মহীয়সী

আবদুল্লাহ আরমান

আমার প্রথম সন্তান জন্মের কয়েক ঘন্টা পরেই ওপারে চলে যায়! সন্তানের একটুখানি কান্নার আওয়াজ যে কতটা মধুর, যার সন্তান জন্মের পর কাঁদেনা কেবল সেই জানে! জন্মের পর  ও কাঁদেনি,কাঁদার মতো জীবনীশক্তি ওর ছিলোনা! ওর এই নীরব প্রস্থান তাই আজও আমাকে কাঁদায়!

বাড়িতে পৌছানোর আগেই  আমার সন্তান আল্লাহর মেহমান হিসেবে কবুল হয়ে গেছে! ওর প্রাণহীন নিথর দেহটা কোলে নেয়ার আগে বুঝিনি পিতৃত্বের অনুভূতি আসলে কেমন হয়! অনুভূতি যখনই জাগতে শুরু করলো ততক্ষণে আমার বাবুটার কবর ও কাফন প্রস্তুত! এ যেন ভালোবাসার জোয়ার উঠতে না উঠতেই নির্মম ভাটার টান…..!

অবশেষে নিজ হাতে গোসল দিয়ে কাফনে জড়িয়ে আমার কলিজাটাকে দাফন করেছি ছোট্ট মাটির জান্নাতী কুটিরে! কিন্তু পিতৃত্বের গভীর অনুভূতির সিক্ততা আজও আমার হৃদয়ে অনুভব করি! ২ ঘন্টার জন্য ওর বাবা হয়েছিলাম কিন্তুু ২ বছর পরেও আমার হৃদয় থেকে  ওর জন্য চাপা কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই!

বাবা তো সন্তানের বীজ বপনকারী মাত্র কিন্তু একজন মা নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে সীমাহীন কষ্ট ও রক্তের নদী পাড়ি দিয়ে সন্তানকে জন্ম দেয়…. তাই আমার সন্তানের জন্য আমার সহধর্মিণীর কষ্ট যে কি পরিমান তা পরিমাপ করার যোগ্যতা আমার নেই! কারও কি সাধ্য আছে  পার্থিব নিক্তিতে মাতৃত্বকে ওজন করার!?

একজন স্বামী হিসেবে,পুরুষ হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিলো সেদিন আমার স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেয়ার। আমি তা পারিনি….!! সান্ত্বনা দেয়ার জন্য নিজের নূন্যতম যে মানসিক শক্তির দরকার হয় তা সেদিন আমার ছিলোনা! উল্টো তার কাছেই সান্ত্বনা পেয়েছি বারংবার! সেদিন ওর কাছেই শিখেছিলাম ধৈর্যের প্রকৃত ব্যবহারিক সংজ্ঞা!

মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসা বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে সেদিন যখন ও আমার হাত ধরে বললো “আমি আবার দ্রুত মা হতে চাই…… ”। আমার কষ্টের আঁধার ওর এই কথার আলোতে ম্লান হয়ে গিয়েছিল! সেদিন অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, আমি কি পারতাম দীর্ঘ ৯ মাস রক্তের নদী পাড়ি দিয়ে তীরে উঠেই আবারও শুধু পিতৃত্বের খাতিরে সেই নদী পাড়ি দেয়ার বাসনা ব্যক্ত করতে?! আমি নিশ্চিত, লৌকিকতার ছলে হলেও এ কথা বলার সাহস আমার নেই!
তখনই বুঝেছি আল্লাহ কেন মা’র মর্যাদা তিনগুণ করেছেন এবং ১ম,২য়, ৩য় পুরস্কার মা’কে দিয়ে বাবাদের  শুধুমাত্র সান্ত্বনা পুরস্কার নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বলেছেন!

পৃথিবীর সকল নারী হয়তো মহীয়সী নয় কিন্তু সব ‘মা’-ই   “মহীয়সী”! আমরা প্রত্যেকেই একজন মহীয়সীর গর্বিত সন্তান! হৃদয় উজাড় করা বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দুনিয়ায় সকল মহীয়সীদের……

আবদুল্লাহ আরমান – লেখক ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন