ইসলামি স্বর্ণযুগে মুসলিম নারীদের ক্যারিয়ার

জি.মোস্তফা

মুসলিম নারীদের বিভিন্ন পেশা ও চাকুরি গ্রহণঃ
আজকের প্রেক্ষাপটে অনেক ক্ষেত্রে নারীদের বিভিন্ন পেশায় অংশগ্রহণ কিংবা চাকুরি গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে ওঠেছে।এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ইসলামে নারীদের বাইরে কাজ করার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি কী? কুরআন কোথাও বলেনি যে, নারীরা বাইরে কাজ করতে পারবে না। সূরা নিসায় আছে- ‘পুরুষের রোজগার পুরুষের। নারীর রোজগার নারীর।’ এখানে নারীদের বাইরে কাজ করার অনুমতি পাওয়া যায়। বাস্তবেও রসূল (স.)এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগে নারীরা বাইরে তাদের বাগানে কাজ করতেন এবং অনেকে ব্যবসা করতেন। হজরত উমর (রা.) একজন মহিলাকে মার্কেট সুপারভাইজার নিয়োগ করেছিলেন। ইসলামি স্বর্ণযুগে নারীরা বহু কল্যাণকর কাজে অংশগ্রহণ করেছেন, বিভিন্ন পেশায় তারা নিয়োজিত থেকেছেন।

পুরুষদের পাশাপাশি সমাজ ও জাতির কল্যাণে তারা নিয়মিত এগিয়ে আসতেন।বিশেষ ও সাধারণ কাজের সকল ক্ষেত্রে তারা অংশ নিতেন জীবনের স্বাভাবিক প্রয়োজনের তাগিদে।তবে এ অংশগ্রহণ শরিয়ার কানুন বহির্ভুত ছিলো না। শিক্ষার সাথে তারা সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করতেন।যেমনঃ সমাজ কল্যাণ, সমাজ সেবা, শিক্ষকতা,কায়িক পরিশ্রম, কারিগরী,পশু পালন, কৃষি কাজ,হস্ত শিল্প, ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা-নার্সিং,পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান, হিসাব-নিকাশ, ব্যবসা ইত্যাদি।

তবে দুটো জিনিস তাদেরকে এ কাজ করতে বাধ্য করেছিলো।এর মধ্যে একটি ছিলো- নিজেকে ও পরিবার পরিজনকে দারিদ্র মুক্ত রেখে মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করার দায়িত্ববোধ। দ্বিতীয়ত,উপার্জিত অর্থ সমাজের কল্যাণে (সাদাকা) ব্যয় করে অধিক পুরস্কার লাভ করা।

রাসূল (স.) এর যুগে প্রায় সকল সাহাবিই কাপড় বুনতেন। হযরত আসমা বিনতে উমাইস নিরক্ষরদের পড়াতেন।হযরত হাফসা (রা.) ছিলেন শিক্ষিকা। শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ (রা.) ছিলেন আবার হাফসা (রা.) এর শিক্ষিকা। হযরত উমর (রা.) শিফা বিনতে আব্দুল্লাহকে রাজধানী মদিনায় মার্কেটের সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং কোনো সিদ্ধান্ত প্রদানের ব্যাপারে তার মতামতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন।(ইসাবা)

আনসারিদের অধিকাংশ মহিলা কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আর মুহাজির নারীদের মধ্যে যারা চাষযোগ্য ভূমি এলাকায় বাস করতেন তারাও কৃষি কাজে জড়িত ছিলেন,হযরত আসমা (রা.) তাদের মধ্যে অন্যতম। কা’ব ইবনু মালিকের দাসী মদিনার সালা পাহাড়ে ছাগল চারণ করতো। একবার একটি ছাগল অসুস্থ হলে তিনি ধারালো প্রস্তরখন্ড দ্বারা জবেহ করলেন,এ ব্যাপারে রাসূল (স.) কে জিজ্ঞেস করলে তিনি খাওয়ার অনুমতি দিলেন।(বুখারি)
হযরত খাদিজা (রা.) একজন বড়ো ব্যবসায়ী ছিলেন।খাওলা,মালিকা, সাকাফিয়া, এবং বিনতে মাথবাবা সুগন্ধির ব্যবসা করতেন। এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা মসজিদে নববির ক্লিনার ছিলেন।তিনি মারা গেলে রসূল (স.) তার কবরের কাছে এসে সালাতে জানাযা আদায় করেন।(বুখারি)

সাহিত্য ও বিজ্ঞান চর্চায় সোনালি ক্যারিয়ারঃ
ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে বিজ্ঞান চর্চায় পুরুষদের অবদান সম্পর্কে বিপুল পরিমাণে বিবরণ বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানচর্চায় মুসলিম নারীদের অবদান সেই তুলনায় কম আলোচিত। পুরুষের পাশাপাশি মুসলিম নারীরা চিকিৎসাবিজ্ঞান, কাব্য, সাহিত্য, আইন প্রভৃতি বিষয়ের মত বিজ্ঞান চর্চায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। রসূল (স.) এর সমকালীন অনেক নারীই চিকিৎসাসেবার সাথে জড়িত ছিলেন।

জানা যায়, যুদ্ধে আহতদের সেবা প্রদানের লক্ষ্যে অনেক নারী রাসূল (স.) এর সাথে যুদ্ধেও গমন করেছিলেন। নুসাইবা বিনতে কাব আল-আনসারি (রা.) তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন মদীনার একজন প্রখ্যাত নারী চিকিৎসক। উম্মে আম্মারা নামেও পরিচিত ছিলেন এই নারী সাহাবী। উহুদ যুদ্ধের সময় রসূল (স.) কে রক্ষায় লড়াইয়ের জন্য তিনি ইতিহাসে অধিক পরিচিত।

রাসূল (স.) এর সমকালীন মদিনার অপর একজন নারী চিকিৎসক রুফাইদা বিনতে সা’দ আল-আসলামিয়া (রা.)। তাকে ‘ইসলামের প্রথম নার্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি মূলত তার চিকিৎসক পিতা সা’দ আল-আসলামির নিকট থেকে চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় এতই বুৎপত্তি অর্জন করেন যে, রসূল (স.) যুদ্ধে আহত সকল সৈনিককে তার নিকট চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করতেন।

এছাড়া রসূল (স.) এর সমকালীন আরো কয়েকজন নারী চিকিৎসকদের মধ্যে উম্মে সিনান আল-ইসলামি, উম্মে মাতায়ি আল-আসলামিয়া এবং উম্মে ওরাকা বিনতে হারিস উল্লেখযোগ্য। মধ্যযুগেও মুসলিম নারীরা বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতার সাথে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।
ইবনে আল-জাওযি, ইবনে আল-খতিব বাগদাদি এবং ইবনে কাসিরসহ প্রমুখ ঐতিহাসিক দশম শতাব্দির একজন নারী গণিতবিদের প্রশংসা করেছেন। সুতাইতা আল-মাহামালি নামের এই নারী গণিতবিদ বাগদাদের এক বিদ্যোৎসাহী পরিবারের সন্তান ছিলেন। তার পিতা ছিলেন বাগদাদের একজন বিচারপতি ও বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিত্ব। গণিতের বিভিন্ন শাখায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এছাড়া একইসাথে তিনি আরবী সাহিত্য, হাদীস এবং আইনশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ৩৭৭ হিজরি মোতাবেক ৯৮৭ ঈসায়িতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

এছাড়া আন্দালুসিয়ার উমাইয়া দরবারের শিক্ষাবিদ ছিলেন লুবনা আল-কুরতুবিয়া। তিনি একাধারে গণিত, কাব্য, ব্যকরণ ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার উপর বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তার জ্ঞানগত দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার কারণে তিনি খলীফা ৩য় আবদুর রহমান এবং তার পুত্র ২য় আল-হাকামের দরবারের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

সাহাবি নারীর বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাঃ
হযরত সফিয়া (রা.) জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।কুফা থেকে অনেক মহিলা লেখা পড়া শিক্ষা ও মাসায়ালা জানার জন্য সেখানে আসতেন। (মুসনাদ)

মুসলিম নারীদের পেশা ভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বঃ
আয়িশা (রা.) হাদিস বর্ণনা, ইসলামি আইন, ফিকহ, ইতিহাস, বংশলতিকা, কবিতা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। আসমা বিনতে আবি বকর (রা.) ও উম্মে আবদিল্লাহ বিন জুবায়ের হাদিস বর্ণনায় পারদর্শী ছিলেন। আয়িশা বিনতে তালহা কবিতা, সাহিত্য, জ্যোতির্বিদ্যা ও নভোমণ্ডল বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন। সাকিনা বিনতে হোসাইন ও খানসা কাব্য ও সাহিত্যে পারদর্শী ছিলেন। মায়মুনা বিনতে সাদ (রা.) হাদিসে পারদর্শী ছিলেন। হজরত আলি (রা.)ও তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।

কারিমা মারজিয়া (রহ.) হাদিসের পণ্ডিত ছিলেন। ইমাম বুখারি (রহ.) তাঁর কাছ থেকে হাদিস সংগ্রহ করেছেন। ফাতিমা বিনতে আব্বাস ছিলেন প্রখ্যাত ইসলামি আইনবিদ। তিনি মিসর ও দামেশকের প্রভাবশালী নেত্রী ছিলেন। উখত মজনি (রহ.) ছিলেন ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর শিক্ষিকা। আল্লামা মারাদিয়ি (রহ.) তাঁর কাছ থেকে যাকাত বিষয়ক মাসায়ালা বর্ণনা করেছেন। হুজায়মা বিনতে হায়ই (রহ.) প্রখ্যাত তাবিয়ি ও হাদিসবিদ ছিলেন। ইমাম তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ (রহ.) তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।

আয়িশা বিনতে আহমদ বিন কাদিম স্পেনের অধিবাসী ছিলেন। তিনি ক্যালিওগ্রাফিতে পারদর্শী ছিলেন। লুবনি (রহ.) ভাষাবিদ ও আরবি ব্যাকরণশাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। ফাতিমা বিনতে আলি বিন হোসাইন বিন হামজাহ ছিলেন হাম্বলি মাজহাবের পণ্ডিত। সমসাময়িক আলিমরা তাঁর কাছ থেকে হাদিস শিখেছেন এবং প্রসিদ্ধ হাদিসগ্রন্থ দারেমি শরিফের সনদের অনুমতি নিয়েছেন। রাবিয়া কসিসাহ সুপ্রসিদ্ধা বক্তা ছিলেন। ইমাম হাসান বসরি (রহ.)ও তাঁর কাছ থেকে বিভিন্নভাবে উপকৃত হয়েছেন।

ফাতিমা বিনতে কায়িস শিক্ষাবিদ ও আইনবিদ ছিলেন। উম্মে ফজল, উম্মে সিনান হাদিস বর্ণনাকারী ছিলেন। শিফা বিনতে আবদিল্লাহ প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ছিলেন। ওমর (রা.) তাঁকে ইসলামি আদালতের ‘কাজাউল হাসাবাহ’ ও ‘কাজাউস সুক’ ইত্যাদির দায়িত্বভার অর্পণ করেন। (সূত্র, তাবকাতে ইবনে সাদ : ৮/৪৫-৪৮; দালায়িলুন নবুয়্যাহ : ৫/৪১৬; ইবনে আসির : ৫/৪৫০; আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া : ৫/৭৮)

