আমি নারীবাদী নই

ড. উম্মে বুশরা সুমনা

প্রচণ্ড গরম, হাঁটতে হাঁটতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম। একটা ছায়াঘেরা টিনের ঘর সামনে দেখতে পেলাম। ঘরটার ছায়ায় ধপ করে বসে পড়লাম। হঠাৎ কোথা থেকে এক লোক এসে গরু খেদানোর মতো আমাকে বলল, ‘এটা মসজিদ, এখানে মেয়েদের বসা নিষেধ।’ তখন আমার বয়স সম্ভবত দশ। ঐ বয়সেই আমাকে কেউ বুঝিয়ে দিয়েছিল, মেয়েদের মসজিদের ছায়া মাড়ানোও নিষেধ।

দাদাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। প্রতিবেশী এক লোক তার বউকে ইচ্ছেমতো পেটাচ্ছিল, গ্রামের কিছু মহিলা জড়ো হয়ে দেখছিল আর বলছিল যে হাদিসে নাকি এসেছে, ‘যে জায়গা মার খাবে সেই জায়গা বেহেস্তে যাবে।’ এই মিথ্যা হাদিসটি আমি অনেক কুরআন পড়া, নামাজ পড়া মানুষদের কাছ থেকেও শুনেছিলাম।

এক আত্মীয়ের বাড়িতে দুপুর বেলা খেলছিলাম, সেই বাড়ির কর্তা দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। হঠাত দেখি তিনি রাগে গজগজ করছেন, ডালে লবণ কম হওয়ায় ডালের বাটি তার স্ত্রীর গায়ে ছুঁড়ে মেরেছেন। তার স্ত্রী হাসিমুখে আবার রান্না চাপিয়েছিলেন। বাড়ির কর্তা ধার্মিক ছিলেন।

অতটুকু বয়সে ধর্ম সম্পর্কে খারাপ ধারণা পেয়েছিলাম। একটু একটু করে বড় হতে লাগলাম। দাঁড়ি টুপি ওয়ালা মানুষটাকে দেখতাম বউ পেটাতে, ধর্মের বাণী কপচানো মানুষটাকে মেয়েদের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে হজ করতে দেখেছি। নামাজ পড়ে কপালে কালো দাগ হওয়া মানুষটাকেও দেখেছি, ছেলের বিয়ের সময় যৌতুক নিয়ে বিয়ে করাতে।

মহিলাদের প্রতি এমন হাজারটা জুলুম দেখে দেখে বড় হয়েছি। এই অন্ধকার সমাজে বাস করে আমিও একজন নারীবাদী হতে পারতাম। অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় শ্যাওলাই জন্মে, বড়ো গাছের জন্ম হয় না। আমিও হয়তো তাসলিমা নাসরিনের মতো শ্যাওলা হয়ে জন্মাতাম, এই সমাজের ভেইক ধরা ধার্মিক মানুষদের দেখে দেখে আমারও হয়তো ধর্ম সম্পর্কে বিষাদ্গার করতে ইচ্ছে করত।

আলহামদুলিল্লাহ্‌, আমি নারীবাদী নই। আমি মুসলিম, স্রেফ একজন মুসলিম। আমাদের এই সমাজ নারীবাদের জন্ম দেয়। আপনার নারীবিদ্বেষী কথাবার্তা তাদের বিষাক্ত নারীবাদের দিকে ঠেলে দেয়। কিছু উদাহরণ দেই।

১) ছেলেটা সারাদিন আইপিএল খেলার ফাঁকে মাঠের উলঙ্গ মেয়েদের নাচ উপভোগ করে, টাইমলাইনে সিনেমার ক্লিপ শেয়ার করা। যে ছেলে নিজে চোখের পর্দা করে না, তাকে ক্রিকেটার সাকিবের বউয়ের পর্দা নিয়ে অবলীলায় কমেন্ট করতে দেখেছি। লেবাসধারী মানুষদেরও বেপর্দা নারীদের গালিগালাজ করতে দেখেছি। পর্দা করা ছেলে-মেয়ে দুইজনের জন্যই ফরজ। শুধু মেয়েদের উপদেশ দিলেই চলবে না, নিজেকেও বদলাতে হবে, সাথে ছেলেদেরও দৃষ্টির পর্দার আয়াত সম্পর্কে জানাতে হবে। এইদেশীয় কোনো ছেলে যদি বিদেশে কাজে যায়, তখন সে কীভাবে নিজেকে সামলাবে সেটাও তাকে শেখানো উচিৎ। আমাদের সমস্যা হলো, একতরফা দাওয়াতি কাজ করে থাকি।

২) আমার পরিচিত এক ছেলে, যে কথায় কথায় কুরআনের আয়াত বলে। একদিন সে আমাকে তার বিয়ের দাওয়াত দেয়। জিজ্ঞেস করলাম, বিয়ে করে বউ কোথায় রাখবে? সে তখন মেসে থাকত। উত্তর এলো, গ্রামের বাড়িতেই রাখব। আমার আব্বা-আম্মার জন্যই বিয়ে করছি, তাদের সেবা করবে।’ আমি বললাম, তুমি তো বিয়ের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। ‘সে আমাকে যুক্তি দিলো, “শশুর-শাশুড়ি সেবা করা ফরজ। যেহেতু নারীর আসল ঘর তার স্বামীর ঘর, তাই বিয়ের পর তার আসল বাবা-মা হলো স্বামীর বাবা-মা। তাই তাদের সেবা করা ফরজ। ”

আমি তার যুক্তি শুনে হেসেছিলাম, শশুর-শাশুড়ির সেবা করা ফরজ নয়। এটা একজন স্ত্রীর জন্য নফল। এই কথাটা ইসলামী নারীবাদীরা বলেন, এটা অনেক পুরুষই মানতে চান না। আমাদের দেশের অধিকাংশ ছেলেই ঘরের কাজ করতে নারাজ। নিজের পিতা-মাতা হলো ছেলের জান্নাতের দরজা, অফিস থেকে ফিরে ছেলে হাত পা ছড়িয়ে টিভি দেখবে, মোবাইল টিপবে কিন্তু বাবা-মায়ের ঘরে যাবে না, ঔষধ এগিয়ে দেবে না, মশারি খাটিয়ে দেবে না, বাবা-মায়ের সেবা করার নিজেরা সুযোগ পেলেও তা করতে নারাজ। বিয়ে করে বউ এনেছে নিজে এবং তার পরিবারের লোকদের সেবার জন্যই, এমন মানসিকতা অনেক পুরুষদেরই ধারণ করতে দেখেছি।

অন্যদিকে ইসলামী নারীবাদীদের একটু উপদেশ দেই, যখন আপনারা বলবেন, স্ত্রীর জন্য শশুর-শাশুড়ির সেবা ফরজ নয়, তখন এই হাদিসটিও বলিয়েন প্লিজ, প্রতিবেশি না খেয়ে থাকলে আপনি মুসলিম হতে পারবেন না, সেখানে আপনার অসুস্থ শশুর-শাশুড়ি কীভাবে না খেয়ে থাকে? আপনি শুধু নিজের স্বামী-সন্তানের খাবার বানালেন, তারা অভুক্ত থাকল, আপনি কি মুসলিম হতে পারবেন? একজন মুসলিমকে অবশ্যই মানবিক হতে হবে।

অন্ধের হাতি দেখার মতো আমরা যে যার সুবিধা মতো কুরআনুল কারিমের আয়াতকে বেছে নেই। আরেকপক্ষের কথা ভাবি না। যখন দাওয়াত দেই, তখন অবশ্যই ব্যালান্স করে কথা বলতে হবে, দুইপক্ষকেই নসিহা করতে হবে।

ছোটোবেলায় ওয়াজে শুধু মহিলাদের পর্দা নিয়ে শুনেছি, মহিলাদের স্বামী-শাশুড়ির খেদমত নিয়ে শুনেছি, মহিলাদের বাইরে চাকরি করা যাবে না, এমন ওয়াজ শুনেছি। কিন্তু তাদের প্রতি হওয়া জুলুমের কথা শুনিনি। এখন অবশ্য অনেক শাইখই আলহামদুলিল্লাহ্‌ নারীদের উপর করা জুলুম নিয়ে কথা বলেন।

এক গাদা যৌতুক মেয়ের বাপের কাছ থেকে নিয়ে এসে, মোহরানা নাম মাত্র শোধ করে বউকে কীভাবে শশুর-শাশুড়ির খেদমতের নসিহা করেন? বোনের হক মেরে কীভাবে বলেন, মেয়েদের বাইরে কাজ করা ঠিক নয়। নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিন, সে বাইরে গিয়ে কষ্টকর কাজ আর করবে না। তাকে মোহরানা দিন, পিতার সম্পদের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দিন, ঘরে দাসীর মতো আচরণ বন্ধ করুন। নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান আর অধিকার দিলে সে মুসলিম হয়েই বেড়ে উঠবে, কোনো নারীবাদী ট্যাগ তার গায়ে পড়বে না ইন শা আল্লাহ।

আসুন, সমাজটা পাল্টাই।

বিঃদ্রঃ “আমি নারীবাদী নই” নামে একটা পান্ডুলিপি লিখছিলাম, অর্ধেক লেখার পর আমার আম্মা অসুস্থ হওয়ায় বাড়ি চলে যাই। আর লেখা হয়ে উঠেনি, বাকিটা লিখতে শুরু করব ইন শা আল্লাহ।”

লেখকঃ সাহিত্যিক ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক

আরও পড়ুন