কন্যা জায়া জননী

 

নারী বিষয়ে আমার এই লেখাটি বিশ্বের কততম লেখা তা যদি বের করতে বলা হয় তাহলে হয়ত আমরা অথৈ সমুদ্রে পড়বো আবার অতি উৎসাহিত কেউ কেউ হয়ত হালের সবচেয়ে “আবেদনময়ী” আবিস্কার ইন্টারনেটের কোন একটি সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বো। কিন্তু আমরা কখনোই ভাববো না যে কেন আমাদের বারবার নারীদের নিয়ে লেখতে হয় ? নারী উন্নয়ন নিয়ে লিখতে হয়? আবার এটাও ঠিক যে এতো লেখা লেখির পড়ও আমরা নারীকে দেখতে নারি, নারীর চলন খারাপ, নারীর বলন খারাপ, নারীর কাজও খারাপ। অথচ আমরা যদি ইন্টারনেটে সর্বাধিক সার্চকৃত বিষয়টি কি তা সার্চ করি সেখানেও কিন্তু নারীই এগিয়ে থাকবে। সত্যিকার অর্থে নারীরা কতটা এগিয়ে আছে তা আমরা জানিনা, আমিসহ আমরা যারা পুরুষ তারা যদি একটু ভেবে দেখি তাহলে অনায়াসে উপলব্ধি করবো যে নারী ছাড়া মানব জাতির অগ্রগতি অসম্ভব। পৃথিবীর কিছু মহান ব্যক্তি যারা নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দানে এতটুকু কুন্ঠিত হন নাই তাদের মধ্যে একজন আমাদের জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলাম যিনি অকপটে বলেছেন-

এ জগতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।

আমাদের সামনে এত অনুকরনীয় বিষয় থাকার পরও আমরা আজও পারিনি আমাদের মানসীকতাকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে যার দ্বারা আমরা বলতে পারি নারী আপনার আমার মতই একজন “মানুষ”। আমরা যতদিন না নিজেদের মানসীকতাকে প্রস্তুত করতে পারবো ততদিন যতই নারী নারী বলে মুখে ফেনা তুলে দিই না কেন নারীরা “আস্তাকুরেই” থেকে যাবে আর মাঝ থেকে নারীবাদী কিছু নারী-পুরুষ লুটে যাবে ফায়দা, যাদের কাছে নারী-পুরুষের সমতার চেয়ে বেশি প্রয়োজন “বিভেদ”। আমাদের মানসীকতা পরিবর্তনের জন্য কিছু টুকরো বিষয়ের অবতারনা করবো যা হয়তো আমাদেরকে কিছুটা ভাবনার খোরাক দিবে।

