কী করি কেন করি

আয়েশা সিদ্দিকা

কিছুই করি না। মানে বাইরে কোন জব/বিজনেস কিছু করি না শুনে এক সপ্তাহ আগে হাসবেন্ডের এক কলিগ বলেই বসলেন- “যদি ঘরে থেকে শুধু বাচ্চাই সামলাবেন তাহলে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার কি দরকার ছিল? একদিন ঠিকই আফসোস করবেন ভাবী, ওরা বড় হলে আপনি ডিপ্রেশনে ভুগবেন।”

কারো জন্য না, আমি নিজে ডিসিশন নিয়েছি আমি ঘর সামলাবো। ঘর গুছাবো, রান্না করবো , সংসার সামলাবো, বাচ্চাদের সাথে থাকবো । ঘরের কাজে কি কম কষ্ট, কম পরিশ্রম?

আমার আব্বু আর আমার শ্বশুর আব্বা খুব রাগ হতেন আমার উপর। অনেকবার বলেছেন কিছু করার জন্য, “শিক্ষিত বাবুর্চি” উপাধি ও শুনেছি , কিন্তু আমি আমার কাছে ক্লিয়ার ছিলাম কেন আমি ঘর বেছে নিয়েছি।

আমার বাচ্চারা আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি। আমি যদি বাইরে যেতাম তবে ওদেরকে কে দেখতো? ওদের বাবা? আমার তিন বাচ্চার বাপের ফুল টাইম ডিউটি। যে মানুষটার নিজের নাওয়া খাওয়ার টাইম ঠিক থাকে না, তার উপর তিনটা বাচ্চার দায়িত্ব কিভাবে চাপাবো? চাপিয়ে দেইনি বলেই অফিস থেকে ফিরে যতটুকু সম্ভব বাচ্চাদের সাথে খেলা করা । সময় পেলে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া – এগুলো সে এন্জয় করে আলহামদুলিল্লাহ্ ।

তাহলে আর কে আছে? নানা-নানী, দাদা-দাদী ? আমার বাচ্চাদেরকে সময় দেয়া , ওদের দেখাশোনা, খাওয়া দাওয়া, সবকিছু সামলানো – এগুলো আমার দায়িত্ব, বাচ্চাদের নানা-নানী, দাদা-দাদী ইনাদের না। আমার বা আমার হাসবেন্ডের আব্বু- আম্মু ইনারা কষ্ট করে আমাদের পিছনে জীবনের সবটুকু শ্রম দিয়েছেন । এখন একটু আরাম করার বয়স , এখন কেন উনারা আমার বাচ্চার পিছনে কষ্ট করবে? উনারা মন চাইলে করবে, শরীর ভালো লাগলে করবে , তাই বলে উনাদের উপর দায়িত্ব হিসেবে চাপিয়ে দিতে চাইনি। এতে তাদের আদর টা কিন্তু বাচ্চারা বেশিই পায়।

তাহলে কার কাছে রেখে যেতাম – সাহায্যকারী? আমি যেভাবে বাচ্চাকে দেখাশোনা করবো , ম্যানার্স শেখাবো; আর উনারা যেভাবে দেখাশোনা করবেন – দুটো কি কোনদিক থেকে কখনও এক হবে?

ওরা নিজেরা নিজেদের ভালো থাকার জন্যই হাইজিন মেইনটেইন করে না, সেখানে আমার বাচ্চাদের জন্য সে করবে আমার চোখের আড়ালে – এটা বিশ্বাস করি না।

আর আফসোস ? আমার স্কুল-কলেজের ডাক্তার বা ম্যাজিস্ট্রেট অথবা ভার্সিটির ইন্জিনিয়ার ফ্রেন্ডসদের দেখলে একটু ও আফসোস বা হিংসা বা মন খারাপ হয় না। ওরা ওদের জীবন নিয়ে সুখী, আমি আমার জীবন নিয়ে সুখী আলহামদুলিল্লাহ্ ।

আগে এমন ছিলাম না । দ্বীন পাওয়ার পর বুঝি আমার তাকদিরে আমার রিজিকে যতটুকু আছে , আমি ততটুকুই পাবো, আমার রিজিক কেউ নিতে পারবে না। যতটুকু পাচ্ছি এর মধ্যেই আমার জন্য কল্যাণ, এর মধ্যেই আমার শান্তি । দ্বীন পাওয়ার পর বুঝি অন্যের ভালো দেখে হিংসা বা ঈর্ষা শয়তানের ওয়াসওয়াসা, যা আমাদের অন্তর পুড়িয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট, শান্তি নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট । ছোটবেলা থেকেই অল্পে তুষ্ট টাইপ ছিলাম তাই বড় হয়ে অনেক টাকা কামিয়ে নিজের শখ আল্লাদ পূরণ করতে হবে – এমন মনে হয়নি কখনও । বরং নিজের সাথে বাচ্চাদেরকেও এখন শেখাই – অল্প অল্প করে নিজের ছোট্ট একটা শখ বাচিয়ে কিভাবে অন্য মানুষের একটা ছোট্ট অভাব পূরণের মধ্যে শান্তি পাওয়া যায় ।

আর বাচ্চারা আল্লাহ্’র দেয়া আমানত । ওদেরকে কেমন তরবিয়ত দিচ্ছি, কি শেখাচ্ছি – তার জন্য আল্লাহ্ সুবহানু তায়ালা আমাকে জিজ্ঞেস করবেন। এত বড় দায়িত্বের পূর্ণ হিসাব দিতে হবে।

আর ডিপ্রেশন? বাচ্চা হবার আগে একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করেছি। খাবার খেতে খেতে অথবা রাতে ঘুমানোর আগে গল্প বলে বলে শেখাই দুনিয়াতে আসার আসল কারণ। এখন ওদেরকে পড়তে দিয়ে আমিও দ্বীনি বিষয়ক পড়াশোনা করার চেষ্টা করি ।কিন্তু সেটার সুযোগ খুবই কম। তাই ওরা একটু বড় হয়ে নিজের পড়াশোনা নিয়ে বেশি ব্যস্ত হলেই বরং আমি নিজের ঈমান ইলম আর আমলের জন্য আরো বেশি সময় দিতে পারবো ইন শা আল্লাহ্ ।

আর আমি কি বিনা পারিশ্রমিকে করছি এসব? আমার প্রতি একটা মুহূর্ত, প্রতি একটা দিন , প্রতি একটা ঘন্টার জন্য পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ্ সুবহানু তায়ালার কাছ থেকে গুনে গুনে প্রতিদান নিতে চাই।আমার বাচ্চা কাচ্চা না থাকলেও আমি বাইরে কিছু করতাম না , ঘরকেই বেছে নিতাম। কারণ – আমি “রব্বাতুল বাইত” মানে ঘরের রানী।

সেই ঘরে থাকা মানে ইউজলেস। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি না করলে পড়াশোনা করারই দরকার নেই? ঘরের মানুষ গুলোর সেবা করা, তাদের জন্য রান্না করা , নিজের প্রশান্তির জন্য ঘর গোছানো- এটা আমার পছন্দ, আমার স্বাধীনতা । তাই আইডেন্টিটি ক্রাইসিসেও ভুগি না।

আমরা বাইরে কাজ করা এক নারীকে সম্মান করতে যেয়ে ঘরে শ্রম দেয়া আরেক নারীকে অসম্মান করছি। নারীকে সম্মান করতে যেয়ে আমাদের প্রিয় বাবা, ভাই ও স্বামীকে অপমান করতে ছাড়ছি না। একটা সমাজে নারী পুরুষ কেউ কাউকে ছাড়া কিভাবে টিকবে?

আরও পড়ুন