ম গল্প-সধবাই কি বিধবা!

নুরে আলম মুকতা

দুলাভাই চলে যাবার পর থেকে আমি আমার অন্যান্য ভাই বোনের গতিবিধি খেয়াল করছিলাম। নিজের বিষয়ে তো অবশ্যই। সব সময় একটি বিষয় ভাবছিলাম যে নশ্বর পৃথিবীতে মানুষের কত অল্প সময়ের বিচরণ। গতিবিধি আর কর্মক্ষেত্র, বন্ধু স্বজন, ছেলেমেয়ে, সম্পদ, ভবিষ্যতের বংশধারার জন্য কি প্রানান্তকর পরিশ্রম এক নিমিষেই শেষ হয়ে যেতে পারে। আসলে একদম নিজের আর কাছের কেউ না চলে গেলে এ বিষয়গুলো কেউ খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখেনা। বিষয়টি এরকম যে, কোন এক দাদীকে বলা হলো, তোমার নাতীর বউ মারা গিয়েছে। দাদী জবাবে বললেন, পরে পরে এসেছিলো আগেই চলে গেলো! এ পর্যন্ত দাদীর অনুভূতি শেষ। এরকম বেশ কটি মৃত্যু সংবাদ দেয়া হলেও দাদীর ভাবান্তর হয়নি। কিন্তু যখন সব শেষে বলা হলো তোমার ছেলে চলে গিয়েছে দাদী। দাদী তখন বুক চাপড়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে শোক শেষ করতে পারছেন না। জুড়ে দিয়েছেন মাতম।  এবার দাদীর কলেজায় আঘাত করেছে সংবাদটি। এজন্য বলছিলাম, নিজের গেলে বুঝতে সহজ হয়। আমার এক বন্ধু আমাকে বলেছিলো, আমি কাঁদি না কেন?  আমি উত্তরে বলেছিলাম, সময় আসলেই কাঁদবে তুমি। কেমন সময়?  বন্ধুর প্রশ্নের জবাব আমি দিইনি সেদিন। ওর বাবা চলে যাবার দিন ও আমাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলে শান্তনা দেয়ার ভাষা আমার ছিলো না। শুধু বলেছিলাম, আমার দিকে দেখো বন্ধু। শান্তি পাবে।

দুলাভাই চলে যাবার পর আমি আর আপা সারাক্ষণই তিনটি ছেলেমেয়ের কথা ভেবে ভেবে ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। কিন্তু একটি বিষয়ে কখনও আমি ভাবার সময় পাইনি যে আপা একা কিভাবে জীবন কাটাবেন? আমার ভ্রম ভাঙলো তখন,যখন আমার এক প্রিয়তম ভাগ্নীর বিয়ের গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে আপা যাচ্ছেন না। কুসংস্কার মুক্ত আমাদের পরিবার। কিন্তু আমাদের পারিপার্শ্বিকতা কি আমরা মুক্ত করতে পেরেছি ?  আপা উচ্চ শিক্ষিত শিক্ষক । তিনি যথেষ্ট সংস্কৃতি সচেতন মানুষ। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম আপার ও অনুষ্ঠানে যোগ না দেয়ার কারনে। যে সকল নারীর আপত্তির মুখে আপা অনুষ্ঠান ত্যাগ করেছিলেন পরে তাদের শত অনুরোধেও তিনি আর যান নি। তারপর থেকে আমার সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়াটি নিয়মিত হয়ে গিয়েছিলো। তিনি রত্মগর্ভা। তাঁর নাড়ীছেড়া ধন দেশ ও দশের অনেক কাজে আসছে। তিনটি সন্তান। সবাই সুশিক্ষিত আর নিজগুনে প্রতিষ্ঠিত। আপা তো কারো মুখাপেক্ষী নন। নিজের ক্ষমতায়  বলীয়ান। আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু আরো বেশ কয়েকজন বিধবা নারীর জীবন আমার সাথে জুড়ে যাবে এটি আমি জীবনেও কল্পনা করিনি। সবার অবস্থা একই রকম। স্বামী চলে গিয়েছেন। ছেলে মেয়েদের মারাত্মক উদাসীনতা তাদের দগ্ধ করে ফেলছে। কখনও কখনও মেয়ে- ছেলের বাড়ি বাড়ি ফেরি করে দিন কাটছে। কিন্তু কেহই স্বামীগৃহ ছাড়া ভালো থাকছেন না। স্বামীর পেনশন সম্পর্কিত নানা জটিলতায় ছুটে আসেন আমার কাছে। গর্ভের সন্তানেরা একে অপরের দিকে ঠেলাঠেলি করে। সোজা বলে দেয় আমরা তো আর ও টাকা খাচ্ছি না। তবে  কে খায়? আমি এ প্রশ্নের জবাব কোনদিন পাবো কিনা জানি না। এক আপা একদিন বাড়ি এসে কেঁদে কেঁদে সয়লাব।

