নারীকে কি শষ্যক্ষেত্র বলা হলো!

সা জি দ

এই ক’দিন হলো ইউশা ভার্সিটিতে শিক্ষকতা পেয়েছে। ভার্সিটিতে দাঁড়ি টুপিঅলা শিক্ষক, খুব সহজ ছিলো না। কিন্তু সে সাকসেস হয়েছে। অনেক কিছুর পরই এখানে আসতে পেরেছে। আসলে ভালো পড়ালেখার চেয়ে ভালো পোশাক আর ভালো অর্থবিত্তের দামটা কড়া। যে কারণে এতোটা সময়, শ্রম দিতে হয়েছে। তবে তার ভালো যোগ্যতায় কোন প্রশ্ন নেই।

আজ তাঁর প্রথম ক্লাস। একজন দাঁড়ি টুপিঅলা শিক্ষক দেখে ছাত্রছাত্রীরা যেন অবাক হলো। কেউ আবার মজা করে সালাম দিলো। ইউশা জানে তাকে অনেক প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। এতদিন প্রশ্ন শুনেছে নিজ সহপাঠীদের থেকে, এখন শুনতে হবে ছাত্রদের মুখে। সমস্যা কই! সেই তো একই প্রশ্ন। আচ্ছা! এদের বুঝানো কি আদৌ সম্ভব হবে? একসাথে সকলেই উঠে পড়ে লাগবে। একজন প্রশ্ন শুরু করলে, যার বিশ্বাস আছে সেও লেগে পড়বে। আচ্ছা যাইহোক প্রশ্ন করলেই পরে দেখা যাবে।

—স্যার! আপনি যে ধর্ম মেনে দাঁড়ি টুপি পরে ক্লাস করতে আসছেস, সেই ধর্ম কি কোন নৈতিকতার শিক্ষা দেয়? না শুধু সন্ত্রাস, নারীর অধিকার হরন শিক্ষা দেয়? জনৈক নারীবাদী ছাত্রের প্রশ্ন।
—ইসলাম কখনো সন্ত্রাসের শিক্ষা দেয় না। নারীর অধিকার হরন তো দূরে থাক।
—স্যার! কথাটা কেমন পাগলের প্রলেপ হয়ে গেলো না? যেখানে নারীদেরকে শষ্যক্ষেতের সাথে তুলনা করা হয়, সেখানে নারীর সম্মান কিভাবে? কিছুটা ঠাট্টার সুরে।
—তুমি সূরা বাক্বারার ২২৩নম্বর আয়াতের কথা বলছো কি?
—হবে হয়তো। আমি জানি না কোথায়। কিন্তু আছে নিশ্চিত।
—আচ্ছা তুমি কি জানো কোরআন শরিফের প্রত্যেকটি আয়াত নাজিল হওয়ার পিছনে একটি করে কারণ আছে। যাকে বলা হয় ‘শানে নুযূল।’ এরকম এই আয়াতটির পিছনে একটি ‘শানে নুযূল’ আছে। আর তুমি কি সেই শানে নুযূলটা জানো?

প্রত্যেক আয়াতের আলোচনার পূর্বে জরুরী হবে সেই ‘শানে নুযূল’ জানা। তাহলে এই আয়াতের ‘শানে নুযূল’ জানা যাক। তাহলে সহজ হবে বিষয়টা বুঝতে। এই আয়াতের শানে নুযূল এরকম,

হযরত জাবের রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, ইহুদিরা বলতো, মহিলাদের উপুড় করে সহবাস করলে ট্যারা সন্তান হয়।হযরত ওমর রাদিআল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি তো ধ্বংস হয়ে গেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্ন করলেন কেন কি করেছো? তিনি বললেন, রাতে আমার বাহনকে উল্টা করে দিয়েছি।
এটা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু বললেন না। অতঃপর এই আয়াত নাযিল হয়।অর্থাৎ একজন কৃষক যেভাবে তার ইচ্ছেমত তার শষ্যক্ষেতে ফসল উৎপাদন করতে পারে। চাই সে লম্বালম্বি চাষ করুক। বা বাঁকা করে করুক। আর সোজা করে সোজা করুল। এমনিভাবে পুরুষ চায় উপুড় করে সহবাস করুক। বা চিৎ করে করুক। তার দ্বারা ট্যারা সন্তান হবে না। তবে আল্লাহর দেওয়া বিধান (সামনের রাস্তায়) অনুযায়ী করো।

ক্লাসে ছেলে শিক্ষার্থীদের সাথে সাথে মেয়েরাও রয়েছে। এটা যেন তাঁদের লজ্জাকে দিগুণ করে দিলো। প্রায় সবারই মাথা নিচু হয়ে গেলো। ছেলেরাও একজন আরেকজনের দিকে তাকাতাকি করছিলো। ইউশা তাঁর মতো বলে যেতে লাগলো।

—আরেকটা বিষয় দেখো! এখানে বলা হচ্ছে, তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র। অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করিতে পারো। তোমরা তোমাদের ভবিষ্যতের জন্য কিছু করিও এবং আল্লাহকে ভয় করো।
সূরা বাক্বারা আয়াত:২২৩।

তার পূর্ববর্তী আয়াতে বলা হয়েছে ‘তোমরা স্ত্রীসহবাস করিও না তাদের ঝতুস্রাব অবস্থায়। আয়াত:২২২।তারও আগের আয়াত বলা হচ্ছে ‘তোমরা মুশরিক নারী বিবাহ করিও না। তারা তোমাদের মুগ্ধ করিলেও।’ আয়াত: ২২১।

তাহলে স্পষ্ট, এখানে বলা হচ্ছে না, তোমরা নারীকে যেভাবে ইচ্ছা ভোগ করতে পারো। বরং কিভাবে একজন নারীর যৌনজীবন হবে, তা বলা হচ্ছে। এটা কোনভাবেই নারীর প্রতি অনাধিকার চর্চা হতে পারে না। আর একটা পূর্ণাঙ্গীন জীবনব্যবস্থার জন্য ‘যৌন বিষয়ক নীতিমালা উপস্থাপন করাটাও জরুরি।’

—তা মানলাম। কিন্তু একজন নারীকে শষ্যক্ষেত বলাটা কি যুক্তিযুক্ত?
—আচ্ছা ঠিক আছে। তোমাদের মধ্যে কি কেউ কৃষকের সন্তান আছে?
প্রায় মিনিটের মাথায় সামনের বেঞ্চের সুমন দাঁড়ালো।

—আমি তোমাকে কয়েকটি বিষয় দেখাবো। একজন কৃষকের মাঝে এই গুণগুলো থাকে কি না বলবে।
১) একজন কৃষকের ভাবনা জুড়ে শুধু একটি বিষয় নিয়েই চিন্তা থাকে, সেটা তার শষ্যক্ষেত্র।
২) একজন কৃষক চায়, তার শষ্যক্ষেতে অন্য কেউ ভাগ না বসাক! তা দখল না করুক।
৩) একজন কৃষক তার শষ্যক্ষেতে ‘হাল দেয়, আগাছা পরিষ্কার করে, শষ্য বপন করে’ মোট কথা শষ্যক্ষেতই কাছে মনে প্রধান।
৪) একজন কৃষকের সবচেয়ে বড় চাওয়া ‘তার শষ্যক্ষেত সবসময় নিরাপদ, সকলের চেয়ে ভালো, এবং সুনিপুণ হোক।’

সুমন বলো! এগুলো কি থাকে একজন কৃষকের মাঝে?
—জি স্যার অবশ্যই।
—এখন মেলাও, একজন স্বামীর জন্য উচিৎ নয় কি ‘তার সকল ভাবনায় তার স্ত্রী থাকা, তার এই অতুল্য সম্পদকে অন্যের মালিকানায় যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখা, তাকে নিয়েই তার ভাবনা থাকা, এবং সকল বিপদাপদ থেকে নিরাপদ রাখা?’
—অবশ্যই।
—ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ তায়ালা এখানে শষ্যক্ষেত দিয়ে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, ‘তোমরা কিভাবে নিজের স্ত্রীর সাথে মিলিত হবে, এবং তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের নিকট কতোটা সম্মানিত।’ এটা শিক্ষা দেওয়া কি কখনো নারীর অধিকার হরণ?
সকলেই চুপ হয়ে গেল। ইউশা তার প্রথম ক্লাসে নিজ যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে সকলকে আকৃষ্ট করলো।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন