কালো মেয়েরা যেভাবে বৈষম্যের শিকার!

শেখ সাফওয়ানা জেরিন

খবর বের হলো রহিমের ঘরে একটা কালো বাচ্চা হয়েছে। সেই খবর এক কান দুই কান করতে করতে পাড়া-মহলা রাষ্ট্র হয়ে দাড়ালো রহিমের ঘরে একটা কাক জন্ম নিয়েছে।
কালোদের জন্য কাক বা পাতিলের তলার বিশেষন নতুন কিছুনা। অনেকে আবার কোন কারণে কালো মেয়ে বিয়ে করে ফেললেও তাকে সান্তনা দেওয়ার জন্য আমাদের প্রবাদ ভান্ডার হাজির- “নদীর জল ঘোলা ভালো/ জাতের মেয়ে কালোও ভালো।” কিন্ত এই রকম সান্ত্বনা দেওয়া অনেক মানুষই সুযোগ পেলে যার জন্য কালো মেয়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছেন তাকে দোষ দেন- মন মতো বউ পেলাম নাহ!

একবার তুরস্ক থেকে আসার সময় আমার বন্ধু ফুরকান আমাকে এয়ারপোর্টে দিয়ে যেতে এসেছিল। এক বাংলাদেশীর সাথে দেখা সেখানে, উনি আমাকে বললেন – আপনার সাথে এই ছেলে তো বাংলাদেশী না, বাংলাদেশী মানুষ তো এতো সুন্দর হয় না, সব কালাছালা! কথাটা শুনে আমি কিছুক্ষণ তার চেহারা দর্শন করেছিলাম।

আরেকবার ভরা মজলিসে বোনকে দেখতে আসা পরিবারের এক মুরুব্বি আমাকে হাসতে হাসতে বললেন- তোমরা একই মায়ের পেটের বোন, একজন ফর্সা একজন কালো কেন? তুমি কী তোমার নানার মতো হয়েছো? আমার নানা একজন বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ এবং প্রফেসর ছিলেন। আমি তাকে উত্তরে বলেছিলাম- দেখতে আমি কেমন তা আমার হাতে না, কিন্ত আমি সবসময় নানার মতো হতেই চেষ্টা করি।

একদিন আমার এক বন্ধু যে নিজেকে মানবধর্মে খাদেম মনে করতো সেও তর্ক করেছিল যে চাকুরী ক্ষেত্রে সবাই এক সার্টিফিকেটের অধিকারী, সুতরাং গুড লুকিং বা দেখতে এক্সট্রা অর্ডিনারীকে চাকুরীতে নেওয়াটা কোন অন্যায় নয়, এমপ্লোয়্যার সাদা চামড়াকে প্রায়োরিটি দিতেই পারে, কোম্পানির সুনামের জন্য।

আমি সেদিন ফেয়ার এ্যান্ড লাভলির সাদা হয়ে আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান মেয়ের চাকুরী করে নিজের পায়ে দাড়ানোর বিজ্ঞাপনের কথা মনে করেছিলাম, ভুল কিছু বলে না বিজ্ঞাপন।মানুষ এভাবেই ভাবে, বিজ্ঞাপন আপামর জনতার চাহিদাকেই রিপ্রেজেন্ট করে।

আপনারা যারা ব্ল্যাকলাইভস ম্যাটার বলেন একটু বুকে হাত দিয়ে বলেন আপনারা আসলেই মনে করেন যে আমাদের দেশের কালো মানুষেরা কোনো বৈষম্যের শিকার না? এ কোন ইউটোপিয়ায় আপনারা বাস করেন আমাকে একটু বলবেন প্লিজ, এটা আর যাই হোক বাংলাদেশ না।
একবার আমেরিকান এক বাংলাদেশির সাথে পরিচয় হয়েছিল একটা কনফারেন্সে। ওনার টপিক ছিল রেসিজম। ওনার পেপারের পর ওনার সাথে কথা হলে উনি বললেন- “বাংলাদেশে কালো মানুষ বিশেষত মেয়েরা অক্সফোর্ড হাভার্ডে পড়লেও তার পরিচয়টা কালো হিসেবেই থাকে। তাই আমি পিউর সাদা বিয়ে করেছি,দেশে গেলে মানুষ বউ দেখতে ভীড় জমায়। আমার বউকে কেউ কম সাদা বা উজ্জল শ্যামলাও বলতে পারে না।”উনি নিজে একজন আমেরিকান বিয়ে করেছেন,বাস্তবতার গুরুত্ব অনুধাবন করে এটাই আমাকে বুঝালেন।

আমাকে ছোটবেলা একজন প্রতি মুহুর্তে কালো কালো বলতো এবং আমার কখনো বিয়ে হবে না এটাও বলতো। এখন সেই বড় বর্ণবাদ বিরোধী!

