‘আমি’ও কারো ‘মা’

মাহফুজা শিরিনঃ

মাগো তোমায় পড়ে মনে
রাত্রি গভীর হলে,
যখন আকাশপাড়ে তারায় তারায়
লক্ষ পিদিম জ্বলে!

তখন আমি দরজা খুলে
বারান্দাতে যাই,
হাসনাহেনার গন্ধ এলে
তোমার গন্ধ পাই।
জোছনা মেখে দালানকোঠা
দাঁড়িয়ে থাকে সব,
চন্দ্রাহত আমিও তোমার
পাই যে অনুভব!
দূরে কোথাও খসে পড়ে
রাত্রি জাগা তারা,
কোথায় যেন কাঁদে পাখির
ছানা মাতৃহারা।

আমার তখন মনে পড়ে
ছোট্ট বেলার কথা,
এমন গহীন কালো রাতে
বুলিয়ে দিতে মাথা।
আদর করে জড়িয়ে ধরে
ভয় তাড়িয়ে দিতে,
বুকের উমে ঠাঁই দিতে মা
জমাট হিমেল রাতে।

তুমি কখন ঘুমিয়ে যেতে
বুলিয়ে মাথায় হাত,
আমি তো মা ঘুমাতাম না
হলেও অনেক রাত।
এমনি তখন হাসনাহেনার
গন্ধ এলে ভেসে,
মনে হতো সুবাস আসে
তোমার প্রতি শ্বাসে!
দেয়াল ঘড়ি টিক টিকা টিক
রাতের আঁধার চিরে,
জানিয়ে যেতো রাত্রি গহীন
ঘুমো খুকু ওরে!

তারপরও কি আমার চোখে
ঘুম আসত নেমে??
কখন যেন ঝিঁঝিঁ পোকার
গানও যেত থেমে।
সন্ধ্যাতারা পূব আকাশে
দিত যখন উঁকি,
দূরে কোথাও তক্ষকেরা
উঠতোনা আর ডাকি।
হাসনাহেনার গন্ধ যখন
বাড়তো বহুগুণ,
তখন আমার দুচোখ জুড়ে
আসত নেমে ঘুম।

তোমার বুকে লুকিয়ে মাথা
ঘুম পুরীতে যেয়ে,
সাতরঙা সব পরীর সাথে
খুশিতে গান গেয়ে,
দৈত্য দানো পিশাচিনীর
জীবন করে নাশ,
ছোট্ট হাতে তাড়িয়ে দিতাম
পরীর দেশের ত্রাস।
রাশি রাশি সুখের ছোঁয়া
ছড়িয়ে চতুর্ধারে,
ঘুমের দেশে বিদায় নিয়ে
আসতাম গো মা ফিরে।

এখনো মা রাত্রি আসে
দিনের পিঠে চড়ে,
আকাশ জুড়ে চাঁদের আলো
চিকঝিক মিক করে।
এখনো মা নিশীথ ফুলের
গন্ধ ভেসে আসে,
আগের মতোই দেয়াল ঘড়ির
ঘণ্টা ধ্বনি ভাসে।

সবই আছে হারিয়ে গেছে
একটি জিনিস দামী,
তোমার বুকে লুকিয়ে থাকা
ছোট্ট আমার ‘আমি’।

তোমার হাতের মায়ার পরশ
আর তো মাখিনা,
ছোট্ট বেলার সেই ‘আমি’টাও
এখন কারো ‘মা’।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন