রসঙ্গে কিছু কথা বলি;আসলে শাশুড়ি নামটা মনে আসলেই কেন জানিনা একটা বৈরীভাব আসে সকল পুত্রবধূর মনে।শাশুড়ি মানেই আমরা অনুভব করি একজন মানসিক অশান্তিদাত্রী একটা প্রতিচ্ছবি! কিন্তু আসলেই কি তাই? এই শাশুড়িই নিশ্চয়ই আমার জীবনসঙ্গীর মা।যেমন আমার একজন মা আছেন,যার কথা মনে আসলেই আমার মনে হয় মমতাময়ী একজন রমনী কিন্তু পক্ষান্তরে আমার স্বামীর মা কে আমার মমতাময়ী মনে হচ্ছেনা।কিন্তু কেন! একশজন পুত্রবধূর কাছে প্রশ্ন করলে আমার ধারণা ৯৫% জনই উত্তর দেবে শাশুড়ী নিজের ছেলে মেয়ের জন্য মমতায় আচ্ছাদিত থাকলেও আমার জন্য ডাইনী বই আর কিছু থাকেনা।কিন্তু আসলেই কি একপক্ষেরই(অর্থ্যাৎ শাশুড়িদেরই) দোষ সম্পর্কের অবনতির পেছনে? আমাদের পুত্রবধূদের কি কোনোই দোষ নাই! আমার মা আমাকে নিশ্চয়ই ছোটবেলায় কোনো কিছু ভুল করলে অনেক বকেছে! তাহলে শশুড়বাড়িতে করা কোনো ভূলের কারণে শাশুড়ি বকতে পারবেননা কেন? আমার মা যখন আমার বাড়িতে বেড়াতে আসছেন আমি মনে মনে চাইছি আমার বর বাজারের সবচেয়ে বড় মাছটা নিয়ে আসুক, আর আমি সানন্দে তা ভালো করে রান্না করে মায়ের পাতে বেড়ে দেই।আমার ভাই যখন তার বউয়ের কথা শুনে আমার মাকে কোনো বিষয়ে অপমান করছেন কিংবা কষ্ট দিচ্ছেন আমি চেষ্টা করি তার প্রতিবাদ করতে এবং সেই অন্যায় আচরণ প্রতিহত করতে।তখন আমার মা হয়ে যান অসহায় আর আমার ভাবী সংসার খেকো ডাইনী; কিন্তু আমার শাশুড়ি আমার বাড়িতে বেড়াতে আসলে আমি চেষ্টা করি ফ্রিজে যা কিছু আছে তাই দিয়ে কোনোরকমে দিন পাড়ি দেবার,আমার শাশুড়িকে যদি তার ছেলে একটা ভালো শাড়ি এনে দেন আমি হিসেব করি কতোটা অপচয় করা হলো! আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি ছলে,বলে,কৌশলে আমার স্বামীকে আলাদা ফ্লাট নিয়ে একটু শান্তিতে দিন কাটানোর ব্যাবস্থা করতে। অথচ আমি চাই আমার মা যেন তার পুত্রবধূর সেবা পান।আমার ভাই যেন কোনো সুখেরই হাতছানিতে পড়ে আমার মাকে ছেড়ে চলে না যান।
এটা কেন? কেন এই দ্বিমুখী আচরণ!

আবার বেশিরভাগ জামাইরাজারাও কম যান না এমন হেন আচরণ প্রয়োগ করতে।নিজের মাকে তার স্ত্রী যেন মা ই ভাবেন, শাশুড়ি না;কারণ বিয়ের পর এটাই নাকি নিয়ম! স্বামীর মা হবে আমার মা,স্বামীর বাবা আমার বাবা তার ভাই বোনকে আমার আপন ভাইবোনের মতো ভালোবাসতে হবে।কিন্তু তিনি আমার মাকে তার মা ভাবতে পারেননা,তার মা আমাদের মা হতে হবে কিন্তু আমার মা “তোমার মা” ই থেকে যাবে।তার মা যখন আমাদের দাম্পত্যজীবনের খুটিনাটি বিষয়ে স্বিদ্ধান্ত দেবেন তখন তা আমাদের ভালোর জন্যই করছেন ভেবে মেনে নিতে হবে কিন্তু আমার মা যদি কিছু বলে ফেলেন তবে তা হবে অনধিকারচর্চা! সে চাইবে তার মাকে আমি সন্মান করি কিন্তু সে আমার মা কে অসন্মান করেই যাবে।তার মা আমাকে আমার ভূল হলে বকতে পারবে কিন্তু আমার মাকে পারতপক্ষে জামাইয়ের পা ধোয়া পানি দিয়ে গোছল করে শুদ্ধ থাকতে হবে।সে একবারও ভাববেনা তার মা যেমন তাকে দশমাস দশদিন গর্ভে ধারণ করে বিকট যন্ত্রণা হজম করে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন আমার মাও এই একই কষ্ট করে আমাকে দুনিয়াতে এনেছেন।

আসলে এক্ষেত্রে একটা ব্যাপার,মেয়ের মা এবং ছেলের মা উভয়েরই একটা অদ্ভত সাইকোলজি কাজ করে ।ছেলের মা আত্মতুষ্টির অভাবে থাকেন, তাদের মনে হয় জন্মের পর থেকে যে ছেলে আমার আঁচলে ধরে ঘুরে বেড়াতো এখন সে বউয়ের আঁচলে মুখ মুছবে এটা সে মানতে পারেনা আবার মেয়ের মা ভাবেন আমার মেয়েকে নিয়ে গিয়ে বুঝি কাজের বুয়ার মতো খাটাবে,অথচ তাকে ফুল চন্দনে বড় করেছি আমি! তাই ভুলবোঝাবুঝির সুত্রপাত ঘটে।আমরা একটু চেষ্টা করলেই কিন্তু তাদের এই নিরাপত্তাহীনতার অবসান ঘটাতে পারি।
কিন্তু আমরা পুত্রবধূরা এবং জামাইয়েরা তাদের এই মনের অশান্তি দূর না করে তাদের সাথে অঘোষিত যুদ্ধে নেমে পড়ি।

এসব বৈরী আচরণ কেন জীবনসঙ্গীর /জীবনসঙ্গিনীর সাথে?
কি লাভ হয় এতে? কাউকে অসন্মান করার আগে, অবহেলা করার আগে কি একটাবার ভাবনায় আসেনা,আমি যা তার মায়ের সাথে করছি তেমনি আমার মায়ের সাথেও কাল আরেকজন এরূপ আচরণ করবে,পরশু আমার সাথেও এমনই হবে!
আমি স্বীকার করছি এক গাছের বাকল সহজে আরএক গাছে লাগেনা ; কিন্তু চেষ্টা করতে দোষ কোথায়?

না হয় চেষ্টাটা আমার থেকেই শুরু হোক! পুত্রবধূরা একটু ধৈর্য নিয়ে সহ্য করুক শাশুড়ির কটুক্তি,জামাইরা তাদের শাশুড়িদের যে অনিরাপত্তাবোধ আছে তাদের মেয়েদেরকে নিয়ে সেটা যেন দূর হয় জামাইয়ের আন্তরিকতা দেখে! অন্তত নিজেদের বিবেকের কাছে নিজেরা পরিস্কার থাকা যাবে।

পৃথিবীর সবগুলো সংসার সবগুলো পরিবার একটু শান্তি নিয়ে রাতে ঘুমাতে যাক,একটু প্রফুল্লতা নিয়ে সকালে চোখ মেলুক।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন