নারী ! নও তুমি প্রসাধনীর

কাজী  খায়রুন্নেছা

“তোমার নাকটা যেন কেমন চ্যাপ্টা,মুখটা মনে হয় বেশি গোল,চেহারাটা টানাটানা আর একটু মায়াবি হলে কি খারাপ হত??? একটু অন্যরকম হতে পারত না!”
প্রতিনিয়ত এই কথাগুলো পাহাড়ি আদিবাসী  নারীদের শুনতে হয় আমরা যাদের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী বলে থাকি তাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। শুধু যে পাহাড়ে বসবাসকারী নারীদেরকে শুনতে হয় তাা নয়!!! কোন নারীর চেহারা পছন্দ না হলে প্রায় নারীরকেই এই কথাগুলো শুনতে হয়।এটা নয় যে শিক্ষিতরা না অশিক্ষিতরা শুনছে বরং যারা কাজের জন্য এগিয়ে আসছে তাদের প্রতি পদে পদেই কথাগুলো শুনতে হয়।

পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের কথাগুলো -এত সুন্দর করে যার থেকে ধার করলাম,যিনি এসব অবহেলাকে অগ্রাহ্য করে,কোন চিন্তা না করে সাবলীল গতিতে এগিয়ে চলেছেন ।যাকে আমাদের নারী সমাজের জন্য একটা পথিকৃত বলা যায় ।বাংলাদেশ গার্ল গাইডস চট্টগ্রাম অঞ্চলের আঞ্চলিক কমিশনার এবং সু-প্রতিষ্ঠিত স্বনামধন্য প্রধান শিক্ষক ও নারী নেত্রী নিরুপা দেওয়ান।
তাঁকে সম্মান জানিয়ে আজকে আমার এই বক্তব্য শুরু করছি।সাথে সাথে স্মরণ করছি সেই মহীয়সী নারী- যিনি নিজ গুনে অন্যান্য। যারঁ জ্ঞান ভান্ডার আর বাগ্মিতা দেখে সদা বিষ্ময় ।আমি বলব শুধু সাদা মনের মানুষ অধ্যক্ষ রিতা দত্ত। ওনার সম্পর্কে এতগুছিয়ে বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার নেই।শুধুই শ্রদ্ধা।

গাইডিং করতে গিয়ে যখন আমি সাদা পোশাকটা গায়ে জড়িয়ে নেই, প্রসাধন সামগ্রী কখনো আমাকে টানে না।তবে নিজের ভালো লাগা ব্যাপারগুলোর মধ্যে একটা হল-আমরা কতটা নিজেদের সাজিয়ে গুছিয়ে উপস্থাপন করতে পারি।সত্যি বলতে মনে হত সাজগোছ হচ্ছে শুধু নারীদের জন্য!!
কিন্তু যখন এই মহীয়সীদের দেখতাম তখন মনে হত ।আরে আদৌ কি ওনাদের সাজতে ইচ্ছে করে নাহ!!
প্রথম প্রথম মনে করতাম হয়ত এই অনুষ্ঠানে সাজেনি পরের অনুষ্ঠানে হয়তো সাজবে— এভাবে অপেক্ষায় থাকতাম দেখার জন্য – কখন ওনাদের মুখায়াভবে অতিরিক্ত রঙের প্রলাপ আসবে।

আমার বিষ্ময়  বিস্ময়ই হয়ে থাকল । কেমন নাহ!!! না – আমি ওনাদের কখনো ওনাদের বাইরের দিক দেখি নি।শুধুমাত্র পরিপাটি টুকুন ছাড়া।
উল্লেখ্য অধ্যক্ষ রিতা দত্ত – পারিবারিক শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বলতেন “মাটিতে দম্ভ করে হাঁটতে নেই “” অনেক উচ্চপদে চাকুরী করেও কখনো জমকালো সাজে নিজেকে উপস্থাপন করেননি!!! শুধু নিজেকে একজন মাটির মানুষ হিসাবে সামনে এগিয়ে নিয়েছেন। কি চলনে বলনে — কথায় কাজে সবসময়ই সাদা, পূত পবিত্র রুপে উপস্থাপন করেছেন।

চিন্তা করলাম –পৃথিবীতে এত নামী দামি ব্রান্ডের প্রসাধনীর ব্যবহার না করেই উনাদের জীবন বৃথা করে দিল!!!তখনই লজ্জা লাগলো নিজের প্রতি।ওনারা নিজেরাই ব্রান্ড। কেন??? ওনারা কেন জাগতিক প্রসাধন সামগ্রিকে প্রাধান্য দিবে!!নিজেদের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া– এটা কি বড় প্রসাধনী নয়!!