কি হয়েছে?  জিজ্ঞেস করতেই চোখের জলে সব ভেসে যাবার মতো অবস্থা। নিজের ছেলে বলে দিয়েছে ও আর আপার ওষুধ আনতে পারবে না। কেন?  ওর বউ নাকি নিষেধ করেছে। মা তো ওর মেয়েদের নিয়মিত সব দেয় তো নিজের ওষুধও কিনবে। আমরা তো তোমার মায়ের টাকা খাই না। তাই ছেলে জবাব দিয়ে দিয়েছে। কি আর করা!  সমঝোতা ছাড়া উপায় না পেয়ে নিজেই দায়িত্ব নিলাম ওষুধ নিয়মিত আনার। কিন্তু কতদিন চলবে এভাবে? এ নিঃসঙ্গ একাকি সধবারা যখন বিধবা হয়ে যাচ্ছে তখন কিভাবে বাঁকী জীবনটুকু লড়াই করতে হয় তা মনে হয় আমরা খুব কমই রাখি। রাস্তায় খুব জোরে গাড়ি চালাই না আমি। চালাতে পারিও না। রাস্তার দুরাবস্থার কথা ভেবে। একজন মহিলা সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দিলে কি আমি দাঁড়াবো না ?  দাঁড়িয়ে গেলাম। মুখে নেকাব। চিনতে পারছি না। আমাকে চিনতে পারছেন না?  না বুবু। আপনার মুখ তো দেখতে পাচ্ছি না। তিনি মুখ খুললেন, আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম!  নিজেকে অপরাধী মনে হলো। কেন আপা আপনি এখানে ?  মেয়ের বাড়ি গিয়েছিলাম। রিক্সা পাচ্ছি না। জামাই বাড়িতে নেই। মেয়েটি রান্না নিয়ে ব্যস্ত ভাই। খবর পেলাম বড় ছেলের মেয়েটির বাচ্চা হবে, আমাকে যেতেই হবে। আমি আর কিছুই বলতে পারিনি। আপাকে ওর বাড়িতে নামিয়ে এলাম। মোবাইলের যুগে ইচ্ছে করলেই এক ছেলেকে ডাকতে পারতেন। কিন্তু ডাকলে আসবে কিনা আপার সন্দেহ আছে। এরকম অজস্র ঘটনা আমাদের চারিদিকে প্রতিদিন চলমান। আমরা কি এজন্য অনুতপ্ত বা বিরক্ত! সব শেষে আজ যেটি বলে শেষ করবো তা আপনারা দয়া করে লিঙ্গের প্রতি বিচার না করে মানবিকতার দৃষ্টিতে দেখলে খুশি হবো। আমার এক ভাবী দূরন্ত ছিলেন। কোন ভাবেই তাঁর কোন কিছুর কমতি ছিলো না। আমি সুযোগ পেলেই লেগে যেতাম মশকরায়। কিন্তু হায়!  স্বামী অল্প বয়সে আচমকা চলে গেলে  তিনি যেনো মূষঢ়ে পড়লেন। এমনভাবে শরীর বসে গেলো যে ,  দুরারোগ্য ব্যধি তাঁকে আর উঠতে দিলো না। একমাত্র ছেলের সুন্দরী বৌমার অনুগ্রহে চলছে ভাবীর জীবন। বিছানা থেকে নামতে পারেন না। সেদিন যেকোনো ভাবেই হোক বিছানা ভিজে গিয়েছে। চলৎশক্তিহীন ভাবী চিৎকার করে বলছেন ভেজা বিছানা পাল্টে দাও গো মা।  সধবা বৌমা গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে সপ্তমে কন্ঠ চড়িয়ে বলছে তুমি তো পানি ফেলোনি, তুমি…. করে দিয়েছো। আমি হাত দিতে পারবো না।

লেখকঃ কবি,সাহিত্যিক,অনুবাদক ও সহ-সম্পাদক,মহীয়সী।

আরও পড়ুন