মা আমার শিক্ষা গুরু

সালমা তালুকদার

যেখানেই থাকো ভালো থাকো মা।তোমাকে মনে রেখেই ধীরে ধীরে ছোট হচ্ছি। আবার তোমার কোলে ফিরবো বলে প্রস্তুত হচ্ছি।

আমার একজন অসাধারণ মা ছিলেন। যাকে জীবিতাবস্থায় আমরা কেউ হয়তো চিনতে পারিনি। নাকি ব্যস্ততার কারনে চিনতে চাইনি। চিনলে হয়তো মায়ের অসাধারণ গুনগুলো নিজের মাঝে ধারণ করতে পারতাম। আমার মা ছিলেন প্রচন্ড পারসোনালিটি সম্পন্ন মানুষ। তাকে কখনো জোরে হাসতে দেখিনি। মন খুলে কারো সাথে গল্প করতে দেখিনি। খালাম্মার সাথে হয়তো গল্প করতেন। কিন্তু সেটা দেখার সময় আমাদের ছিলো না। যদি জানতাম এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন তাহলে হয়তো মুগ্ধ হয়ে মাকেই দেখতাম।

বড় হয়ে নিজে যখন সন্তানের মা হলাম তখন কাছে পেয়েছি ভীষণ ভাবে। ঘন্টার পর ঘন্টা মা, মেয়ে দুজন ফোনে গল্প করতাম। কত যে কথা সেগুলোও মনে নেই। অনেক কিছু মনে নেই। মায়ের সাথে সুখ স্মৃতিগুলো মনে নেই। মনে আছে মাকে নিয়ে সিএমএইচের রাস্তায় রাস্তায় অসহায় মেয়ের আর্তনাদ। কোমায় যাবে আমার মা। ডাক্তার বলেছেন অনেক সহজ করে। কিন্তু আমি নিতে পারিনি কথাটা কিছুতেই। মেঝেতে গড়িয়ে গড়িয়ে কেঁদেছি। হায়! কবরে নামানোর আগ পর্যন্ত সব স্মৃতি মনের মনি কোঠায় কেবলই ফিরে ফিরে আসে। বুকের কাছটায় খুব কষ্ট হয়। মা কেন নেই। আমার এত ভালো মা কেন নেই।

যখন কোনো কষ্টে থাকি তখন জীবন থেকে পাওয়া কিছু সুখস্মৃতি চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করি। স্মৃতিগুলো রোমন্থন করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পরি। একমাত্র আমার মায়ের কোনো স্মৃতি চোখ বন্ধ করে চিন্তা করার প্রয়োজন পরে না। আমি চোখ খুলেই দেখতে পাই আমার মা হাঁটছেন। রান্না করছেন। কথা বলছেন। পুরো বাড়িময় আমার মায়ের পদচারণা আমি টের পাই। কোনো অভিযোগ নেই, অনুযোগ নেই। এমন একজন মানুষ যার কোনো চাহিদা নেই। নিরবে সংসারধর্ম করে যাওয়া ছিলো যার নিত্যকর্ম। ভীষন সুন্দরী ছিলেন আমার মা। নিজের চেহারা বিবৃত হোক কখনো চাননি। তাই হয়তো অপারেশনের আগেরদিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন মুখে অপারেশন করলে কি অনেক খারাপ লাগবে দেখতে। মাগো তুমি কি এজন্যই এত তাড়াতাড়ি চলে গেছো?

আমার মা আমাকে অনেক দোয়া করে গেছেন। আমি পরে শুনেছি আমার মা অনেকের কাছেই বলে গেছেন আমার বড় মেয়েটা অনেক ভালো। তাই বুঝি আজ আমি সংগ্রামী নারী। মায়ের দোয়া আমার মাথার উপর ছায়া হয়ে আছে, থাকবে জানি। কিন্তু আমাকে এতটা ভালোবাসতেন বুঝিনি কখনো আগে। আমি ভালোবেসেছিলাম আমার সংসারকে। মা আমাকে অনেক টানতেন নিজের কাছে। আমি “স” এর মায়াজালে জড়িয়ে সহজে মায়ের কাছে আসতাম না। কিন্তু মায়ের টান যে কি টান তা এখন বুঝছি খুব ভালোভাবে। আমার মা যে জায়গাটায় বিচরণ করে গেছেন আমি সেখানেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছি আজ। সেখানেই বিচরণ করছি সকাল, বিকাল, রাত্রি।

আমার মায়ের আজ ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী। ৯/১০/১১ ইং। এই দিনে আমার মা চলে গেছেন। আমার মা যেমন সুন্দর ছিলেন তেমন সুন্দর তার মৃত্যু দিনটিও। আমার না আজকে খুব আমার মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। আজিমপুর আমার মায়ের কবর। কিন্তু……….

আমার না আজকে কোনো কাজ নেই। নাকি কাজ করবো না। আজ আমি সত্যি কিছু করবো না। কোথাও যাব না। গতকাল আমাদের নিজস্ব মাদ্রাসায় আব্বা মিলাদ পড়িয়েছেন। ব্যস্ততম একটি দিন গেছে গতকাল। আজ কিছু নেই। আজ শুধু মাকে স্বরণ করার দিন। আব্বা আমাকে গতকাল বলে রেখেছিলেন তোর মা যে কোরআন শরীফটা রেগুলার পড়তো তুই ওটা থেকে ইয়াসিন সূরাহটা পড়বি। আমি সকাল সকাল আব্বার কাছ থেকে কোরআন শরীফটা এনে বসে আছি।

ভাবছি মানুষ চলে যায়… সবকিছু ফেলে যায়…শুধু অবয়বটা নিয়ে যায়…মায়ার এই পৃথিবীতে কোনো বন্ধনই চিরস্থায়ী নয়। আমার এই উপলব্ধি মানুষের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েনে অনেক কাজে দেয়। আমার মায়ের মৃত্যুটা আমাকে প্রতিদিন কিছু না কিছু শেখায়।

০৯/১০/১১
শুক্রবার
যাত্রাবাড়ী

 

আরও পড়ুন