সাধারণ প্রসাধন সামগ্রীর মাঝে আমি তোমাদের দেখি না । প্রয়োজনই হয় নাহ!! আজকে আমি গার্ল গাইডসে্র মেয়েদের উদ্দেশ্যে এই বক্তৃতা প্রদান করি-

নিজেদের এক একটা ব্রান্ড বানাও।তাহলে কারো কথায় তোমার মন খারাপ হবে না।প্রসাধনী তোমাকে টানবে না।নিজেকে সুন্দর করে তুলে ধরার জন্য বিখ্যাত ব্রান্ড দরকার হবে না।তোমার বর্ণ দেবে তোমার পরিচয়। একটু কাজল লাগালে চোখটা আরো সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায় বা লিপিষ্টিকটা কালার ম্যাচিং হলেও তুমি আরো বেশি আর্কষণীয় হতে পারো।এইসব লোভনীয় মনকাড়া বাসনা, কখনো তোমাকে পেয়ে বসবে না।তোমার অহংকার তুমি যেরকম আছো সেটাই। বাহ্যিক রঙের প্রসাধনীর মাঝে – তুমি তোমার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলো নাহ।

নারী দিবস শুধু একটি দিন নয় । নিজেদের বিশ্বাস,আস্হা আর সম্মানকে চেনার দিন।নিজেকে নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন।প্রতিটা ধর্মে নারীকে দিয়েছে সম্মান।বিধাতার সেই সম্মানকে শ্রদ্ধায় পরিণত করতে হবে আমাদের কাজের মধ্যে দিয়ে।নারী হিসেবে আমরা কিন্তু আলাদা সম্মানিত।এই সম্মানের দায়বদ্ধতা আমাদের নিজেদের।পুরুষকে প্রতিপক্ষ না ভেবে,আমি আমার কর্তব্যে সচেতন থাকলে তবেই আমার রক্ষা।

আমাদের জানতে হবে সচেতনতার মাপকাঠি। কতটুকু কাজ আমাকে দিয়ে হবে!! যদি আরেকজন থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা করি, তবে আমি তার কতটুকু উপকারে আসবো। সর্বোপরি, নিজেকে জানার, বুঝার আর অপরের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার মনোভাব পোষণের মাধ্যমেই নিজেকে সৃস্টি করা।

প্রিয় নিরুপা দিদির একটা সুন্দর অভিজ্ঞতা দিয়ে আজকের বক্তব্য শেষ করছি–দিদির থেকে জানতে চেয়েছিলাম-আপনি এই বয়সে এখনো এরকম স্নিগ্ধ সতেজ আছেন কিভাবে?
এত স্নিগ্ধ সতেজার রহস্যের উত্তরে যা পেলাম ।দিদি বলেন-

আমি রাতে যে কাত হয়ে ঘুমায় সকালবেলা ঠিক সে কাত হয়ে উঠি!!! সারা দিনের দুশ্চিন্তা রাতের ঘুমে কোন ব্যাঘাত ঘটায় না।
হ্যাঁ সারাদিনে আমার পছন্দ হলো না এরকম কোন কথা আমাকে কখনো ভাবায় না।সবার কথাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে আমি আমার কাজ করি।

পরিশেষে মুসলিম হিসাবে এইটুকুই বলি । এটাই ইসলামের শিক্ষা । দিনশেষে সবাইকে ক্ষমা করো আর নিজের ভালো কাজের  প্রতিশ্রুতি কর। অঙ্গীকারবদ্ধ হও।

নারী হিসাবে নিজেকে প্রসাধনীতে না ডুবিয়ে,জ্ঞানের জগতে ডুবাও।জগৎটা তোমার।সামান্য প্রসাধনীর মাঝে নিজের উজ্জ্বলতা না খুঁজে , নিজের যা বর্ণ আছে তাকেই স্বমহিমায় উদ্ভাসিত কর।জগতের সকল নারীর ভিতর সেই চেতনার আর্বিভাব হোক।

লেখকঃ কলাম লেখক

আরও পড়ুন