শায়িখ আলাউদ্দিন সমরকন্দি (রহ.) ‘তুহফাতুল ফুকাহা’ নামে একটি কিতাব লিখেন। এর ব্যাখ্যা রচনা করেছেন তাঁরই ছাত্র আবু বকর ইবনে মাসউদ কাস্তানি (রহ.)। ব্যাখ্যাগ্রন্থটির নাম ‘বাদায়িউস সানায়ি’। ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে এটি নজিরবিহীন কিতাব। এটি দেখে শিক্ষক তাঁর ছাত্রের কাছে নিজ মেয়েকে বিয়ে দেন। মেয়েটির নাম ফাতিমা। সমকালীন রাজা-বাদশাহরা মেয়েটিকে বিবাহ করতে আগ্রহী ছিলেন। তিনি ছিলেন মুফতি। তাঁর স্বাক্ষরিত অসংখ্য ফতোয়া বের হয়েছে। (ফতোয়ায়ে শামি : ১/১০০)

ইবনে কায়েসের বর্ণনায় দেখা যায়, প্রায় ২২ জন নারী সাহাবি ফতোয়া ও ইসলামী আইনশাস্ত্রে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁদের মধ্যে সাত জন উম্মাহাতুল মুমিনিন বা নবীপত্নী ছিলেন। ১১ শতাব্দিতে মামলুক শাসনামলে তৎকালীন মুসলিম নারীরা দামেশকে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১২টি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পূর্ণরূপে মুসলিম নারীদের দ্বারা পরিচালিত হতো।

মুসলিম নারী স্কলারদের জ্ঞানপ্রভাঃ

ইউরোপীয় ইতিহাসবিদদের চিহ্নিত মধ্যযুগে ইউরোপে ছিলো একেবারে নিকষ কালো অন্ধকার। সে সময় সেখানে ছিলো নিষ্ঠুর বর্বরতা।ইউরোপ ডাইনী-নিধনের (Witch Hunt) নামে তিনশো বছর ধরে ৪ থেকে সাড়ে ৬ লাখ নারীকে হত্যা করেছে। সময়টা হিজরি মোতাবেক ৮৫০-১১৫০ সন।
সেই সময় মুসলিম মেয়েরা কী করেছে? নিরবচ্ছিন্নভাবে পড়েছে আর পড়িয়েছে।।

আয়িশা বিনতে জারুল্লাহ শাইবানি (মৃত্যু ৮৭৩ হি.) বিভিন্ন শহরে ঘুরে ঘুরে ১০৫ জন শিক্ষকের কাছে সনদ নিয়েছেন।আসিয়া বিনতে মুহাম্মাদ ইরবিলি ২০০ এর অধিক উস্তাদের থেকে সনদ নিয়েছেন।উম্মুল হায়া উমামাহ (মৃত্যু ৯৩৯ হি.) আরবি ব্যাকরণের বইগুলো মুখস্ত করেছেন।বাদশাহ আওরঙ্গজেবের কন্যা যাইবুনিইসা (মৃত্যু ১১১৩ হি.) কুরআন-হাদিস-ফিকহ ও ক্যালিগ্রাফি শিখেছেন।উম্মে হানি বিনতে নুরুদ্দিন (মৃত্যু ৮৭১ হি.) তখন ৭ জন উস্তাদের কাছে শিখেছেন ৫০ এর অধিক কিতাব।আয়িশা বিনতে আল-যাইন (মৃত্যু ৮৮০ হি.) এবং সারা বিনতে উমার হামাবি (মৃত্যু ৮৫৫ হি.) বিনা পারিশ্রমিকে ছাত্র-ছাত্রীদের সেশান নিয়ে চলেছেন।শাইখা আসমা বিনতে কামাল (মৃত্যু ৯০৪ হি.) বিশেষভাবে মেয়েদের ক্লাস নিয়েছেন।হাদিসবিদ যাইনুশ শরিফ (মৃত্যু ১০৮৩ হি.) ও তাঁর বোন মুবারাকাহ মিলে মক্কার মতো জায়গায়, যেখানে হাদিসের সর্বোচ্চ পুরুষ প্রফেসর গিজ গিজ করতো সবসময়; সেখানে হাদিসের সর্বোচ্চ কিতাব বুখারি –সহ অন্যান্য বড়ো বড়ো কিতাব পড়িয়েছেন।

মক্কার ফকিহা কুরাইশ আল তাবারি শ্রেষ্ঠ ৭ জন হাদিসবিদদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি কুড়িয়ে নিয়েছেন পুরুষদের ডিঙিয়ে। মদিনার দীর্ঘজীবী শাইখা মুফতি ফাতিমা বিনতে শুকরুল্লাহ নিজ বাসায় পুরুষ-মহিলাদের লেকচার দিয়েছেন ৯০ বছর ধরে।সবচেয়ে চূড়ার সময়টা ছিলো ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম হিজরি শতক, এই তিনশো বছর। এই তিনশো বছর ছিলো খুবই জটিল ও কঠিন।

আর সে সময় ইউরোপে চলছে ক্যাথলিক সমর্থিত পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য এবং সেখানে চলছে নারীদের ব্যাপারে সেন্ট পলের ফতোয়া-
“I don’t permit a woman to teach or have authority over man… And Adam was not the one deceived it, it was the woman who deceived and became a sinner.”

আর এদিকে মুসলিম বিশ্বে-
তখন মদিনার মসজিদে উম্মুল খাইর ফাতিমা আর দামেশকের বনু উমাইয়া মসজিদে আয়িশা বিনতে আব্দুল হাদি সর্বোচ্চ ক্লাসে মুহাদ্দিসা হিসেবে হাদিসের শ্রেষ্ঠ কিতাব বুখারির দারস দিয়েছেন। আয়িশা বিনতে হাদিকে তো তাঁর সময়ের সর্বোচ্চ লেভেলের হাদিস স্পেশালিস্ট মনে করা হতো। দূর দূর থেকে ছাত্ররা আসতো তাঁর কাছে।

তখন একই ক্লাসে ১৪১ জন ছাত্র-ছাত্রীকে ‘তাবরানি শরিফ’ পড়িয়েছেন শাইখা যাইনাব বিনতে কামাল (মৃত্যু ৭৮০ হি.)।দামেশক ও কায়রোর মসজিদে মসজিদে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে সারাটা দিন ধরে বুখারি শরিফের ওপর লেকচার দিয়েছেন সিত্তুল উযারা বিনতে উমার তানূখি (মৃত্যু ৭১৬ হি.) এরকম আরও আছেন ফাতিমা বিনতে সাদ খাইর।ইস্পাহানে শাইখা ফাতিমা জুযদানি, দামেশকে আমিনা বিনতে মুহাম্মাদ পড়িয়েছেন নারী-পুরুষ শিক্ষার্থীদের।

মার্ভ শহরে কারিমা ৫ দিনে পুরো বুখারি পড়িয়েছেন খতিব বাগদাদিকে।সিত্তুল উজারা বিনতে মুনাজ্জা ইমাম যাহাবিকে পড়িয়েছন বুখারি আর মুসনাদে শাফিয়ি।শাইখ মুওয়াফফাক দীনের বাসায় বড়ো বড়ো ক্লাস হতো। সেখানে অধিকাংশই ছিলেন শিক্ষিকা। ২৪ জনের তালিকা পাওয়া গেছে, যারা নিয়মিত এখানে ক্লাস নিতেন।

ইমাম হাফিয ইবনু নাজ্জার ৪০০ নারী শিক্ষিকার কাছে, ইবনু আসাকির ৮০-এর অধিক, আবু সাদ সামানি ৬৯ জন, আবু তাহির সিলাফি ২০ –এর অধিক এবং ইবনুল জাওযি ৩ জন শিক্ষিকার নাম উল্লেখ করেছেন। ইবনুল আছির, ইবনুল সালাহ, জিয়াউদ্দিন মাকসিদি, আল-মুনযিরি সকলেই বহু সংখ্যক শিক্ষিকার অধীনে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।

ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ আল-মুনাজ্জা (মৃত্যু ৮০৩ হি.) ১৬৪টি কিতাবের লেকচার দিয়েছেন নিয়মিত।ইবনু হাজার আসকালানি ‘আদ-দুরার আল-কামিনাহ’ গ্রন্থে হিজরি ৮ম শতাব্দির ১৭০ জন প্রখ্যাত নারীর জীবনী উল্লেখ করেন, যাঁদের অধিকাংশই হাদিসবিদ ছিলেন। এর মধ্যে কয়েকজন ছিলেন প্রফেসর লেভেলের। যেমন- জুয়াইরিয়া বিনতে আহমদ। তিনি বড়ো বড়ো মাদরাসায় ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন।

বাগদাদে শুহদা বিনতে নাসর –এর ছাত্রদের ৫৯ জনের ছাত্রদের তালিকা এসেছে যাঁদের সবাই উঁচু উঁচু পদে আসীন হয়েছেন পরে; কেউ বিচারপতি, কেউ অধ্যক্ষ, কেউ গবেষক।

যাইনাব বিনতে মাক্কির ছাত্র ছিলেন আল-মিযযি, ইবনু তাইমিয়্যা, যাহাবি, বিরযালি সহ বিখ্যাত আরও অনেকে।হিজরি ৯ম শতাব্দির ১৩০ জন নারী বিশেষজ্ঞদের নাম এসেছে আব্দুল আযিয ইবনু উমার এর ‘মুজাম আল-শুয়ুখ’ গ্রন্থে।

১০২ জনের একটি তালিকা এসেছে যাঁদের সবাইকে সনদ দিয়েছেন শাইখা উম্মে মুহাম্মাদ যাইনাব মাকদিসি, এদের প্রায় সবাই পুরুষ। নিজ বাসায় ক্লাস নিতেন ফাতিমা বিনতে আলি, উম্মুল ফাখর জুমুয়া, উম্মুল ফিতইয়ান হান্তামাহ, ইবনু রুশাইদের উস্তাদা যাইনাব বিনতে আলাম, উম্মুল ফজল কারিমাহ –সহ অনেক শিক্ষিকা।

‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ শব্দটা ইউরোপের জন্য। মুসলিম বিশ্ব তখন ঝলমল করছে আলোক আভায়। মুসলিম নারী স্কলারদের জ্ঞানের প্রভা তখন সমগ্র বিশ্বকে করেছিলো স্নিগ্ধ আলোকিত।( তথ্যসূত্রঃAl-Muhaddithat, ড. শাইখ আকরাম নদভি )

যুদ্ধ বিগ্রহে মুসলিম নারীদের ক্যারিয়ারঃ
আয়িশা (রা.) ও উম্মে সালমা (রা.) ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মহানবি (স.)-এর ফুফু সুফিয়া বিনতে আবদিল মুত্তালিব (রা.) খায়বর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মুল খায়ের, জুরকা বিনতে আদি, ইকরামা বিনতে আতরাশ ও উম্মে সিনান অসংখ্য যুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক কাজে সহযোগিতা করেন। আজরা বিনতে হারিস বিন কালদা সেনাদলের নেতৃত্ব প্রদান ও আহলে বিসানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। উম্মে আম্মারা (রা.) ওহুদের যুদ্ধে মহানবি (স.)-এর জীবন রক্ষায় প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছিলেন। মহানবি (স.) তাঁকে ‘খাতুনে ওহুদ’ উপাধি দিয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম সামুদ্রিক অভিযানে প্রথম শাহাদাতবরণ করেন উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.)। উম্মে আতিয়া আনসারি (রা.) মহানবি (সা.)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।তিনি নিজ মুখে বলেন,”আমি রসূল (সা.) এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি,আমি সৈনিকদের জন্য খাদ্য তৈরি করতাম আর আহতদের ও রোগীর সেবায় থাকতাম”।(মুসলিম)

