নারী কখন স্বাধীন

এইচ বি রিতা

আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। যে যেদিকে পারছি, স্বাধীন হয়ে যাচ্ছি। কেউ বলে, কেউ ছেঁড়ে, কেউ বা খুলে! তবে নারীরা কেন পরাধীন থাকবে ? নারীর মানবিক, মানসিক, অর্থনৈতিক, শারীরিক, সার্বিক উন্নয়নে নারী স্বাধীনতা অপরিহার্য।
অনেকেই মনে করেন, ইসলাম, তার রীতি নীতি ও বিধি নিষেধ দ্বারা যে কল্যাণময় সমাজ গঠন করেছে, তাকে নষ্ট করার জন্যই পাশ্চাত্য সভ্যতা “নারী স্বাধীনতা” নামক সাপের বিন বাজাচ্ছে! বিষয়টা তা নয়। নারী স্বাধীনতায় আমি ও বিশ্বাসী । তবে প্রশ্ন হচ্ছে, নারী স্বাধীনতা বলতে আমরা আসলে কি বুঝি ?

নারী স্বাধীনতা বলতে আমি বুঝি একজন নারীর বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, কর্ম স্বাধীনতা, ও নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা এবং সৎ শিক্ষা গ্রহনের মাধ্যমে ইজ্জত-আব্রু বজায় রেখে নিরাপদ জীবনযাপনের পূর্ণ নিশ্চয়তা । একজন নারী স্বাধীনভাবে তার পূর্ণ মেধার বিকাশ ঘটিয়ে নিজের সততা, নৈতিকতা ও নিজ ধর্মজ্ঞ্যানকে পুঁজি করে আত্মার বিন্যাস ঘটাবে, নিজেকে প্রস্ফুটিত করে সমাজে বসবাসের যোগ্য করে তুলবে, এতে ক্ষতি কি ? একজন মুসলিম নারীর সেই অধীকার খর্ব করার অধিকার কারো নেই। তবে, নারী-স্বাধীনতার নামে ইদানীং যে ধর্মভ্রষ্ট ও অনৈতিক বিশৃঙ্খল বেলাল্লাপনা আমাদের আধুনিক ব্যাক্তিবর্গগণ বর্তমান সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন, আমি সেই নারী স্বাধীনতার ঘোর বিরোধী।

নারী স্বাধীনতা নিয়ে আবদুল হালীম আবু শুক্কাহ রচিত “রাসুল (সা.) এর যুগে নারী স্বাধীনতা” বইটি পড়ার আগ্রহ মূলত এই নারী স্বাধীনতা আন্দোলন থেকেই আমার সৃষ্টি হওয়া । বইটি পড়ে অনেক কিছু জানার আছে। দেখা যায়, নারীর পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও কর্মের স্বাধীনতা ছিল বলেই রাসুল (সা.)-এর যুগে বেহেশতের সুসংবাদপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সাহাবি হজরত যোবায়ের (রা.)-এর স্ত্রী, হজরত আবু বকর (রা.)-এর কন্যা আসমা (রা.)-এর সপর্দায় ঘোড়ার ঘাস সংগ্রহ করা, খেজুর বাগানের পরিচর্যা, খেজুরের আঁটি বহন করে বাড়ি আনা থেকে সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করতেন। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ এর খালা তালাকপ্রাপ্ত হলে তিনি খেজুর বাগান থেকে খেজুর সংগ্রহ করতেন। রাসুল (সা.) এটা জেনে বললেন, এতে কোনো ক্ষতি নেই। (রাসুলের যুগে নারী স্বাধীনতা, ২য় খণ্ড ,থেকে নেওয়া )

বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থকার ও প্রাবন্ধিকদের লেখায় দেখা যায়, রাসুল (সাঃ) এর সময়ে মুসলিম নারীরা কতটা স্বাধীন ছিলেন। গ্রন্থকার ও প্রাবন্ধিক লেখক মোশারেফ হোসেন পাটওয়ারী তার বিভিন্ন লেখায়, নারীদের নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ” মহিলা সাহাবি কি্বলাহ (রা.) বাজারে ব্যবসা করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর স্ত্রী ঘরে বসে শিল্পকর্ম করতেন এবং তা বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। ওহুদের যুদ্ধে উম্মে আম্মারা (রা.) শত্রুদের তরবারির ডজনখানেক আঘাত সহ্য করেও বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে রাসুল (সা.)-এর ওপর আক্রমণকারী শত্রুদের প্রতিহত করেছিলেন। ওমর (রা.)-এর সময় উম্মে শিফা নামক মহিলা বাজারের পরিদর্শক (আল হিসবাহ্) হিসেবে নিয়োজিত হন। রুফায়দা আল-আসলামিয়া প্রথম মহিলা ডাক্তার ছিলেন। রাসুল (সা.) খন্দকের যুদ্ধের সময় তাঁকে মদিনার মসজিদের পাশে তাঁবু টানিয়ে দিয়েছিলেন এবং সেখানে তিনি যুদ্ধাহত মুসলিম সেনাদের শুশ্রূষা করতেন। আশশিফা বিনতে আবদুল্লাহ মুসলিম মহিলাদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য বের হতেন।কর্মসংস্থান কেবল নারীর অর্থনৈতিক মুক্তিই আনে না, তার স্বাধীন ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটায়, কুসংস্কার ও দাসত্বমুক্ত করে।” ( গ্রন্থকার ও প্রাবন্ধিক লেখক মোশারেফ হোসেন পাটওয়ারী) ।

নারীর শিক্ষা গ্রহন একান্ত প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। নারী যদি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়, তখন সে পরিবার বা সমাজের বোঝা হবে না। আমাদের সমাজে এমন অনেককেই আছেন যাদের স্বামী মারা গেছেন সন্তান সন্ততি রেখে। বাবা মা চিরকাল বেঁচে থাকে না বিধায় ভাইদের কাঁধে বোঝা হতে হয় তাদের। ভাই কষ্ট করে মেনে নিলেও , ভাই এর বউ মানছেন না। সংসারে শুরু হচ্ছে আরেক অশান্তি । তাই নারীকে নিজের যোগ্যতায় জেগে উঠতে হবে। তবে সেটা অধিক আধুনিকতার নামে উশৃংখলতা দিয়ে নয়।
একজন শিক্ষিত মা শতক শিক্ষক অপেক্ষা উত্তম। কথাটা কে বলেছিলেন, মনে নেই। তবে যিনিই বলেছেন, সঠিক বলেছেন। আজ আমি শিক্ষিত হলে, আমার সন্তান কেও ভাল-মন্দ শিখাতে পারবো। বাড়তি টিওশন এর খরচটাও এড়ানো যাবে। ক্ষতি কি ? আর কথায় আছে, শিক্ষাই জাতীর মেরুদণ্ড । শিক্ষা ছাড়া জাতী , মেরুদন্ডহীন প্রাণীর মতই ভঙ্গুর ।
নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার কথাই ধরুন। অনেকেই ভাবেন বেগম রোকেয়া নারীকে জাগ্রত করতে গিয়ে ইসলাম এর অবমাননা করে গেছেন। মুলত তিনি, ইসলাম কে নয়, ইসলাম এর অনুশাসনের নামে সমাজ দ্বারা তৈরী ইসলামী অপব্যাখ্যা ও বাড়াবাড়ির বিরোধীতা করেছেন। মুসলিম নারীর হিজাব পরা নিয়ে তার কোন আপত্তি ছিলনা, তার আপত্তি ছিল হিজাবের নামে নারীদের ঘরে আবদ্ব করে রাখার পন্থ্বাতে। বেগম রোকেয়ার বিখ্যাত প্রবন্দ্ব ” বোরকা” এবং তার বিভিন্ন লিখা যে পড়েছে, তার কাছে বিষয়টি আশা করি পরিষ্কার হবে।
আমাদে সমাজে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক পরিবার মনে করেন যে নারীর স্কুল কলেজ এ যাওয়ার দরকার নেই, নারীর কাজ হচ্ছে রান্না করা, সন্তান ও পরিবারের দেখা শুনা করা। নারী বলতে ওরা একজন সুগৃহিনী স্ত্রীকেই বুঝেন। সেই সব মানুষদের উদ্দেশ্যে তিনি তার “সুগৃহিনী প্রবন্ধে’ বিভিন্ন দিক থেকে উদাহরন সহ নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘যদি সুগৃহিনী হওয়া আপনাদের জীবনের উদ্দেশ্য হয়, তবে স্ত্রীলোকের জন্য সুশিক্ষার আয়োজন করিবেন” । অসচেতন নারী সমাজকে সচেতন করা ও নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজের বিবেককে জাগ্রত করায় ছিল তার উদ্দেশ্য । তবে সেটা ধর্মের আওতায় থেকে, ধর্ম বিচ্যুত হয়ে নয়।
বর্তমানে নারী সমাজ শোষিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত, অবহেলিত ও নির্যাতিত। এর বেশ কিছু কারণের মধ্যে একটি কারণ হচ্ছে ইসলামের মৌলিক আদর্শের বিচ্যুতি। এখন আসি মুল কথায় ! নারী স্বাধীনতা বলতে আসলে আমরা কি বুঝাই? আমরা আসলে স্বাধীন হতে গিয়ে কি কি অধীকারের দাবীকে প্রাধান্য দিচ্ছি ?

নারী স্বাধীনতা বলতে যদি কেউ পাশ্চত্যের সভ্যতাকে গ্রহন করার উপর জোর দেন, তবে সেটা ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য ভিন্ন মত হতে পারে। এখানে ধর্ম এবং সংস্কৃতি একটা বিরাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। তবে আমি এতদূর যাওয়ার চেষ্টা করছি না।

আমার কাছে, নারী স্বাধীনতা বলতে, একজন নারীর বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, কর্ম স্বাধীনতা, নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা ও শিক্ষা গ্রহনের স্বাধীনতা যথার্থ অর্থপুর্ন । যারা ভাবেন যে, নারীর অধিকারে ইসলাম যথেষ্ঠ প্রতিবন্ধকতা তৈরী করেছে, তাদের বলব, ইসলাম নারীকে যথার্থ সন্মানে অধিষ্ঠিত করে গেছেন। কিন্তু পুরুষ তান্ত্রিক সমাজে নারীর ন্যায্য অধীকার ও মর্যাদা কে উপেক্ষা করা হয়। নারী কে স্বাধীন করতে, তাকে কোণঠাসা করে না রেখে, নারীর উচ্চশিক্ষা ও কর্ম স্বাধীনতার সুযোগ দিয়ে তার প্রাপ্য সন্মান ও অধিকার প্রদানের নিশ্চয়তায় সকলকে আন্তরিক হতে হবে। নেপোলিওন বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে একটা শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের কে একটা শিক্ষিত জাতি দিব “। নেপোলিওন এর মত একজন মহান দার্শনিক ও নারী শিক্ষার উপর বিশেষভাবে আলোকপাত করে গেছেন। নারীর পুর্ন স্বাধীনতার বহিপ্রকাশ ও মর্যাদা দিতে গেলে, অবশ্যই নারীর শিক্ষা ব্যাবস্থার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নারী তখনি স্বাধীন, যখন সে একটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রে সকল মৌলিক অধীকার প্রতিষ্ঠা ও আত্বমর্যাদা নিশ্চিত করে বাক স্বাধীনতা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজের ভিতরের সুপ্ত প্রতিভার বহিপ্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে।

লেখকঃ শিক্ষক, কবি, কলামিষ্ট, সাংবাদিক ও প্রবাসী বাংলাদেশী, ইউএসএ

আরও পড়ুন