এ্যামাজনস্ থেকে মহিলা
আমাজন নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় থাকা অসীম শক্তিশালী তীরন্দাজ নারী দল যারা গ্রীক পুরানে এ্যমাজনস্ নামে পরিচিত। শৌর্য বীর্যে যে দলটি ছিল যে কারো কাছে মূর্তিমান আতংক। আবার অন্যদিকে মারাঠা রানী লক্ষিবাই যিনি “ঝাসি কি রানী” নামেই অধিক পরিচিত কিংবা বলা যায় মুসলিম রানী রাজিয়া সুলতানার কথা যারা প্রয়োজনে তরবারী হাতে করেছে যুদ্ধ। ইতিহাস বলে, আজ যে নারী রান্না ঘরে বটি হাতে তরকারি কাটাকে শিল্পের রূপ দিয়ে সংসারের পুরুষদের চিত্ত জয়ে সদা মুন্সিআনা দেখিয়ে চলেছে সেই নারী একদিন তরবারী হাতে করেছে রাজ্য শাসন, করেছে যুদ্ধ। আর এই পরাক্রমশালী নারীকে একদল অতি চতুর লোক ‘মহলে’ নিয়ে এসে আনন্দ ফুর্তির উপকরনে পরিনত করে নাম দিয়েছে ‘মহিলা’। এ মহিলা আজ কোথায় নেই বাসে, ট্রামে, লঞ্চে সব যায়গায়, যেখানে নির্দিষ্ট একটি স্থানের লিঙ্গ পরিবর্তন করে নাম দেওয়া হয়েছে মহিলা। সবচেয়ে বেশি লজ্জিত হই তখন যখন দেখি অফিস-আদালত এবং জনবহুল স্থানের টয়লেট গুলির লিঙ্গ পরিবর্তিত হয়ে ‘মহিলা’ হয়ে যায় অথচ তাদের শারীরিক কোন পরিবর্তন চোখে পড়ে না। পাশের ‘পুরুষ’ টয়লেটটির সঙ্গে ‘মহিলা’ টয়লেটটির কোনই পার্থক্য নেই। অথচ আমরা সবাই জানি প্রকৃতিগত বা শরীরবৃত্তিয় কারনে নারীদের জন্য নির্ধারিত টয়লেটে থাকতে হবে নির্ধারিত কিছু সুবিধা। আর তা যদি রাখতে না পারি তবে প্রয়োজন নেই এ প্রহসনের, প্রয়োজন নেই টয়লেটের লিঙ্গ পরিবর্তনের। নারীরা ঠিকই একদিন তাদের অধিকার নিজেরাই আদায় করে নিবে স্থানে অস্থানে লেবেল লাগানোর প্রয়োজন নেই। এ্যামাজনস্, লক্ষি বাই, রাজিয়া সুলতানা অথবা হালের প্রধানমšী¿ বা বিরোধিদলীয় নেত্রী,এভাবেই নারীরা বারবার এগিয়ে এসেছে সামনে, শুধু সন্তান নয় জন্ম দিয়েছে নতুন নতুন ইতিহাসের। এ পৃথিবী বারবার লালন করেছে নারী বিজয়; সংরক্ষন করেছে নারী ঐতিহ্য।

….. না শোনে ধর্মের কাহিনি
জীবনের সকল ক্ষেত্রে আলো-বাতাসের পরেই যে বিষয়টি আমাদের সঙ্গে অতোপ্রতভাবে জড়িত তা হলো ধর্ম। যার কারনে এই ধর্ম নিয়ে রয়েছে নানাবিধ মতবাদ, একদল বলে আমরা ধর্ম মানিনা একদল বলে মানি, কিন্তু ভয়ংকর হচ্ছে সেই দলটি যারা এই দুয়ের মাঝামাঝিতে অবস্থান করছে। আমার মনে হয় আজ পর্যন্ত এ পৃথিবীতে যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে তার সবগুলোতেই কোন না কোনভাবে ধর্ম জড়িত হয়েছে। বর্তমান নারী আন্দোলন আজ আবারও হুমকির মুখে পড়েছে ধর্মের কারনে। ধার্মীক পরিবারে ধর্মীয় আবহে বেড়ে ওঠার পরও আমি খুব লজ্জিত যে ধর্ম সম্পর্কে খুব অল্পই জানি, তারপরও আমি আমার ধর্মীয় কিছু চিন্তাধারা ব্যক্ত করবো যা শুধু আমার ব্যক্তিগত ধারনা। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আব্বা বলতেন আকাশে তাকিয়ে তারা দিয়ে তুমি যেমন তোমার নিজের ছবি আঁকতে অথবা নাম লিখতে পারবে তেমনি পারবে আঁকতে কোন কুৎসিত ছবি অথবা লিখতে পারবে কোন গালি, তুমি যেমন মনে করবে ঠিক তেমনই হবে। আজ নারী আর ধর্মীয় গ্রন্থের মুখোমুখি অবস্থান দেখে আব্বার কথা মনে পড়ে যায়। এরা এদের ইচ্ছামত নারী পুরুষের বিষয়টাকে সাজিয়ে নিচ্ছে। একদল নারী-পুরুষ বলছে জাত-ধর্ম সব গেল আরেকদল নারী-পুরুষ কে কি বিরূপ মন্তব্য করলো এবং তাদের ছিদ্রান্বেষনে ব্যস্ত। আর এই দুই দলের চাপাচাপিতে নারী হারাচ্ছে তার স্বক্বীয়তা আর কিছু বোকা পুরুষ করছে রাজত্ব। আমি একটি বিষয় বুঝিনা পুরুষরা কেন বোঝেনা নারী এগিয়ে আসলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পুরুষই পাবে। উনবিংশ শতাব্দিতে শাখাওয়াত সাহেব যেটা বুঝতে পেরেছিলেন আমরা একবিংশ শতাব্দির মানুষ আজও সেটা বুঝলামনা, যদি বুঝতাম তাহলে আজ প্রতি ঘরে একজন করে বেগম রোকেয়া জন্ম নিত। হালের বিভিন্ন ঘটনার দিকে তাকালে দেখতে পাই যে কিছু ধার্মীক নাম ধারি লোক ধর্মের দোহাই দিয়ে সমাজের ক্ষত সারানোর দিকে কোন মন নেই তারা রণ সাজে সজ্জিত হয়ে একটি কথাই বলছেন নারীদের “না” বলুন। আমি আস্তিক-নাস্তিকসহ সকল মতবাদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বলছি জগতের চিরন্তন নিয়ম অনুযায়ী আলো যেখানে ঢোকে সেখানে অন্ধকার থাকে না, আপনাদের অন্ধকার পৃথিবীর আকাশে সূর্যদয়ের সময় আসন্ন।

