নারীর স্বাধীনতা ও ইসলাম

দিল আফরোজ রিমা

স্বাধীনতা অর্থ পরাধীনতা থেকে মুক্তি। স্বাধীনতা বলতে কোন স্বেচ্ছাচারকে বুঝায় না। আসলে স্বাধিনতা হচ্ছে মানুষের ব্যাক্তিত্বের উন্নতি ও মার্জিত বিকাশ। নারী জাতী মানব সমাজের অন্যতম অংশ। আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রের বা সমাজের অ-ব্যবস্থাপনার কারণে নারীকে কেবল ব্যথা – বেদনার নির্মম অভিশাপ বহন করতে হয়েছে। তার যথার্থ জীবন বিকাশের জন্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বার বার উপেক্ষিত হয়েছে।

ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ না করার কারণে নারী সমাজ মুক্তির পথ দেখেনি বরং শাসন, শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে চরম দুর্ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে। এই সমাজ কখনো পিতা, কখনো ভাই, কখনো স্বামী রুপে নির্মম দন্ড হাতে বিচারকের ভূমিকা গ্রহণ করেছে। তাই তার সকরুণ আর্তনাদ কখনো সমাজের পাষাণ হৃদয়কে নরম করতে পারেনি।

আজকের নারী সমাজ অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। এখন নারীরা স্বাধীনতা আদায়ের দাবিতে ঝড় তুলছে। কিন্তু সত্যিকার স্বাধীনতা পেতে হলে আমাদের স্বাধীনতার আসল অর্থ সম্পর্কে জ্ঞাত হতে হবে। আমি আগেই বলেছি,

স্বাধিনতা অর্থ-মানুষের ব্যক্তিত্বের উন্নতি ও মার্জিত বিকাশ। তাহলে আমাদের নারী সমাজের স্বাধীনতা পেতে হলে তাকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। নারী যদি তার নিজের মূল্য বুঝতে পারে তাহলে সমাজের সামনে দেশ ও রাষ্ট্রের সামনে নিজেকে মূল্যায়ন করতে পারবে এবং পারবে তার নিজস্ব গুণের মার্জিত বিকাশ সাধন করতে।

শিক্ষা মানুষকে যথার্থ মানুষ করে গড়ে তুলে। শিক্ষার সহায়তায় মানুষ এগিয়ে যায় সুন্দর জীবনের দিকে। তাই পুরুষের যেমন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তেমন নারী জাতীর শিক্ষার গুরুত্ব কোন অংশে কম নয়। বরং পুরুষের পাশাপাশি নারী জাতী যদি সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারে এই সমস্যাসংকূল পৃথিবীতে জীবনের জটিলতা অনেকাংশে কমবে। ফলে পৃথিবী মনুষ্য বাসের উপযুক্ত হয়ে উঠবে।

যেহেতু আমরা মুসলমান তাই আমাদের ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করা আবশ্যক। ইসলামেই আছে সঠিক জীবনবিধান। ইসলামই নারীকে স্বাধীনতা দিয়েছে। শুধু নারী নয় পুরুষদেরও ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। কিছু অশিক্ষিত মোল্লা প্রকৃতির লোক আছে যারা কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নারীর উপর জুলুম অত্যাচার করে। তাই ইসলাম সর্ম্পকে নারী পুরুষ সবারই সঠিক জ্ঞান থাকা দরকার।

নারীর ভূমিকা প্রধানত জননী হিসাবে বিবেচ্য। আগামী দিনের নাগরিক আজকের শিশুরা মায়ের কোলে প্রতিপালিত হয়। ছেলেমেয়েদের লালন – পালনের দায়িত্ব নারীরাই বহন করে। পারিবারিক জীবনের কেন্দ্র বিন্দু হলো নারী। পরিবারের সুখ শান্তির চাবিকাঠি থাকে নারীর হাতে। তিনি তার জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার সহযোগে পারিবারিক জীবনে আনন্দ সঞ্চার করতে পারেন।

নারী জাতীকে শিক্ষিত হতে হবে এবং ইসলামের নিয়মগুলো মেনে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তাহলেই নারী তার প্রকৃত মূল্য পাবে। নারীদের এমন কোন কাজ করা উচিত নয় যা তার সন্মান নষ্ট করে।

শিক্ষাই জাতির উন্নতির চাবিকাঠি। দেশের জনসংখ্যার অর্থেক নারী আর তাদের উন্নতিতেই জাতির উন্নতি। মায়ের সন্তানরাই একদিন বিশ্ব পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাই মাকে উপযুক্ত যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। উন্নত মন মানসিকতা সম্পন্ন বলিষ্ঠ জতি গঠনের কাজে প্রয়োজন নারী শিক্ষা। সমাজের সামগ্রিক প্রয়োজনে মেয়েদের উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া আবশ্যক। আর উপযুক্ত শিক্ষা পেতে অবশ্যই কোরআন এবং সুন্নাহ জানা এবং মানা নিতান্তই জরুরি।

নারীর আশ্রয়, আত্মপরিচয় এবং আত্মমর্যাদার একমাত্র ঠিকানা হচ্ছে ইসলাম। ইসলামই পারে নারীকে ভয়াবহ বিভ্রান্তির পথ থেকে বাঁচাতে। নারীকে খুঁজে নিতে হবে কোরআন সুন্নাহয় রচিত তার স্বাধীনতার রাজপথ। আমাদের নিজেদের বুদ্ধি দিয়ে নারীত্বকে চিনতে হবে। নারীত্বই নারীর রুপ ও সৌন্দর্যের বৃহত্তম অংশ।

ইসলাম নারীকে গুরুত্ব দিয়েছে সম্মান দিয়েছে বলেই তার পায়ের নিচেই সন্তানের বেহেস্ত। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম। (তিরমিজি)

এবার বুঝতেই পারছেন ইসলামই দিয়েছে নারীর প্রকৃত সন্মান। নারী একজন মানুষ তাই তাকে সত্যিকার অর্থে মানুষ হতে হবে। তাকে মনুষ্যত্ব অর্জন করতে হবে। সত্যিকারের মানুষ না হয়ে কখনো সফল নারী হওয়া যায় না।

লজ্জাই নারীর ভূষণ কথাটি নিতান্তই ফেলনা বলে আমার মনে হয় না। লজ্জাশীলার মধ্যে একটি মায়াবী সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে আমরা নারীরা যেন সঠিক অবস্থান থেকে সরে ভ্রান্ত অবস্থানে পা না রাখি। আজ নারী সমাজ বিভিন্নভাবে লাঞ্চিত হচ্ছে। আজ আমাদের নিয়ে অনেকে অনেক ভাবে কটুক্তি করতে ছাড়ে না। এসবতো আমাদের অসুন্দর চলনের ফল। তাই আমাদের সঠিকভাবে চলতে হবে। আমরা কাউকে আর সুযোগ দেব না আমাদের অসন্মান করার।

আজ নারীরা চোখ থেকে লজ্জার আবরণ সরিয়ে ফেলছে, নিজেদের হাট – বাজারের পন্য সামগ্রিতে পরিনত করছে। প্রেক্ষাগৃহের সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে। সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করছে। এই গুটিকয়েক নারীদের জন্য নারী জাতি অপমানিত হচ্ছে বিভিন্নভাবে। আজ পুরুষ সমাজে নারীদের নিয়ে রঙ্গ ব্যাঙ্গের রসালো ঝড় উঠে। কিন্তু সর্বশক্তিমান আল্লাহ নিজেই নারীকে কত সন্মান দিয়ে তার পায়ের নিচে জান্নাত বানিয়েছেন। রাসুল (সাঃ) নারীকে সন্মান করেছেন। তাছাড়া আরো গুনীজনরা নারীকে সন্মানই করেছেন। একজন নারীর কতটা ক্ষমতা আল্লাহ দিয়েছেন তা বুঝানোর জন্য দুটি উক্তি তুলে ধরছি।

Margaret Thatcher বলেছেন-

“If you want something said, ask a man; If you want something done ask a woman (অর্থাৎ-তুমি যদি কিছু বলাতে চাও তাহলে পুরুষকে দিয়ে বলাও, যদি কোন কাজ সম্পন্ন করাতে চাও তাহলে নারীকে দিয়ে করাও।”

Harriet Beecher Stowe নারীর ভুমিকাকে আরও সুন্দরভাবে এক লাইনে উপস্থাপন করেছেন-

“Women are the real architect of society ( অর্থাৎ নারী হলো সমাজ গড়ে তোলার স্থপতি )

আমরা লক্ষ করলে দেখতে পাই স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। আমরা এই অধঃপতন মেনে নিতে পারি না।

আমার সকল মা বোনদের উদ্দেশ্য করে বলছি আধুনিক সভ্যতার স্রোতে যেন নিজেদের আত্মমর্যাদা বোধের অনুভুতিকে ভাসিয়ে দিবেন না। নিজের ব্যক্তিত্ব, মাতৃত্বের এবং সন্মানের উপর কুঠারাঘাত করবেন না। একজন নারী তার ধৈর্য ও সাধনা দিয়ে সন্তানকে লেখাপড়া, আদব-কায়দা, ইসলামের নিয়ম-কানুন এবং প্রকৃত শিক্ষায় মানুষ করে গড়ে তুলবেন। আজ সেই মা যদি সন্তানের ভবিষ্যতের কথা না ভেবে নিজেই উচ্ছৃঙ্খলতায় গা ভাসিয়ে দিয়ে পাশ্চাত্য সভ্যতায় নিজেকে তৈরী করে আধুনিক সভ্য সমাজের একজন উল্লেখযোগ্য নারী হিসাবে প্রমাণ করতে চায় তাহলে আমাদের নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কি হবে?

স্কুল পড়া বাচ্চারা আজ ধুমপান করছে, পর্যায়ক্রমে ড্রাগে আসক্ত হচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেশ ও জাতি। অথচ একজন নারী তার ভালবাসা দিয়ে শুধু সন্তান কেন বিশ্ব জয় করতে পারে। আসুন মা বোনেরা আমরা ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করি।

‘কোরআন আমাদের জীবন বিধান’ এই কথা যদি বিশ্বাস করে থাকি তাহলে কোরআনের শিক্ষা গ্রহণ করা আমাদের জীবনের জন্য জরুরি নয় কি? যেসব কারণে গোটা বিশ্বে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তার অন্যতম কারণ হলো, মায়ের মানসিক ও নৈতিক সেবাযত্ন ও পরিচর্যা থেকে নতুন প্রজন্ম বঞ্চিত।

বর্তমান পাশ্চাত্য সমাজে নারী প্রগতি ও সমান অধিকারের দাবিতে প্রলুব্ধ হয়ে নারীদের যে লাঞ্চনা-গঞ্জনা সহ্য করতে হচ্ছে তা থেকে তাদের বেরিয়ে আসার কোন রাস্তা নেই। কারণ তাদের কাছে ইসলামের মতো কোন ধর্মীয় পদ্ধতি নেই যা তাদের বাঁচাতে পারে।

আমাদের ইসলামের জীবন পদ্ধতি ভালোভাবে জানা দরকার। ইসলামই দিয়েছে আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা। একজন মুসলিম নারীর অধিকার আল্লাহ ও রাসুল (সাঃ) নিশ্চিত করে দিয়েছেন।

ইসলামে সাধারণ মানবাধিকার নারী পুরুষের একই সমান। ইসলাম দিয়েছে নারীর সতিত্ব সম্ভ্রমের সন্মান ও নিরাপত্তা। ইসলাম দিয়েছে নারীর বিবেকের স্বাধীনতা। মালিকানা ও উত্তরাধিকার আইনের স্বাধীনতা। পাশাপাশি তার সতিত্ব রক্ষার ইসলামী দাবি পূরণ করা। যাতে সে মা বোন ও কন্যা হিসাবে সর্বোত্তম চরিত্রে সজ্জিত হয় এবং নারীত্বের সন্মান ও মর্যাদাসহকারে সমাজে পরিচিত হতে পারে।

আমার লিখোনিতে আজকের নারী সমাজকে বুঝাতে চাই যে, আমাদের স্বাধীনতার দাবি আদায় করতে গিয়ে আমরা যেন নিজেদের ব্যক্তিত্ব, সম্মান ও মূল্যবোধকে ভুলে না যাই। আমরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনতে পারি না। আসুন আমরা ইসলামী শিক্ষার আলোকে নিজেদের সচেতন করে তুলি এবং নিজেদের মান ইজ্জত রক্ষা করে নিজেদের মূল্যায়ন করি। আমাদের মার্জিত রুচির বিকাশ সাধন করি। তবেই আমরা স্বাধীনতা পাব ইনশাআল্লাহ।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলাম লেখক 

আরও পড়ুন