এক চক্ষুওয়ালা মা

।। ড. সালেহ মতীন।।

[গল্পটি আরো প্রায় ১৭/১৮ বছর পূর্বে আমি পেয়েছি। গল্পটি সত্য বলে দাবি করা হয়। এটি আধুনিক সভ্যতার একটি চিত্র বলেই আমি মনে করি]

আমার মায়ের শুধু একটা চোখ ছিল। আমি তাকে ঘৃণা করতাম। কারণ, তিনি ছিলেন কুৎসিত এবং আমার জন্য বেশ বিব্রতকর। আমার মা একটি ফ্লাই মার্কেটে ছোট একটি দোকান চালাতেন। তিনি সামান্য আগাছা এবং এই জাতীয় কিছু জিনিস বিক্রি করার জন্য সংগ্রহ করেছিলেন যা দিয়ে অনেক কষ্টে আমাদের সংসার চালানোর খরচটা উঠত।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন একদিন মা আমার বিদ্যালয়ে যান। আমার মনে আছে, সেদিন ছিল আমাদের ফিল্ড ডে। আমি খুবই বিব্রতবোধ করছিলাম, তিনি কীভাবে আমার সাথে এটি করতে পারেন? আমি তার দিকে একটি ঘৃণামাখা মুখভঙ্গি ছুড়ে দিয়ে দৌঁড়ে পালিয়ে যাই। পরের দিন স্কুলে আমার সহপাঠীরা আমাকে কটূক্তি করে বলেছিল, “তোমার মায়ের মাত্র একটাই চোখ আছে?” বন্ধুদের এ উপহাস আর কটূক্তি আমার কাছে খুব খারাপ লাগছিল।

আমি চেয়েছিলাম যে, আমার মা ঠিক এই পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে যাক। অনেকদিন ধরে আমি এটি ভাবছিলাম। তাই একদিন আমি আমার মাকে বললাম, “মা! তুমি এক চক্ষুওয়ালা! তোমার অন্য চোখটি নেই কেন? তুমি কেবল আমাকে হাসিখুশিতে রাখতে চেষ্টা করছ। কিন্তু তুমি মরছ না কেন?”

আমার মা কোন প্রতিক্রিয়া জানান না। আমি বুঝতে পারি এ কথা বলে আমি কিছুটা খারাপ অনুভব করছি। তবে একই সাথে এটি ভেবে ভাল লাগলো যে, আমি এই সময়ের মধ্যে যা বলতে চাই তা বলতে পেরেছিলাম। সম্ভবত এর কারণ এটি ছিল যে, আমার মা আমাকে শাস্তি দেননি। আবার কথাগুলো বলাতে আমার মনে হয়নি আমি তার অনুভূতিতে খারাপভাবে আঘাত করেছি।

ঐ রাতে আমি ঘুম থেকে জেগে এক গ্লাস পানি পান করতে রান্নাঘরে যাই। দেখি আমার মা সেখানে নিঃশব্দে কাঁদছেন। এমনভাবে কাঁদছিলেন যে, তিনি ভয়ে ছিলেন তাঁর কান্নায় আমি জেগে না যাই। আমি তার দিকে একবার মাত্র তাকাই, তারপর সেখান থেকে সরে যাই। কারণ, আমি তাকে যে কথাটি আগে বলেছিলাম সে জন্যই আমার হৃদয়ের কোণে কিছু একটা জমেছিল। তথাপি মায়ের প্রতি আমার ঘৃণা বহাল থাকে যিনি কিনা তাঁর এক চোখের জন্য নিরবে কাঁদছিলেন। আমি আমার নিজেকে বলেছিলাম যে, আমি বড় হয়ে সফল হব, কারণ আমি আমার একচক্ষুওয়ালা মা এবং আমাদের প্রচণ্ড দারিদ্র্যকে ঘৃণা করি।

তারপর আমি সত্যিই কঠিন পড়াশোনা আরম্ভ করি। এক পর্যায়ে আমি আমার মাকে ছেড়ে সিউলে এসে পড়াশোনা করতে থাকি। আমার কঠোর পরিশ্রম ও সমুন্নত আত্মবিশ্বাসের জন্য সিউল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার চাকরি হয়। তারপর, আমার বিয়ে হয়। আমার নিজের জন্য একটা সুন্দর বাড়ি কিনি। আমাদের সংসারে একটি সন্তানও আসে। এমতাবস্থায় আমি একজন সফল মানুষ হিসেবে সিউলে সুখে বসবাস করতে থাকি। আমি এ জায়গাটি পছন্দ করি। কারণ, এটি এমন একটি জায়গা যা আমাকে আমার মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয় না।

আমার সাফল্য ও সুখের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলছিল। এমতাবস্থায় অপ্রত্যাশিত কেউ একজন আমাকে দেখতে আসে। “কী?” “এটা কে?”
এটি আমার মমতাময়ী মা। এখনও যথারীতি তার একটি চোখ। আমার মনে হচ্ছিল, সহসা যেন পুরো আকাশটা আমার উপর ভেঙে পড়ল। আমাদের ছোট্ট মেয়েটি আমার মায়ের চোখ দেখে ভয়ে পালিয়ে গেল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কে? আমি তোমাকে চিনি না।” এমনভাবে বললাম যে, বিষয়টি যেন একেবারেই বাস্তব প্রমাণিত হয়। আমি তাকে দেখে চিৎকার করে বললাম, “তুমি আমার বাড়িতে এসে আমার মেয়েকে ভয দেখানোর সাহস কী করে পেলে? এখনি এখান থেকে চলে যাও!”