তবে কার লাগি মিথ্যা এ সজ্জা…..
উপরোল্লিখিত জনপ্রিয় রবীন্দ্র সংগিতের কথাগুলি পড়লেই মনের আয়নায় ভেসে ওঠে একজন সুসজ্জিত নারীর মুখ যে কিনা বন্ধু মিলনে ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করছে। এইতো প্রেমের চিরন্তন মধুর ব্যথা ‘অপেক্ষা’, প্রেম করেছেন অথচ প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা করেন নাই এমন জুটি বিরল। আবার গল্প উপন্যাসে প্রিয়তমের জন্য একজন নারীর সাজ সজ্জার কথা বারবার আসলেও পুরুষের সজ্জার কথা তেমনভাবে চোখে পড়ে না। কিন্তু টিভি খুললেই পণ্যের বিজ্ঞাপনে দেখা যায় একজন পুরুষ নারীর সঙ্গে সমান তালে ব্যস্ত তার সজ্জা নিয়ে। সজ্জা নিয়ে কথা বলতে শুরু করলে তা এই অল্প পরিসরে বলা সম্ভব নয় এর ব্যাপকতা এতই বেশি যে হালে কিছু টিভি চ্যানেল ২৪ ঘন্টা অবিরতভাবে শুধু সাজ-সজ্জার কথাই বলে যাচ্ছে। এর ব্যতিক্রমও আছে ২৪ ঘন্টার অনুষ্ঠান শুধুমাত্র পোশাকহীন পশুদের নিয়েও হচ্ছে। থাক সে কথা, প্রসঙ্গে ফিরে আসি, আমাদের এই উপমহাদেশের পরিস্থিতিতে দেখা যায় যে মেয়েদের পোশাক নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়, কোনটা শ্লীল আর কোনটা অশ্লীল। একজন মেয়ে ছোট পোশাক পড়লে সেটি অশ্লীল কিন্তু সালমান বা শোয়ার্জনেগার যখন খালি গায়ে সিনেমার পর্দায় হাজির হন তখন সেটি “গধহষু”। “গধহষু”-র কি কোন স্ত্রী লিঙ্গ আছে? থাকলেও তা ব্যবহৃত হয় না, তবে সাম্প্রতিক কালে নারী পুরুষ হবার খেলায় মেতেছে, কিছুদিন আগে রাজশাহীর একটি উপজেলায় পেশাগত কারনে যাই, শুনলাম সেখানের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একজন নারী। একথা শুনে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল; গেলাম তার সঙ্গে দেখা করতে তিনি আমার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ে যা বললেন তা হলো, আমাকে ‘স্যার’ বলবেন কারন আপনারা সম্মান দিবেন আমার চেয়ারকে, একজন প্রথম শ্রেনীর কর্মকর্তার সঙ্গে সঙ্গত কারনেই তর্কে যেতে পারলাম না তবে বলতে খুব ইচ্ছা করছিল “বেচারা চেয়ারটাকে অবলা পেয়ে তার লিঙ্গ পরিবর্তন করাটা কি খুব জরুরী ছিল ‘স্যার’?” আমার মনে হয় নারী থেকেই নারী অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়া উচিত, পরিবারের সকল দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা নারীর আছে তাই বলে তাকে ‘বাবা’ বলে ডাকলেই যে তার ক্ষমতায়ন হবে এটি ঠিক নয়। গধংপঁষরহরঃু আমাদের পুরুষদের একটি বড় সমস্যা, এটিকে আরও জাগ্রত করার প্রচেষ্টাই যেন সকল ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। পোশাক প্রসঙ্গেও একই কথা বলতে চাই ছোট পোশাক বা খালি গায়ে নারী পুরুষ উভয়েই দৃষ্টিকটু।
এতক্ষণ যা আলোচনা করা হলো তা হয়ত মনের খোরাক হতে পারে তবে ‘মন’ কে আমরা কতটুকু বুঝি? আমরা কি আমাদের মনকে লালন করি, আমরা কি মন-মানসীকতা নিয়ে ভাবি? একটা সময় ছিল যখন গুরুজনকে শ্রদ্ধা করা, সালাম দেওয়া অথবা প্রতিবেশীর বিপদে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পারিবারিকভাবে শিক্ষা দেওয়া হতো। পাড়ার কোন ছেলে কোন অন্যায় করলে তাকে শাসন করার পূর্ণ অধিকার ছিল পাড়ার বয়জেষ্ঠদের, বড়দের সামনে সিগারেট খাওয়া ছিল পুরোপুরি নিষিদ্ধ, বড়দের দেখলে ছেলে-মেয়ে উভয়েই হতো শ্রদ্ধাবনত….. কিন্তু আজ এগুলো রূপকথা। কোথায় আমাদের সেই মূল্যবোধ? আজ আমাদের সকলের উচিত একযোগে মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করার একমাত্র মূল্যবোধের পূণরোদ্ধারই পারে সমাজে সকল বিভেদ দূর করতে। মূল্যবোধ জাগ্রত হলে আমরা ভাবতে শিখবো একজন নারী কখনও আমার কন্যা, কখনও আমার জায়া আবার কখনও আমার জননী। সব শেষে একটি গল্প বলি-
একজন অসুস্থ নারীর ঘরে একজন ডাক্তার নক করলেন এবং তার অনুমতি সাপেক্ষে ঘরে ঢুকলেন এবং রোগিকে বললেন “আপা আপনাকে আপনার পোশাক খুলতে হবে আমি কিছু পরীক্ষা করবো”। মেয়েটি উত্তরে বললেন “আপনিতো জানেন আমাকে আপনার সামনে পোশাক খুলতেই হবে, তাহলে ‘নক’ করে ঢোকার কী দরকার ছিল?”
আপনাদের সবার কাছে এই প্রশ্ন রেখে আমি আমার লেখা শেষ করছি “দরজায় নক করার কি দরকার ছিল?

লেখকঃ মহঃ গোলাম জাকির হোসেন বিটন,  কলামিস্ট।

আরও পড়ুন