ভার্সিটিতে পড়াকালীন অবস্থায় এক প্রফেসর আমাকে বলেছিলেন –“তুমি বাংলায় কথা না বললে আমি হয়তো ভেবে বসতাম তুমি সোমালিয়া থেকে এসেছো!” এটা বলে উনি বেশ একচোট হেসেছিলেন, বিশাল এক জোক বলেছেন যেন!

আমরা দুই বোন ছোট বোনের গায়ের রং দুধে আলতা । এই দুই বোনকে টিচাররা বলতো একজন উত্তর মেরুর বাসিন্দা তো আরেকজন দক্ষিণ মেরুর। আমি সব পরীক্ষায় ফার্স্ট হতাম, আর উনি তার কাছেধারে ছিলেন না। সারাদিন সেন্টু গেঞ্জি পড়ে পাড়া বেড়াতো ছোট বোনটা, যখন আমি চুপচাপ এক কোণায় বই পড়তাম।

কিন্ত তারপরেও যে কোন বিচার আচারে মা’কে আমার সবসময় বোনের প্রতি বেশি সদয় মনে হয়েছে। মা’কে আমি দোষ দেই না, এরকম হিডেন বর্ণবাদ আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। আমি মায়ের প্রথম সন্তান হিসাবে মেয়ে যেখানে প্রতিটি মা চায় ছেলে হোক ; তার উপরে কালো !এখন বসে বসে কল্পনা করি আমার মা’কে আমার জন্মের পর না জানি কতো কথা শুনতে হয়েছে।

আপনারা বলেন আমাদের সমাজে কোনো বর্ণবাদ নাই, ওটা আমেরিকান আইটেম। নিজের বুকের উপর হাত রেখে বলেন তো পাশের বাড়ির নতুন বউ দেখে এসে সবার প্রথম আপনি কী বলেন না তো- বউটা খুবই সুন্দর বা বউটা দেখতে ভালো না, কালো?

গ্রামের লোক আবার এক কাঠি সরস। দলেদলে মানুষ আসবে বউ দেখবে আর নতুন বউয়ের সামনেই বলবে-“এ্যামা বউ দেহি কালা!” বলেন এটা কী খুব বিরল উদাহরণ?
যারা ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে কালো মেয়ে বা ছেলে বিয়ে করতে চান না, আপনার ব্যক্তিগত পছন্দকে একটু বের করে মুখোমুখি বসান এবং জিজ্ঞেস করে দেখুন এই ব্যক্তিগত পছন্দ ফেয়ার এ্যান্ড লাভলীর বর্ণবাদী বিজ্ঞাপন দেখে শেইপিং নিয়েছে কিনা, অথবা বলিউডের নায়িকাদের সাদা চামড়া, পুরু মেকাপে বিমোহিত হয়ে কিনা? কিংবা পাশের বাসার বউ দেখে এসে মা যখন বলেছে বউ কালো তখন মনে হয়েছে কিনা যে আমাকে ফর্সা মেয়ে বিয়ে করতেই হবে যেন কেউ ওই মেয়ের সাথে সাথে আমাকে অন্তত ছোট না করে! নাকি ইংরেজ আমলে সাদা চামড়ার প্রতি মুগ্ধতা বা হোয়াইট সুপ্রেমেসি আপনাকে প্রভাবিত করায় আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ চামড়ার রং কেন্দ্রিক?
আপনি যেটাকে ব্যক্তিগত পছন্দ বলে থাকেন এটা আসলে প্রবৃত্তির তাড়না কিনা, এটাকে শাসন করার দরকার আছে কিনা ভেবে দেখুন…..

বাংলাদেশে কালোরা একদম ফর্সা চামড়ার মানুষের মতো সমান সুযোগ সুবিধা কখনোই পায় না, আমার মতো এই কথাটা প্রতিটি শ্যামলা উজ্জল শ্যামলা বা কালো মানুষ জানে। অথচ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব এভাবে চামড়ার রং দিয়ে মাপার কথা ছিল না……..

লেখকঃ পিএইচডি গবেষক,হ্যাসেটটাইপ বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্ক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী

 

আরও পড়ুন