আমার দুঃখিনী মা চুপচাপ উত্তর দিয়েছিলেন, “ওহ, আমি খুব দুঃখিত। আমি হয়ত ভুল ঠিকানা পেয়েছি।” এবং তিনি সেখান থেকে চলে গেলেন, অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ওহ! শুভকামনা, ধন্যবাদ যে, তিনি আমাকে চিনতে পারেননি। আমি বেশ স্বস্তি পেয়েছিলাম।
অতঃপর একদিন আমার বাড়িতে একটি চিঠি এলো। সেটি ছিল আমার বিদ্যালয়ের পুনর্মিলনের চিঠি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, ঐ অনুষ্ঠানে আমি যোগ দিব। তবে বিষয়টি গোপন করে আমি আমার স্ত্রীকে মিথ্যা বললাম যে, আমি ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে যাচ্ছি। সময় মতো সিউল থেকে এসে বিদ্যালয়ের ঐ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে আমি যোগ দিই। প্রোগ্রাম শেষে পুরাতন স্মৃতিকে আমি কিছুতেই পাশ কাটাতে সক্ষম হতে পারিনি। পুরনো ঝাঁকুনিতে আমি কেঁপে উঠি, ভেতরে এসে ভিড় করল নানা প্রকৃতির কৌতূহলসমগ্র। শুধুমাত্র এগুলোর জন্যই আমি অতি পরিচিত বাড়িটিতে গেলাম। প্রতিবেশির কাছে জানতে পারলাম, আমার মা কয়েকদিন আগে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। প্রতিবেশি আমার হাতে একটি চিঠি দিয়ে বললেন, “এটি তোমাকে লেখা তোমার মায়ের চিঠি। তোমার কাছে পৌঁছাতে বলে গেছেন।” চিঠিতে তিনি লিখেছেন,
“আমার আদরের পুত্রধন!

আমার মনে হয় আমার জীবন এখন অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। আমি সব সময় তোমার কথা ভাবি। আমি আর কখনো সিউল সফর করব না। অতীব দুঃখিত যে, আমি তোমার বাড়িতে গিয়েছিলাম এবং তোমার আদরের সন্তানকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলাম। তবে কি একটা কথা জিজ্ঞাসা করা খুব বেশি অসঙ্গত হবে যে, তুমি কি একটি বার আমার সাথে দেখা করতে আসবে? বাবা! আমি সারাক্ষণ তোমার অভাব অনুভব করি। তোমাকে দেখতে খুব মন চায় বাবা।

যখন শুনেছি তুমি বিদ্যালয়ের পুনর্মিলনীতে আসছো তখন আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। তবে আমি স্কুলে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি দুঃখিত যে, আমার কেবল একটি চোখ রয়েছে যার জন্য তুমি বিব্রত অবস্থার মধ্যে পড়ো।

দেখো, শৈশবে তুমি খুব দুষ্টু ও দূরন্ত ছিলে। একদিন অসাবধানতায় তুমি একটি মারাত্মক দুর্ঘটনায পড়ো যাতে তোমাকে একটি চোখ হারাতে হয়। তোমাকে কেবল একটি চোখ দিয়েই দুনিয়া দেখতে হবে একজন মা হিসেবে সেটি আমি কোনভাবেই মেনে নিতে পারি না। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিই আমার একটি চোখ তোমাকে উপহার দিব। ডাক্তারকে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানালে তারা ব্যবস্থা করেন এবং আমার একটি চোখ নিয়ে তোমার হারানো চোখে প্রতিস্থাপন করেন।
তোমার জন্য আমি এত গর্বিত যে, তুমি আমার জন্য, আমার জায়গায এবং আমার চোখের সাথে পুরো নতুন পৃথিবীটা দেখছিলে। তোমার কোন কাজের জন্য কখনই তোমার প্রতি আমি বিরক্ত হইনি। দু’বার যে তুমি আমার উপর রাগ করেছ, আমি ভেবে নিয়েছিলাম এটার কারণ এই যে, তুমি আমাকে ভালবাসো। তুমি শৈশবে যখন আমার চারপাশে দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে আমি সেগুলি খুব মিস করি।
আমি তোমার অভাব অনুভব করি, আমি তোমায় ভালোবাসি। আমার কাছে তুমিই আমার পৃথিবী।
“তোমার মা”

আমি যেন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। আমার পৃথিবীটা প্রকম্পিত হয়ে উঠল। আমি কিনা তাকে ঘৃণা করে এসেছি যিনি কেবল আমার জন্যই বেঁচে ছিলেন। আমি আমার মায়ের জন্য চিৎকার করতে থাকি। আমার জানা ছিল না আমার এ গর্হিত কাজের জন্য মুক্তির পথ কী!

নীতি কথা: প্রতিবন্ধীদের তাদের অক্ষমতার জন্য কখনও ঘৃণা করতে নেই। আর পিতা-মাতাকে কোন অবস্থাতেই অসম্মান করা এবং তাঁদের ত্যাগ অস্বীকার করা উচিত নয়। তাঁরা আমাদের অস্তিত্ব, তাঁরা আমাদের উন্নত করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। এমনকি তাদের বন্য স্বপ্নেও তারা বাচ্চাদের পক্ষে কখনই অসুস্থ হতে চান না। তারা সর্বদা সন্তানদের সঠিক পথ প্রদর্শন করার এবং প্রেরণাদায়ক হওয়ার চেষ্টা করেন।

সন্তানদের জন্য পিতা-মাতা যা করেন তার প্রতিদান দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা যা করতে পারি তা হলো, তাঁদের যা প্রয়োজন তা সাধ্যমতো দেয়ার চেষ্টা করা এবং পর্যাপ্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় তাদের সিক্ত রাখা।

[ড. সালেহ মতীনের ‘বিবেক জাগানো গল্প’ গ্রন্থ অবলম্বনে]

আরও পড়ুন