উমাইয়া বিনতে কায়েস কিফারিয়া খায়বর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মে হাকিম বিনতে হারিস রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মে আয়মন হাবশি (রা.) ওহুদ, হুনাইন, খায়বার ও মুতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মে সুলাইম (রা.) খায়বার ও হুনাইনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মে হারাম বিনতে মিলহান ইসলামের প্রথম নারী নৌযোদ্ধা। রাবি বিনতে মুয়াওয়াজ (রা.) বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। নাসিবাহ বিনতে কাব আনসারিয়া ওহুদ, বনি কুরাইজা, হুদায়বিয়া, খায়বার, হুনাইন ও ইয়ামার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। (সূত্র : তাবকাতে ইবনে সাদ : ৮/৪১৫; দালায়িলুন নবুওয়্যাহ : ২/৭১২)

শিক্ষা ও সমাজ গঠনে নারীদের অর্থায়নঃ

মধ্যযুগে ধনাঢ্য পরিবার থেকে আগত অনেক মুসলিম নারীই শিক্ষা ও বিজ্ঞান গবেষণায় অর্থায়ন করে ইসলামি সমাজ ও সভ্যতার উন্নয়নে অবদান রেখেছেন।খলিফা হারুন আল-রশিদের স্ত্রী যুবাইদা বিনতে জাফর ছিলেন তার সমকালীন ধনাঢ্য ও ক্ষমতাশালী নারী। বাগদাদ থেকে মক্কা যাওয়ার পথে পথিকদের সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য নাহরে যুবাইদা (যুবাইদা নহর) তারই তৈরি। শিক্ষার বিস্তারের জন্য মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও নির্মাণ করেন।

মরক্কোর ফেজের অধিবাসী ফাতিমা আল-ফিহরি ছিলেন আরেকজন বিত্তশালী নারী যিনি শিক্ষা বিস্তারে তার অর্থ ব্যয় করেন। বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় আল-কারউয়িন বিশ্ববিদ্যালয় তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন।

আলেপ্পোর আমির আল-জহির গাজীর স্ত্রী দাইফা খাতুন আলেপ্পোতে দুইটি বিখ্যাত স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম স্কুলটির নাম মাদরাসা আল-ফিরদাউস। এটি ইসলামি ধর্মতত্ত্ব ও ইসলামি আইনের শিক্ষা প্রদানের জন্য বিখ্যাত ছিলো। এছাড়া তার নির্মিত অপর স্কুলটি আইন ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা সংক্রান্ত জ্ঞান প্রদানের জন্য বিখ্যাত ছিলো।

সর্বশেষে বলা যায় ওসমানীয় সুলতান সুলাইমানের স্ত্রী হুররেম সুলতানের নাম, শিক্ষা বিস্তারের জন্য যিনি ইস্তানবুলে প্রতিষ্ঠা করেন হাসেকি কুল্লিয়েহ কমপ্লেক্স। একটি মসজিদ, কলেজ এবং লঙ্গরখানার সমন্বয়ে গঠিত পুরো কমপ্লেক্সটি। এছাড়া এখানে নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনায় গোসলখানা, হাসপাতাল এবং দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থানও রয়েছে এই কমপ্লেক্সে। এই কমপ্লেক্সটি নির্মাণ ছাড়াও তিনি মক্কা ও জেরুসালেম শহরে মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে অর্থ ব্যয় করেন। তাছাড়া আরো অগণিত মুসলিম নারীরা দু’ মুঠো ভরে উম্মাহর কল্যাণে অর্থ ঢেলে দেন। সারা জাহানে তারা অসংখ্য একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন।

রাজনীতিতে মুসলিম নারীদের ভূমিকাঃ

ইসলামি স্বর্ণযুগে রাজনীতিতে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিলো। তৎকালীন সময়ের রাজনীতিতে তারা বিভিন্ন মতামত পেশ করতেন এবং আইন প্রণয়ন ও সংশোধনের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারতেন।

হযরত উমর (রা.) এর শাসনামলের এরূপ অনেক নজির রয়েছে। উমর (রা.) এর শাহাদাতের পর নতুন খলিফা নির্বাচনের ব্যাপারে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) মহিলাদেরও পরামর্শ নিয়েছিলেন।

লেখকঃ কলাম লেখক

আরও পড়ুন